কাশিমপুর পাম্প হাউজ ৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি : ১১জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

October 27, 2020, এই সংবাদটি ৩২৭ বার পঠিত

ইমাদ উদ দীন॥ সেচ পাম্প ক্রয়ে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা লুপাট। এমন খবরে হতবাক উপকারভোগীরা। স্থানীয়রা বলছেন ওই লুপাটের টাকা দিয়ে সম্ভব ছিলো জরাজীর্ণ পুরো মনু প্রকল্পের উন্নয়ন। লুপাটের এমন খবর চাউর হলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপকারভোগীসহ এজেলার সর্বস্থরের মানুষ। নড়েচড়ে বসে দুদকও। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর ওই লুটপাটের বিরুদ্ধে দুদক বাদী হয়ে ১১ জনের উপর মামলা দায়ের করে। এমন পুকুর চুরি দূর্নীতির ঘটনায় কাউয়াদিঘি হাওর পাড়ের বাসিন্দারা ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করে জানালেন শুধু ওই লুপাটের টাকা দিয়েই পুরো মনু প্রকল্পের বয়ে চলা নানা সমস্যার সমাধান হয়েও টাকা বাঁচত। আর স্থায়ী লাগব হতো তাদের কৃষিজমি চাষাবাদের দীর্ঘদিনের বয়ে চলা দূর্ভোগ। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কাউয়াদীঘি হাওর এলাকার কাশিমপুর পাম্প হাউজ।

১৯৭৫-৭৬ সালে ২৪ হাজার ১শ ৭৮ হেক্টর এলাকার ১৯ হাজার ২শ ২৮ হেক্টর চাষযোগ্য জমির বন্যা নিয়ন্ত্রন, নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থা  করাই ছিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার হাওরের কৃষি জমিতে চাষাবাদ ওই পাম্প হাউজের সেচেঁর ওপর নির্ভরশীল। সেঁচ পাম্প সচল থাকলে জমি আবাদ হয়। কৃষকের গোলাভরে ধান ওঠে। আর সেঁচ পাম্প অচল থাকলে পানিতে তলিয়ে থাকে হাওরের কৃষি জমি। কৃষকের স্বপ্ন প্রত্যাশা হয় ম্লান। কাউয়াদিঘি হাওর পাড়ের কৃষকরা এমন অযাচিত দুর্যোগ ও দূর্ভোগ লাগবের দাবিতে দীর্ঘদিন  থেকে আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট নানা দপ্তরে দৌড়ঝাপ করেন। কারন হাওরের জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য পানি সেঁচের ব্যবস্থা থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রভাবশালীদের চাপ, বিদ্যুৎ সমস্যাসহ নানা কারণে হাওর থেকে পানি সেঁচ দেয়া হয়নি। এ অবস্থায় কাশিমপুর পাম্প হাউজ আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। টেন্ডার প্রক্রিয়ার পর ১৯ জুন ২০১৬ সাল থেকে কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ৩০ জুন ২০১৮।

চলতি মৌসুমে কাশিমপুর পাম্প হাউজে স্থাপন করা ৮টি নতুন সেঁচ পাম্পের কারনে এলাকার কৃষকেরা তাদের অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনেন। নতুন মেশিন স্থাপন করায় স্থানীয় উপকার ভোগী কৃষক বেজায় খুশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায় সেচঁ ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়ায় এবছর মৌলভীবাজার জেলায় ১ লাখ ১ হাজার ৫ শ হেক্টর জমিতে রুপা আমনের চাষাবাদ হয়েছে। আর শুধু কাশিপুর পাম্প হাউজের আওতায় কাউয়াদিঘি ও তৎসংলগ্ন মনু প্রকল্পে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে  রুপা আমনের চাষাবাদ হয়েছে। এবার সেঁচসহ অন্যান্য সুবিধা থাকায় প্রায় ৬শ ৫০ হেক্টর অনাবাদি জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। যাতে প্রায় ৫৫ হাজার মে: টন ধান বাড়তি উৎপাদন হবে।  কাউয়াদিঘি হাওর পাড়ের কৃষকদের দীর্ঘ প্রত্যাশিত এই প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়াতে এমন চমকপ্রদ সুফল পেলেও বাস্তবায়িত হওয়া ওই প্রকল্পে হয়েছে বড় ধরনের দুর্নীতি। প্রকল্পে ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকার পাম্প কেনায় দেখানো হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।

মনুনদী সেঁচ প্রকল্পের অধীনে মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরের ২৪ হাজার ১৭৮ হেক্টর এলাকার ১৯ হাজার ২২৮ হেক্টর চাষযোগ্য জমির বন্যা নিয়ন্ত্রণ,নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থা প্রদান করার লক্ষ্য নিয়ে কাউয়াদীঘি হাওরের কাশিমপুর পাম্পহাউজে দ্বিতীয় বারের মতো স্থাপন করা হয় নতুন পাম্প মেশিন। এই প্রকল্পে ৮টি পাম্পের মূল্য দেখানো হয় ৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। তদন্তে যার প্রকৃত মূল্য পাওয়া যায় ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এই ৩৪ কোটি ৪২ লক্ষ ১৭ হাজার ১শ ৬ টাকা ২০ পয়সা দুর্নীতির অভিযোগে ১১ জনকে মামলায় আসামী করা হয়েছে।

আসামীরা হলেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সিগমা ইঞ্জিনিয়ারস লিমিটেডের এমডি প্রকৌশলী সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল,চেয়ারম্যান প্রকৌশলী সৈয়দ আরশেদ রেজা, জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আব্দুস সালাম,সাবেক ত্বত্তাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক (পাউবো, মৌলভীবাজার) এস.এম.শহীদুল ইসলাম,সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী যান্ত্রিক (পাউবো) মৌলভীবাজার, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক)  পাউবো কেন্দ্রীয় মেরামত বিভাগ ঢাকা, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) পাউবো পাম্প হাউজ নারায়ণগঞ্জ, নির্বাহী প্রকৌশলী পাউবো ঢাকা  মো: আব্বাস আলী, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ডিজাইন সার্কেল-৬ পাউবো ঢাকা, সাবেক উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) পাউবো বিদ্যুৎ বিভাগ (চাঁদপুর), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পূর্ব সার্কেল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তেজগাঁও ঢাকাসহ ওই ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। দুদকের হবিগঞ্জ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ পরিচালক কামরুজ্জামান মুঠোফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দুদক হবিগঞ্জ সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে জানা যায় দুদক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলানং দুদক তদন্ত-৫, তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২০। মামলার সময় ১১ টা ৩০ মিনিট। ‘মনু নদীর সেঁচ প্রকল্পের আওতাধীন কাশিমপুর পাম্প হাউস পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় পাম্প কেনায় প্রাথমিক তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার অভিযোগে এই মামলা করে দুদক।

মামলার এজাহারে সূত্রে জানা যায় আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে কাশিমপুর পাম্প হাউস পুনর্বাসন প্রকল্পের জন্য প্রকৃত দরের চাইতে বেশি দরে পাম্প কিনেছেন। অনুসন্ধানে ৮টি পাম্পের প্রকৃত মূল্য পাওয়া যায় ২০ কোটি ৪১

লাখ টাকা। অথচ বিল হিসেবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সরকার থেকে আদায় করেছে ৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এতে সরকারের ৩৪ কোটি ৪২ লাখ সতেরো হাজার একশ ছয় টাকা বিশ পয়সা ক্ষতি হয়েছে। তারা দন্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

এবিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব, জেলা বন্যা প্রতিরক্ষায় প্রেশার গ্রুপের সভাপতি সাংবাদিক বকশী ইকবাল আহমদ ও হাওর বাচাঁও , কৃষক বাচাঁও সংগ্রাম কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন আহমদ বাদশা পৃথক ভাবে মুঠোফোনে জানান এই বড় ধরনের আর্থিক দূর্নীতি কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা দুদককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন শক্তভাবে আইনী প্রক্তিয়ায় তা মোকাবেলা করে এই দূর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা নাহলে স্থানীয় উপকারভোগীরা এর বিরুদ্ধে দূর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে এর জবাব দিবে।

এবিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ আখলাকুল আম্বিয়া বলেন দুদক আইনী পদক্ষেপ নেওয়ায় ধন্যবাদ জানাই। তবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে এই রাগবোয়াল দূর্নীতবাজরা যেন রেহাই না পায়। আমরা এই দূর্নীতিবাজদের যথাযোগ্য শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •