একসময়ের তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামীলীগ নেতা এম. এ. রহিমের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন : শ্রীমঙ্গলের আওয়ামী রাজনীতির একাল-সেকাল

September 16, 2018, এই সংবাদটি ২,৯৩৮ বার পঠিত

বিশেষ প্রতিনিধি॥ পাতাকুঁড়ির দেশ পত্রিকা ও অনলাইন ভার্সন থেকে কথা বলছি শ্রীমঙ্গল আওয়ামীলীগের বিচক্ষণ নেতা, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগের অন্যতম সদস্য, ৬৯’ এর সাহসী অকুতোভয় ছাত্রলীগ নেতা ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী এম.এ রহিম’র সাথে। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তাঁর জবানিতে উঠে এসেছে আওয়ামীলীগের একাল ও সেকালের ইতিবৃত্ত এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি সুস্থ্যধারার রাজনীতির মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ’কে এগিয়ে নেওয়ার মন্ত্র।
এম এ রহিম শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ উপজেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম। নানা রাজনৈতিক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে ৫০ বছরের বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবন পার করেছেন স্বগৌরবে। ৬৯’ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরশাসক এরশাদ পতন আন্দোলনে তিনি ছিলেন অত্র অঞ্চলের অগ্রনী।
২০ শে মে ১৯৫৩ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার রামনগরে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হাজী রাশিদ মিয়া ও মাতা মেহেরজান। ছেলে বেলা থেকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবি এবং সাহসী। পরিবার থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অত্র অঞ্চলে ছাত্রলীগ গঠনের মাধ্যমে আওয়ামী ধারার রাজনীতির সূচনা করেন তিনি। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ এলাকায় প্রথমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’র তৎকালীন শ্রীমঙ্গল থানা শাখার আহ্বায়ক হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন পরে তিন মাসের মাথায় গঠন করেন পূর্নাঙ্গ কমিটি যেখানে আইয়ুব খানের মার্শাল ল থাকাবস্থায়ও বিরাট সম্মেলন করে সরাসরি কাউন্সিলারদের ভোটে তিনি একক সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে ছাত্রলীগের প্রতিষ্টাকালীন সভাপতি নির্বাচিত হন, সাথে ছিলেন সম্পাদক খলিলুর রহমান চৌধুরী। যিনি বর্তমানে স্থায়ীভাবে লন্ডন অবস্থান করছেন।

সালওয়ারী বিভিন্ন ঘটনাপুঞ্জের ইতিহাস নিচে সবিস্তারে প্রকাশ করা হলো তাঁর জবানীতে প্রাপ্ত সকল তথ্য, উপাত্ত এবং বক্তব্যের ভিত্তিতে –
ঘটনাক্রম-১৯৬৯
শ্রীমঙ্গলে ছাত্রলীগের সম্মেলনের পূর্বে তিনি নিজে ঢাকায় গিয়ে আমন্ত্রণ করেন তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রউপ ও ছাত্রলীগ দপ্তর সম্পাদক আ স ম আব্দুর রব সাহেবকে এবং উনারা দু’জন ছিলেন সম্মেলনের যথাক্রমে প্রধান ও বিশেষ অতিথি। তাঁদের উপর তখন ছিলো গ্রেফতারি হুলিয়া। উনারা সেই ঐতিহাসিক সম্মেলনে ছাত্র জনতার জনসভায় বক্তব্য রাখেন বর্তমান পৌর শহিদ মিনার মাঠে (স্থানীয় পৌরসভা মাঠে, সে সময় শহিদ মিনার ছিলনা) এটি ছিল শ্রীমঙ্গলে আওয়ামী ধারার রাজনীতির প্রথম প্রকাশ্য ছাত্র জনসভা।
১৯৬৯ সালে তিনি সহ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কয়েক জন মিলে নির্মাণ করেন প্রথম শহিদ মিনার। তার পর থেকে শুরু হয় তার ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচরণ যা এখনো বিদ্যমান। ছাত্র সংগঠনগুলোর বৃদ্ধির প্রবণতা সে সময়ে স্কুল পর্যায়ে ছড়িয়ে যায় এবং তাঁর নিজ উদ্যোগে তৎকালীন শ্রীমঙ্গল থানার ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (তৎকালীন দ্বীনময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়) এ কমিটি গঠন করা হয়, পর্যায়ক্রমে ভৈরবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এবং আছিদ উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়, ভুনবীর দশরথ উচ্চ বিদ্যালয় এ ছাত্রলীগে কর্মী সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে কমিটি গঠন করা হয়। মৌলভীবাজার কলেজে অধ্যয়নের সুবাধে তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে ওৎপ্রোতভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং তিনি তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার ছাত্রলীগের সহ সভাপতিও ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ সহকারে নের্তৃত্ব দান করেন। সে সময় তৎকালীন বৃহত্তর সিলেটের কিংবদন্তী, আওয়ামীলীগ নেতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজীর নের্তৃত্বে মরহুম মোঃ ইলিয়াস (প্রথমে এমএনএ পরে এমপি); মোঃ আলতাফুর রহমান এমপি, মরহুম ডা. আলি প্রমূখদের নিয়ে শ্রীমঙ্গলে আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠা করেন, এই গঠন প্রক্রিয়ায় ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম সক্রিয় সহযোগিতা করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পরে দেশ সফরের অংশ হিসেবে শ্রীমঙ্গলে আসেন। সংঙ্গে ছিলেন মরহুম তাজ উদ্দিন আহমেদ। সেসময় জাতির জনকের সংস্পর্শ পেয়ে এম এ রহিম আরো অনুপ্রাণিত হন। এরপর ১৯৬৯ সালেরই কোন এক সময়ে ঢাকায় তৎকালীন ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রথম জয়বাংলা শ্লোগান দেয়া হয়। ঐ সম্মেলনের উদ্বোধক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সম্মেলন শেষে ঢাকা থেকে ফিরে শ্রীমঙ্গলস্থ মৌলভীবাজার রোডে ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দেওয়ার অপরাধে তাকে রাতে গ্রেফতার করা হয়। তিনি প্রথম কারান্তরীন হন, আইয়ুব খানের মার্শাল ল ধারা-গখজ ৬০ এর আওতায়।
ঘটনাক্রম -১৯৭০
৭০’ এর নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ এ দুই থানায় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে নির্বাচনের প্রচার অভিযানে যোগদান করেন। নির্বাচনের প্রচারণার দায়িত¦ তার নের্তৃত্বে ছাত্রলীগের উপরে বর্তায়। মাইক কাঁধে নিয়ে পায়ে হ্ঁেটে অনেক জায়গায় তাঁরা প্রচার অভিযান পরিচালনা করেন। ১৯৭০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আরেকবার শ্রীমঙ্গল আসেন। শ্রীমঙ্গল পৌরসভা মাঠে এক বিশাল জনসভায় তিনি বক্তব্য রাখেন। সে সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী ,সিরাজ উদ্দিন প্রমূখ। (এই ঐতিহাসিক মাঠটি বর্তমানে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র কর্তৃক দেয়াল দিয়ে আলাদা করা হয়েছে।) জনসভা চলাকালীন সময় মুসলিমলীগের কর্মীরা মাইকিং করছিল তাদের মাইকের আওয়াজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র কানে আসলে তিনি নিজের বক্তব্যের মধ্যে বজ্রগম্ভীর কন্ঠে বলেছিলেন “খামুস”। সারা মাঠে মুহূর্তের জন্য বয়ে গিয়েছিল পিনপতন নীরবতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র এই ভাষণটি ছিল শ্রীমঙ্গলবাসীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় দিন। শ্রীমঙ্গল বাসী কাছ থেকে তাদের প্রাণের নেতাকে দেখেছিল, শুনেছিল তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র ভাষণে মানুষ এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিল যে, মুসলিম লীগের প্রতি ভয় উপেক্ষা করে দলবল নির্বিশেষে আওয়ামীলীগকে সে নির্বাচনে বিপুল ভোট প্রদান করে শ্রীমঙ্গলে জয়যুক্ত করে ছিল। তিনি আবেগমাখা হৃদয়ে বলছিলেন, ‘তাঁর পিতাও নির্বাচনের প্রচারণার ব্যয় বাবত সেই সময় ৩০০০টাকা তুলে দিয়েছিলেন।’
ঘটনাক্রম : ১৯৭১-১৯৭৪
মরহুম মো. ইলিয়াস, মো. আলতাফুর রহমান প্রমূখদের নেতৃত্বে শ্রীমঙ্গলে তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। প্রতিদিনই মিছিল মিটিং চলতে থাকে। তারই এক পর্যায়ে আসে ৭ই মার্চের সেই অগ্নিঝরা ঐতিহাসিক ভাষণ। স্থানীয় চা শ্রমিকদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্র -দা, বল্লম , দেশীয় বন্দুক, চা শ্রমিকদের তীর-ধনুক ইত্যাদি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। ২৫শে মার্চ এ স্বাধীনতার ঘোষণা তারা রেডিওতে শুনে মৌলভীবাজার থেকে শ্রীমঙ্গল আসার পথে সমস্ত ব্রিজ কালভার্ট ভেঙ্গে দেন কারণ তখন পাক হানাদাররা মৌলভীবাজার পর্যন্ত চলে আসে। হবিগঞ্জ থেকে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, সি আর দত্ত, কর্ণেল রব প্রমূখের নেতৃত্বে আনসার, পুলিশের সমন্বয়ে বাহিনী গঠন করা হয়। এম.এ রহিম সঙ্গীয় কয়েকজন নিয়ে ঐ বাহিনীতে যোগ দেন ও হালকা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাশাপাশি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বাধীন ক্যাপ্টেন আজিজ (পরে অবঃ মেজর জেনারেল মোঃ আজিজুর রহমান, বীর উত্তম ) সহসম্মিলিত বাহিনী একপর্যায়ে মৌলভীবাজার থেকে সিলেট পর্যন্ত মুক্ত করে নেয় কিন্তু পাক হানাদারদের আকাশপথে আক্রমনের ফলে পুরো বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হন এতে সিলেট থেকে ফেরার পথে সম্মুখ যুদ্ধে অনেক অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। যার মধ্যে শ্রীমঙ্গলেরও অনেকেই ছিলেন। এতে, এম এ রহিম ও অন্য কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শ্রীমঙ্গল হয়ে ভারতের কমলপুরে এবং আষাড়ামবাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই তিনি যোগ দেন শেখ ফজলুল হক মণি’র নেতৃতে গঠিত মুজিব বাহিনীতে যিনি ছিলেন অত্র এলাকায় মুজিব বাহিনীর প্রধান। সেসময় তাঁর উপর দায়িত্ব পড়ে মুজিব বাহিনীর জন্য সদস্য সংগ্রহ করা এবং ট্রেনিং ক্যাম্পে তাদেরকে পাঠানো এবং প্রশিক্ষণ শেষে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার মাধ্যমে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতা করা। মৌলভীবাজারে মুজিব বাহিনীর জেলা ভিত্তিক সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন মাহমুদুর রহমান ও ফয়জুর রহমান প্রমূখ। ভূনবীর (বাবুরবাজার) জমিদার পরিবারের সন্তান এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব গংগেশ দেব রায়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন আছকির মিয়া, সিন্দুরখাঁনের কনোজ কান্তি দেব, জমির মিয়া প্রমুখকে। তাদেরকে পরবর্তিতে মুজিব বাহিনীর জেলা ভিত্তিক প্রধানদের নিকট প্রেরণ করেন। জেলার সদস্যদের ট্রেনিং সম্পন্ন হলে মূল ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে এদের কে পাঠানো হয় আষাড়ামবাড়িতে। পথিমধ্যে তার স্থাপিত ট্রানজিট ক্যাম্পে এরা চুপিসারে খাওয়া দাওয়া বিশ্রাম নিতো। তাঁরা রাতে আসতেন এবং এই ট্রানজিট ক্যাম্পে দিন- রাত এবং পরদিন অবস্থান করতো পরবর্তি রাত্রে গাইডের মাধমে জেলার নের্তৃবৃন্দসহ তাঁরা তাদের সীমান্ত পার করে দিতেন বা প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে আসাদের দেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করতেন। তার এখনো মনে আছে প্রথম ব্যাচে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন দেওয়ান আব্দুল ওহাব, মুকিত, রানু, সমির সোম, তোফা, প্রমূখদের।  (অনেকের নাম মনে করতে পারছিলেন না) প্রায় ২৫ জনের ছিল ব্যাচটি। এই ব্যাচটি ছিল সবচেয়ে বড়। এই ব্যাচটির ৬ জন সদস্য সাঁতগাও এলাকায় রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায় হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। বাকিরা পালিয়ে যায়, কেউ কেউ ফেরত চলে আসে ভারতে। এদেশীয় রাজাকার- আলবদররা ও পাক হানাদার বাহিনী মিলে নির্মমভাবে হত্যা করে ধরা পড়া বাংলার সুর্যসন্তানদের। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শ্রীমঙ্গলের সমির সোম, মৌলভীবাজারের মুকিত ও রানু। বাকিদের নাম মনে তিনি মনে রাখতে পারেননি। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে দেশ পূনর্গঠনে অংশ গ্রহন করেন। ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে দেশে জাতির জনক ফেরার পর দেশ পূনর্গঠনের ডাক দিলে উনার আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশ পূনর্গঠনের কাজে।
আসে ১৯৭৩ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচনে আলতাফুর রহমান নির্বাচিত হন। ৭৩’ সালের নির্বাচনে ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী কাজে ভুমিকা রাখেন। ঠিক এ সময় একটি অংশ আওয়ামী ধারার রাজনীতি থেকে বিভক্ত হয়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে করে দ্বি-বিভক্ত, সুচনা হয় ছাত্রলীগ (রব)। অতপর হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।  জাসদের রাজনীতি ছিলো ধংসাত্বক ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তাদের মুল উদ্দেশ্য ছিলো। তখন জাসদ গঠনকারীদের হাতে ছিল অস্ত্র, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছাত্রলীগ জীবনবাজি রেখে চালিয়ে গেছেন নির্বাচনী তৎপরতা।
ঘটনাক্রম : ১৯৭৫
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর তৎকালীন খুনি মোস্তাক সারা দেশে আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের গ্রেফতার করে। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে শ্রীমঙ্গলে এম.এ. রহিম, ইসমাইল হোসেন সহ ৬ জন গ্রেফতার হন। তাদের চোখ বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় শ্রীমঙ্গল থানায়। নির্যাতনের ফলে তাদের কারও কারও হাত পায়ের আঙ্গুল ভেঙ্গে যায়। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন ও শহীদুল আলমের কথা উল্লেখ যোগ্য। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদেরকে জেলে প্রেরন করা হয়। ৩রা নভেম্বর জেলে থাকা অবস্থায় তাঁরা শুনতে পারেন তাদেরকে হত্যা করা হবে। ভীত সন্ত্রস্ত্র অবস্থায় কাটে তাদের দিন। অবশেষে সামরিক আদালতে বিচারের পর জেল থেকে মুক্তি পান। তিনি জেলে থাকা অবস্থায় তার প্রথম সন্তান রুম্মান আহমেদের জন্ম হয়। জেল থেকে মুক্ত হয়ে এসে তিনি তার সন্তানের ০১ মাস বয়স পান।
ঘটনাক্রমঃ ১৯৭৬ সামরিক শাসক স্বৈরাচার মেজর জিয়ার আমলে আবারো তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের পূর্বে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিনাবিচারে ৪ মাস জেল খেটে তিনি মুক্তি পান।
ঘটনাক্রমঃ ১৯৭৭-১৯৯৬
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর বিভিন্ন স্বৈরাচার শাসন আমলে তাঁরা বহু নির্যাতন, জেল জুলুম সহ্য করে দলকে ধরে রেখে ছিলেন। স্বৈরাচারী সামরিক শাসকদের দুঃশাসনের আমলে তারা স্থানীয় ভাবে নির্যাতিত হতেই থাকেন। তবুও দলকে ধরে রাখতে এবং সংঘটিত রাখতে পিছপা হননি। দলের অনেকেই বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা, রাজনৈতিক আপোষ করে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) যোগ দেয়। তিনি ও তাঁর ছোট ভাই মো. ইউসুফ আলি ,মরহুম ইসমাইল হোসেন, ডা. রমা রঞ্জন দেব সহ আরো অনেকে জান মাল, জেল জুলুমের ভয়কে তোয়াক্কা না করে রামনগর, জানাউড়া, সিন্দুরখাঁন, ছিক্কা, সাতগাঁও এলাকার অধিকাংশ ছাত্র জনতাকে দলের সংগে সম্পৃক্ত রেখে ছাত্রলীগও যুবলীগ এবং আওয়ামীলীগকে সুসংঘটিত রাখতে দূর্নিবার সংগ্রাম করেছিলেন। তারা উক্ত এলাকার ছাত্র জনতাকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংগে পাল্লা দিয়ে মাঠে-ময়দানে আওয়ামীলীগের রাজনীতিকে পরিচালিত করতেন। এজন্য জাতীয় পার্টির স্থানীয় এমপি আহাদ মিয়া ও তাঁর সঙ্গী আছকির মিয়া দ্বারা নানা রকমের নির্যাতনের শিকার হতেন। তাঁদের দোকানপাট, বাসা বাড়িতে নিয়মিত পুলিশ হানা দিত, কখনো সন্ত্রাসী আক্রমণ হতো। তখনকার সময় তাঁদের কার্যক্রম স্তব্ধ ও প্রতিহত করতে শ্রীমঙ্গলে জাতীয় পার্টি ও বিএনপি অলিখিত জোট করে সঙ্গবদ্ধ আক্রমণ পরিচালনা করতো।কিন্তু তাঁরা থেমে থাকেননি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং অনুপ্রেরণা তাঁদের জাগ্রত রাখতো সর্বদা। সে সময় জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা এম.এ. মন্নান (পরবর্তীতে আ.লীগের সম্পাদক) ,আছকির মিয়া তাদের লিডার তৎকালিন জাতীয় পার্টির এমপি আহাদ মিয়ার নেতৃত্বে ক্যাডার বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন সম্মিলিতভাবে তাঁদের নির্যাতন করে যেত। সবচেয়ে বেশি টার্গেটেড ছিলেন তিনি, মরহুম ইলিয়াস, প্রয়াত কমলেশ ভট্টাচার্য, মরহুম ইসমাইল হোসেন, মো. ইউছুব আলী, বদরুজ্জামান চৌধুরী, এমরান হোসেন চৌধুরী, প্রয়াত ডা. রমা রঞ্জন , প্রয়াত এস.কে রায়। উল্লিখিত ক্যাডারবাহিনী কর্তৃক তাদের বাসাবাড়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হতো। তারপরও তাদের কাছে তারা নতি স্বীকার করেননি। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে জনগনের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মৌলবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তারা চালিয়ে যেতে থাকেন তাদের আন্দোলন। ১৯৮৪ সালে শ্রীমঙ্গল পৌর নির্বাচনে একটি অংশের বিরোধিতা সত্বেও শ্রীমঙ্গল প্রগতিশীল জনগণের ভোটে ও গুণীজনের সমর্থন নিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান (বর্তমানে মেয়র) নির্বাচিত হন, কিন্তু তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার তা ভেঙে দেয়। এরপর আবারো ১৯৮৮ সালে পুনরায় পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৮৭ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শনে আসেন শ্রীমঙ্গলে। যাত্রা পথে তিনি শ্রীমঙ্গলে রাত্রিযাপন করেন। নেত্রী ও তার সফর সঙ্গীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাপনা ন্যাস্ত হয় তাঁর উপর। তিনি ছিলেন তখন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান। শ্রীমঙ্গলে নেত্রী বালিশিরা টি গার্ডেনের ভ্যালী ক্লাবের হ্যালিপ্যাডে চা শ্রমিকদের সর্ববৃহৎ জনসভায় যোগ দেন। জনসভায় নেত্রীর সাথে মঞ্চে অন্যান্যদের সাথে তিনি ও ছিলেন ।
১৯৮৯-৯০ সালে শ্রীমঙ্গলে স্বৈরাচারী আমলে দারুনভাবে বিঘিœত হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। তিনি বলেন, ঐ সময়ে তিনি নিজেও লাঞ্ছিত হন।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আবারো আওয়ামীলীগ নেতা -কর্মীদের উপর সারাদেশের মতো স্থানীয়ভাবেও নেমে আসে নির্যাতন। ৯১’ সালে এস.কে রায় এমপি মনোনয়ন পাওয়ার কথা থাকলেও শ্রীমঙ্গলে ইতিপূর্বে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের কারনে একটি সম্প্রদায় ভয়- ভীতিতে ভোট না দিতে পারে এই বিবেচনায় তাঁকে মনোনয়ন না দিয়ে মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ পৌরসভার টি.এন.টি ফোনে ফোন দিয়ে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের মনোনয়ন প্রদানের জন্য উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে এম.এ রহিমের সাথে আলোচনা করেন। ইতিপূর্বে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, লুটপাট, মন্দির ভাংচুর এর ফলে মানুষের মনে এক ধরণের আতঙ্ক বিরাজ করছে, এমতাবস্থায় মনোনয়ন কাকে দেয়া যায় এ প্রসঙ্গে এম এ রহিমের মতামত জানতে চান। তখন, বর্তমান সাংসদ আব্দুস শহীদের নাম উচ্চারণ করলে তিনি এতে দ্বিমত না করে উনার উপরেই সার্বিক সিদ্বান্তের ভার ছেড়ে দেন। বস্তুুত এ আলোচনার ফলশ্রুতিতেই আব্দুস শহিদ সাহেবের মনোনয়ন চুড়ান্ত হয়। আব্দুস শহীদ তখন ছিলেন কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ।
স্বর্গীয় এস. কে রায়কে মনোনয়ন না দেয়াতে শ্রীমঙ্গল আওয়ামীলীগের শীর্ষ অংশ নিষ্ক্রিয় থাকে নির্বাচনী প্রচারণার প্রথমদিকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি আর তার ছোট ভাই ইউসুফ আলী সহ অন্যান্যরা মো. আব্দুস শহীদের পক্ষে কাজ করে যান। তিনি (এম.এ.রহিম) বলেন, ‘সমস্ত নির্বাচনী ব্যয় আমরা চালিয়ে যাই। একটি টাকাও গ্রহণ করিনি বর্তমান সাংসদের নিকট থেকে। তখন তৎকালীন জাতীয় পার্টির নেতা আছকির মিয়া, আহাদ মিয়া তাদের বেপোরোয়া সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে নির্বাচনি মহড়া দিতো। তাদের বাহিনীর জন্য নির্বাচনী প্রচরণা করা দূরহ হয়ে পড়েছিল। প্রতিদিনই নানা রকমের হামলা আক্রমন হতো নৌকার পক্ষে মাঠে – ঘাটে কাজ করা নেতা কর্মীদের উপর। এরই একপর্যায়ে নির্বাচনের পূর্বরাতে নিবার্চনের মাঠ পর্যায়ে আব্দুস শহীদের প্রচারণা ও পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এমরান হোসেন চৌধুরী এবং আওয়ামীলীগ নেতা ইউসুফ আলীর উপর মারাত্মক সন্ত্রাসী হামলা করা হয়। সবাই চাঁদা তুলে এমরান হোসেন চৌধুরী এবং ইউসুফ আলীকে নির্বাচনের পোলিং এজেন্ট ও সেন্টার খরচের টাকা প্রদানের জন্য সেন্টারে সেন্টার তাদের প্রেরণ করেছিলেন। ঠিক সেসময় আছকির মিয়া-আহাদ মিয়া’র সন্ত্রাসীরা তাদের জীপ গাড়ী উল্টিয়ে দেয় হুগলিয়া নামক স্থানে এবং বেদম মারপিট করে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় দুজনকেই। এরা ফিরে না আসায় তিনি চারদিকে খোঁজ খবর করতে থাকেন এবং রাত তিনটার সময় জানা যায় সন্ত্রাসীরা তাদের জীপ হুগলিয়া নামক স্থানে উল্টিয়ে দিয়েছে, তিনি লোক পাঠিয়ে তাদের দু’জনকেই উদ্ধার করে আনেন অচেতন অবস্থায়। পরের দিন নির্বাচনে ব্যাঘাত না হওয়ার জন্য এবং কর্মীদের মনোবল না ভেঙ্গে পড়ার জন্য বিষয়টি যতদুর পারা যায় গোপন রেখে ডা. রমা রঞ্জন দেব কে দিয়ে তাদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে বাসায় পৌঁঁছে দেন। নির্বাচনে এমনোতরো অসংখ্য বাধা বিপত্তি, নির্যাতন সহ্য করে তারা নৌকার বিজয় ছিনিয়ে আনেন। কিন্তু আবারো তাঁদের ভাগ্য বিড়ম্বনায় পড়তে হয় দল ক্ষমতায় যাওয়ার পর ১৯৯৬’ থেকে। মাগুরছড়া গ্যাস ফিল্ডে অগ্নিকান্ডে অনেকের ভাগ্য খুলে যায়। অনেকেই হয়ে যান বিশাল অর্র্থের মালিক। মাগুরছড়ায় ঠিকাদারী কাজের অর্থের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এক পর্যায়ে যুবলীগ কর্মী তাজু (বর্তমানে বিএনপিতে) এবং ছাত্রলীগ নেতা আকরামের মধ্যে মনোমালিন্য বাধে এবং যুবলীগ কর্মী তাজুর হাত কর্তন করা হয়। অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ হারিয়ে আহত হন আরও কয়েকজন তৎকালীন ছাত্র-যুবলীগ নেতাকর্মী। তখন থেকেই আওয়ামীলীগ বিরোধি হাইব্রীডদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে আজও চলছে।’
ঘটনাক্রম : ২০০১
কথা ছিলো উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি প্রয়াত ডা. রমা রঞ্জন দেব মনোনয়ন পাবেন, কিন্তু তাঁকে মনোনয়ন না দিয়ে মো. আব্দুস শহিদকেই পুনরায় মনোনয়ন দেয়া হয়। তখন অত্যন্ত যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা ডা. রমা দেব’র হাজার হাজার সমর্থক-নেতা -কর্মীরা রমা দেবের বাসায় জড়ো হন। নেতা-কর্মীদের অভিমান ও ক্ষুদ্ধ হওয়ার বিষয়ে মো. আব্দুস শহীদ সাহেব কর্ণপাত করেননি বা
অভিমান প্রশমনের জন্য তিনি নেননি কোন পদক্ষেপ, এমন কোন পদক্ষেপ নিলেন না যাতে সকল বিভেদ-হিংসা- নিন্দা- যাতনা ভুলে সবাইকে নিয়ে তিনি দলকে সংগঠিত করবেন বরং ইচ্ছাকৃত দুরূত্ব তৈরি করলেন। তাছাড়া জেলা বা কেন্দ্র থেকেও এই ক্ষোভ প্রশমনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে, বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা ডা. রমা রঞ্জন দেবকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য চাপ দেয়।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন প্রার্থী হিসেবে ছিলেন এম.এ রহিম, ডা. রমা রঞ্জন দেব, মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) এবং মো. আব্দুস শহিদ। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্টারী বোর্ডে তিনি (এম.এ.রহিম) ডা. রমা রঞ্জন দেবকে সমর্থন করে তাঁর প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন এবং মুজিবুর রহমান চৌধুরি (হাজী মুজিব)ও তাই করেন। গণভবনের সেই মিটিং এ এম এ শহিদ অনুপস্থিত ছিলেন।
মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) স্বতন্ত্র ও আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ালে উল্লিখিত বিক্ষুব্ধ নেতা -কর্মীদের বিরাট অংশ তার পক্ষাবলম্বন করে। সেই নির্বাচনে ২০ হাজার ভোটে মো. আব্দুস শহীদ নিকট পরাজিত হন মুজিব। পরবর্তীতে তিনি চলে যান বিএনপিতে এবং আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁর (হাজী মুজিব) সিদ্ধান্তকে ঘৃনা জানিয়ে আওয়ামীধারার রাজনীতিতে আজো অবিচল রয়েছেন। ক্ষোভ ও অভিমানবশত যেসকল নের্তৃস্থানীয় আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতারা শুধুমাত্র পরিস্থিতির খাতিরে নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে যেতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছিলেন তাঁদের দলীয় হাইকমান্ড থেকে শোকজ করা হয়। পরবর্তীতে শাস্তি প্রত্যাহার করা হয় এবং তাঁরাও আওয়ামী লীগের জন্য অন্তঃপ্রাণ হয়ে পড়েন। উল্লেখ্য ,গত ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তৃর্ণমূলের সকল নেতা কর্মীরা নিবেদিতভাবে নৌকার বিজয়ের জন্য কাজ করে গেছেন । এম,এ রহিম ও দলের সকল কে উৎসাহিত করে গেছেন নৌকার জন্য কাজ করে যেতে। যদিও বা তাকে মো. আব্দুস শহীদ নৌকার জন্য কাজ করতে কিছুই বলেননি তথাপিও নিজের নৌকা প্রেম ও আপদমস্তক আওমীলীগের অনূভ’তি থেকেই নিজের আবস্থান থেকে তিনি কাজ করে গেছেন নৌকার বিজয়ের জন্য।
এ সময়ে তিনি আক্ষেপের সুরে বলতে থাকেন, ‘নির্মোহ সত্য বলতে রহিম কখনোই পিছপা হয়নি, কখনো হবেও না।’ একে একে জেলা আওয়ামীলীগে স্থান হয় তাঁর। কিন্তু, উপজেলা আওয়ামীলীগে আজো তাঁরা ব্রাত্য হয়ে আছেন। উড়ে এসে জুড়ে বসারা, যারা একসময় ছিলো আওয়ামীলীগ নেতা -কর্মীদের আতঙ্ক তারা ই আজ শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামীলীগের হর্তাকর্তা হয়ে পড়েছেন। বর্তমান কেন্দ্রীয় সাঃ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় শ্রীমঙ্গল আওয়ামীলীগ আজ ‘কাউয়া’ বেষ্টিত।
ঘটনাক্রমঃ ২০১১ – অদ্যবদি :
তিনি জানান ২০১১ সালে দল তাকে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা নির্বাচনের জন্য মনোনিত করে। কিন্তু কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে অপ্রকাশ্যভাবে দল তাঁর পক্ষে না থাকায়, তাঁর শত চেষ্টার পরও অদৃশ্য ইশারায় বিএনপি’র প্রার্থীর বিজয় ঘটে। সে নির্বাচনে তিনি অল্প ভোটে হেরে যান। শুধু তাই নয়, জেলা সদরসহ জেলার সবকটি পৌরসভায় আওয়ামীলীগ প্রার্থীকে সুকৌশলে ফেল করানো হয়।
আরেকটি কথা না বললেই নয়, সর্বজন শ্রদ্ধেয় জনাব আজিজুর রহমান, এক কালের জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজ ভাইকে ;- গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে সুকৌশলে ফেল করানোর উদ্দেশ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান, সকল ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার গণ আওয়ামীলীগ ঘরানার হলেও অত্র উপজেলায় আজিজ ভাই মাত্র ৪০ টি ভোট পান। পক্ষান্তরে, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বিএনপি প্রার্থী শাহীন বিজয়লাভ করে। অপরদিকে স্থানীয় আওয়ামীলীগের এক শীর্ষনেতার ভাই- আত্মীয়স্বজন প্রকাশ্যে আরেকটি উপজেলায় বিএনপি প্রার্থীর জন্য কাজ করেন। এরপরও জেলা পরিষদ নির্বাচনে নিজ গুণে আজিজ ভাই জয়লাভ করেন, কোন ষড়যন্ত্রই আটকাতে পারেনি তাঁকে ।’
জনাব এম এ রহিম তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের জন্য অনেক জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করে গেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একসময় যে প্রতিপক্ষের হাতে তিনিসহ তাদের পরিবারের অনেক সদস্য এবং আওয়ামীলীগ – যুবলীগ – ছাত্রলীগ নেতা কর্মী ও নেতা কর্মীদের পরিবার নির্যাতিত হতেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় অজ¯্র মিথ্যা মামলা দিয়ে যারা হেনস্থা করতে চাইতেন, জেল খাটাতেন আজ তাঁরাই শ্রীমঙ্গল আওয়ামীলীগের উঁচু পদে আসীন। একসময় তারা অন্য দলে অর্থাৎ আওয়ামীলীগ বিরুধি দলে থেকে নির্যাতন চালাতো আজ আবার তাঁরাই দলের ভেতরে ঢুকে প্রকৃত নেতাকর্মীদেরকে ক্ষমতার দাপটে দুরে ঠেলে দিয়েছে। উপজেলা আওয়ামীলীগের কার্যালয় নামে আছে কার্যত নেই।’
তিনি মনে করেন যে, এলাকায় দিনে দিনে প্রকৃত আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা বিপর্যস্ত ও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। এককেন্দ্রীক ক্ষমতাবলে নতুন নের্তৃত্ব গড়ে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। অনুপ্রবেশকারীদের দলে ঢুকানো হয়েছে এবং হচ্ছে। দলের সাংগঠনিক শক্তি নিঃশেষ করে দেয়া হচ্ছে। আজ তৃণমূল পর্যায়ে পকেট কমিটি তৈরি করে এবং দলের প্রকৃত নেতা কর্মীদের বাদ দিয়ে দলকে দুর্বল করে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে।
ভোটব্যাংক  :
তিনি বলেন, চা বাগানের জনগণ, নৌকার সবচেয়ে আপনজন। কিন্তু, সম্পুর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে এলাকার চা জন গোষ্ঠী, বঙ্গবন্ধুর নৌকার একনিষ্ট সমর্থক, আওয়ামীলীগের প্রবলশক্তি হিসাবে খ্যাত চা শ্রমিক সম্প্রদায়কে সুকৌশলে দ্বিধাবিভক্ত করা হয়েছে। যা দলের জন্য বিরাট হুমকি স্বরূপ । অভিলম্বে তা দুর করতে হবে ভোট ব্যাংক রক্ষার স্বার্থে । তিনি জানান যে , এ ব্যাপারে তিনি জেলা আওয়ামীলীগের সভায় উত্থাপন করেছেন ।

১৯৬৮ সাল থেকে অদ্যবধি দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ তিতীক্ষা জেল জুলুম নির্যাতন সহ্যের পর প্রাণের সংগঠন শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের আওয়ামীলীগের বর্তমানের এমন সাংগঠনিক ভাবমূর্তির সংকটকালে নিশ্চুপ থাকতে পারেননি তিনি। এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশি। ইতোপূর্বে তিনি একাধিক বার দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। দল থেকে তাকে প্রতিবারই পত্র মারফত সান্তনা দিয়ে অনুরোধ করা হয় এবং প্রতিবার ই দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে তিনি তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। তিনি বলেন , স্থানীয় পর্যায়ের অবস্থা ও জনগণের মনের ভাব বিবেচনা করে, সর্বোপরি শ্রীমংগল ও কমলগঞ্জের আওয়ামীলীগের বর্তমান সাংগঠনিক ভাবমূর্তির সংকট নিরসনে কেন্দ্র / জেলা পদক্ষেপ নিলে নৌকার বিশাল বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না।

পরিশেষে এই তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নৌকার বিজয়কল্পে দলের সবার করণীয় উল্লেখ করেন :
১. দলের সকল স্তরের নেতা -কর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক পুনঃস্থাপন।
২. বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের সারাদেশের সকল উন্নয়নচিত্র তৃণমুলে পৌঁছানো ও সবাই মিলে একসাথে নৌকার বিজয়কল্পে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করা।
৩. কার্যালয়ে নেতা -কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতা -কর্মীদের সরব উপস্থিতিসহকারে শেখ হাসিনার গৃহীত ১০টি মেগা প্রজেক্টসহ সকল উন্নয়ন ও সেবামুলক কার্যক্রমের বহুল প্রচার।
৪. অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দল থেকে সরিয়ে ফেলা।
৫. স্থানীয় রাজনীতিতে নেতাকেন্দ্রীক কোন আন্তঃবলয় বা কথিত গোষ্টি রাজনীতি নয়, মনোভাব থাকবে- সবাই শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগের কর্মী ।
৬. দলীয় সাংগঠনিক কর্মকান্ড জোরদার ও সুষমকরণ, এলাকার উন্নয়ন তরান্বিত করার স্বার্থে দলের সকল স্তরের নেতা – কমী – সমর্থকদের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মতামত প্রকাশের সুযোগ।
৭. আগামী দিনের রাজনীতিতে শিক্ষিত, মার্জিত, রাজনীতি সচেতন, আইসিটি নির্ভর প্রকৃত আওয়ামী পরিবারের তরুন -তরুনীদের দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি। সমাজের সকল স্তর/পেশা/ সম্প্রদায়ের মধ্যে সুস্থ্যধারার রাজনীতির পরিচয় ঘটানো।
৮. সকল শ্রেণীর জনগণের সাথে নেতা – কর্মীদের অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি। বৃহত্তর স্বার্থে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর ব্যক্তিগত স্বার্থ এর উর্ধে উঠে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত সোনার বাংলা বিনিমার্ণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
৯. আওয়ামীলীগের নেতা – কর্মীদের মধ্যে বিভেদ চলমান রেখে যারা ফায়দা হাসিলের জন্য চাটুকারিতায় ব্যস্ত তাদেরকে একযোগে সকল নেতা -কর্মীদের ত্যাগ করা।
১০. সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। দুর্নীতিবাজ ও পিঠ বাঁচাতে রঙ পাল্টানোহাইব্রীডদের সরিয়ে দিয়ে দলে সম্মিলিত সুন্দর সম্পর্ক সৃষ্টি।
১১. সবাই একসাথে হাতে – হাত ধরে আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব। ইনশাল্লাহ…
সাক্ষাৎকার ও বক্তব্য প্রদান করেছেন –

(এম এ রহিম, বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা, সদস্য, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগ,
সাবেক পৌর চেয়ারম্যান, শ্রীমঙ্গল পৌরসভা।)

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •