ভাষার-চর্চা ও শিক্ষার গতি-প্রকৃতি

August 15, 2016,

মোহাম্মদ আবদুল খালিক॥ ভাষা মানুষের জীবনে মূল্যবান সম্পদ হিসেবেই বিবেচিত। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন বা প্রকাশ করার অন্যতম বাহন ভাষা,  প্রকৃতির এ এক অদ্বিতীয় দান। আমাদের তো জানা-ই আছে বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্যে, নিজস্ব ভাষার চর্চা নিশ্চিতকরণ ও তার অধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনে আমাদের মতো মূল্য দিয়েছে জগতের খুব কম ভাষাভাষি অঞ্চলের মানুষ। বংশ পরম্পরায় নিরলস নিষ্ঠার সাথে ভাষা চর্চার মাধ্যমে তার প্রসার ও সমৃদ্ধিকরণ এবং সকল প্রকার আগ্রাসন ও দুর্বলতা থেকে এটাকে রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা থেকেই আমাদের পূর্বসুরীদের এ রক্ত ঝরানো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বেশ দীর্ঘ সময়ের পথ অতিক্রম করার পরও কী প্রশ্ন থেকে যায় নাÑআমরা আমাদের ভাষাকে সর্বস্তরে প্রয়োগ ও যথার্থ চর্চার মাধ্যমে কতটুকু সমুন্নত রাখতে পেরেছি বা পারছি? পূর্বসুরীদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকুইবা আন্তরিক? স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা পূরনের লক্ষ্যের দিকে সঠিকভাবে অগ্রসর  হচ্ছিতো?
ভাষা-সংগ্রামের মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য আমরা জানি। রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা, যথাযথ চর্চা ও বিশুদ্ধ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি গতিশীল সুন্দর ভাষা হিসেবে এর অবস্থানকে সুদৃঢ় করা এবং  প্রসার ঘটানো। এ লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের দিকে যে আমরা অগ্রসর হইনি বা হচ্ছি না তা বলার সুযোগ নেই। তবে যে হারে, যে গতিতে, যে দৃঢ় ইচ্ছা ও সযতœ পরিচর্যায় এগুনো প্রয়োজন সেভাবে কী আমরা অগ্রসর হচ্ছি বা মনোযোগ দিচ্ছি? কেনো জানি মনে হয় সর্বস্তরে বাংলা ভাষার চর্চা, প্রয়োগ ও প্রচলনের ক্ষেত্রে আমরা একটু অমনোযোগী, তাচ্ছিল্যপ্রবণ ও অবহেলাক্রান্ত হয়ে উঠছি। আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছেনা বা বিলম্বিত হচ্ছে। পারিপাশির্^ক অবস্থা বিবেচনায় লক্ষ্য করলে দেখব শিক্ষাক্ষেত্রে যেমন তেমনি ব্যক্তিগত পর্যায়েও মাতৃভাষার শুদ্ধচর্চা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে হয়ে উঠছে না। আমদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত ভাষা, ছাত্র-ছাত্রীসহ শিক্ষিতজনের বিশুদ্ধ ভাষা বা বানানচর্চার আগ্রহ এবং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবহেলার বিষয়টি কখনো কখনো আমাদের হতাশাক্রান্ত করে। স্কুল-কলেজগামী শিশু-কিশোর, জ্ঞানী-গুণি মানুষের আবাসস্থল, কর্মক্ষেত্র এবং চলাচলের প্রাণকেন্দ্র শহর-বন্দরে অনেক দেশি-বিদেশি বাহারি নামের দৃষ্টিনন্দন, সচিত্র সাইনবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদি প্রতিনিয়ত আমাদের নজরে আসে। আর এগুলোর অধিকাংশের বানানগত ভুল কিংবা যথার্থ শব্দ প্রয়োগ ও বাক্য গঠনের  অসঙ্গতিজনিত ত্র”টি-বিচ্যুতি দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। অবশ্য অনেকে এ বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রায়শ লেখেন এবং মুখে মুখে বলেনও। কিন্তু  অভ্যাসগত কারণে আমাদের পরিবর্তন খুবই সামান্য। চোখে পড়ার মতো অশুদ্ধি সংশোধনের ব্যাপারে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বা নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যথাযথ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে পারেন। সকলের সচেতন উদ্যোগে এর মাত্রা হয়তো কমানো সম্ভব। প্রতিদিন দৃশ্যমান ভুলের সাথে বসবাস থেকে মুক্তি পাবে শিশু-কিশোরসহ বিপুল সংখ্যক নাগরিক। আমরা নীতিগতভাবে বিদেশি ভাষা শেখার বা শেখানোর বিরোধী নই। তবে ক্ষেত্র বিশেষে, কোনো কোনো ভাষার প্রতি যতটা গুর”ত্ব আরোপ করি বা প্রাধান্য দেই মাতৃভাষার চর্চার ক্ষেত্রে অবহেলা কিংবা তাচ্ছিল্যের হার যেন ততটাই বাড়ে। এতে করে আখেরে কোনো ভাষাই আমাদের সঠিকভাবে আয়ত্ত্বে আনা সম্ভব হয়ে উঠে কি না কিংবা ভালভাবে নিজের ভাষা না জানা মর্যাদা বৃদ্ধি করে কিনা তাতে সন্দেহের যথেষ্ঠ অবকাশ থাকে ।
শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা অগ্রসর হচ্ছি এটা যেমন সত্য তেমনি অনেকেই মনে করেন নানাবিধ সংকটাক্রান্ত একটা জগাখিঁচুরি অবস্থার মধ্য দিয়েই যেন আমাদের শিক্ষার এ অগ্রযাত্রা। এক্ষেত্রে মুখ থুবরে পড়ার বা ধস নামারও আশক্সক্ষা করেন কেউ কেউ। একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন বিজ্ঞান-মনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরিবর্তে আমরা নানা পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম ও বহুমুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষার বেড়াজালে শিক্ষাকে কোনো বদ্ধ জলাশয়ে আবদ্ধ রাখার প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত আছি কি না তাও ভেবে দেখা উচিত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনার গতি-প্রকৃতি নিয়ে অনেকের ধারণা, গণনাগত বৃদ্ধির তুলনায় গুণগত সমৃদ্ধির হার খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বাণিজ্যিকীকরণের এই যুগে  চিত্তহরণকারী, দানবীয় এবং মনোমুগ্ধকর বিজ্ঞাপনী সা¤্রাজ্যে বিদ্যা-শিক্ষা এখন ক্রয়যোগ্য দামী পণ্য হিসেবেই গণ্য হচ্ছে যেন। চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন মূল্যমানে তা কিনে নিতে হয়। শহরে কিংবা গ্রামে-গঞ্জে, যত্র তত্রÑরাস্তার ডানে-বামে অথবা মাথার উপরে যেমন বাতাস আটকে দিচেছ বিচিত্র রঙের এবং আকর্ষণীয় ছাড়ের শিক্ষাপণ্যের ব্যানার ও পোস্টারসমূহ তেমনি দেওয়ালে দেওয়ালে মশারকয়েল, সাবান কিংবা প্যাম্পারস এর সচিত্র বিজ্ঞাপনের মতো বাহারি নামের বাণিজ্যিক বিদ্যা বিতরণ কেন্দ্রগুলোর নামও শোভা পাচ্ছে। এটা আজ আর শ্রদ্ধায় ও একনিষ্ঠ চর্চায় অর্জিত অমূল্য ধন নয়। রেডিমেট শিক্ষা বিক্রির সারি সারি সুসজ্জিত বিপনি বিতানগুলোতে সপরিজন বিদ্যার্থীদের সকাল-সন্ধ্যার মহাসমাবেশের মাধ্যমে আহরিত বিদ্যা, তাদের লুট হওয়া শৈশব-কৈশোরের বিনিময়ে ক্রয় করা শিক্ষাই আজ আমাদের বড় বেশি প্রত্যাশিত সামগ্রী। মানসিক এবং মানবিক চিত্তবৈকল্যের বিনিময়ে তা অর্জিত হলেও এতে কোনো আপত্তি নেই। শান্তনু কায়সারের একটি লেখায় পড়া কাজী নজর”ল ইসলামের কবিতার প্যাড়ডি অংশটুক মনে পড়ে Ñ‘হায়রে বিদ্যার আলয়, নাকি বিদ্যাÑলয়, তোমার মিনারে চড়িয়া ভ- গাহে স্বার্থের জয়’! লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীর চেয়ে তাদের অভিভাবক হিসেবে আমাদের আগ্রহের মাত্রাই যেন একটু বেশি। আলোঝলোমলো শপিং সেন্টারের সুদৃশ্য মোড়কের দামী পণ্য ক্রয় করার প্রতিযোগিতার মতো শিক্ষা ক্রয়-বিক্রয়ের এ এক মহোৎসবে আমরা সবাই মেতে উঠেছি। এ ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। অনেক আগেই শিক্ষার হের ফের প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গিয়েছেন, ‘ছেলে যদি মানুষ করিতে চাই, তবে ছেলে বেলা হইতেই তাহাকে মানুষ করিতে আরম্ভ করিতে হইবে, নতুবা সে ছেলেই থাকিবে, মানুষ হইবে না। শিশুকাল হইতেই স্মরণশক্তির উপর সমস্ত ভর না দিয়া সঙ্গে সঙ্গে যথাপরিমাণ চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির স্বাধীন পরিচালনার অবসর দিতে হইবে। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেবলই লাঙল দিয়া চাষ এবং মই দিয়া ঢেলাভাঙা, কেবলই ঠেঙা লাঠি, মুখস্থ এবং একজামিনÑআমাদের এই ‘মানব-জনম’ আবাদের পক্ষে, আমাদের এই দুর্লভ ক্ষেত্রে সোনা ফলাইবার পক্ষে যথেষ্ট নহে’।
আশক্সক্ষা হচ্ছে, এই যে শহরের আনাচে কানাচে, পাড়ায় মহল্লায় কিংবা গ্রাম-গঞ্জের এখানে সেখানে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক লাইসেন্সপ্রাপ্ত অথবা লাইসেন্সবিহীন বাহারি নামের জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক মানের নামাবলীখচিত মিনি কিংবা বৃহৎ শিক্ষাগৃহ অথবা কোচিং সেন্টারগুলো গড়ে উঠছে তার পেছনে কোনো অশুভ উদ্দেশ্য বা রহস্য লুকিয়ে আছে কি না! এখানে ছেলেমেয়েরা কী শিখছে, কী শেখানো হচ্ছে এবং কারাইবা শেখাচ্ছেন?  এসব ব্যাপারে খোঁজ-খবর কিংবা তদারকির কোনো ব্যবস্থা আছে কি?  অনিয়ম কিংবা অসাধুতার জন্য তাদের দায়বদ্ধ হতে হয় কি না তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে বিশাল বিশাল স্থাপনার সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের হাল-হকিকত এবং সামগ্রিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সাধারণ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী কিংবা অভিভাবকদের নেতিবাচক মনোভাবটা আজকাল আমাদের আরো বেশি ভাবিত, আতক্সিক্ষত করে তুলে। লোকমুখে যে জিনিষটা ব্যাপকভাবে আলোচিত এবং প্রচারিত তা হলোÑস্কুল কলেজে পড়াশুনা নাকি একেবারেই হচ্ছেনা। শিক্ষক সংকট কোথাও কোথাও মারাত্মক। আবার যারা আছেন তাঁদের অনেকেই নাকি কোচিংকেন্দ্রিক, কেউ কেউ আধিপত্যবাদী দলীয় রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্তÑসুতরাং নিজের পেশাগত অবস্থানের কথা ভুলে গিয়ে সুবিধানুযায়ী রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা এবং অন্যদের উপর ছটাবরদারী করতেই ব্যস্ত। প্রয়োজন্রে নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলও মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র। শিক্ষাদান এবং গ্রহণ বহির্ভূত অন্যান্য নানামুখি কাজেকর্মেও নাকি ব্যস্ত থাকেন অনেকে। সুধীর চক্রবর্তীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ধৃত করেছেন শান্তনু কায়সারÑ‘সরকারী কলেজের তানপুরায় ধুলো জমেছে, তার গতি শ্লথ হয়ে গেছে, কাঁটালতায় আগাছা ভরে গেছে। আদর্শ নেই, উদ্দীপনা নেই। ভালো কাজের পারিতোষিক নেই, যোগ্যের সম্মান নেই, বিদ্বানের চেয়ে করিৎকর্মার সংখ্যা বাড়ছে। পা-িত্যের চেয়ে রাজনীতির চর্চা, শ্রমের চেয়ে নৈষ্কর্ম, শান্ত আত্মমগ্ন জীবনের চেয়ে ধাবন্ত ঘোরাঘুরি কুরে কুরে খাচ্ছে শিক্ষিত মানুষকে।’ শান্তনু কায়সার তাঁর মন্তব্যে বলছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা কি মূলগতভাবে আমাদেরও নয়? বরং নয় কি তা আরো অনেক মন্দ?’ কিন্তু এসবের দেখভালের কেউ আছেন কী? আমরা নানা সময়ে বিভিন্ন পরিপত্র জারি করে কিংবা নতুন নতুন আইন-কানুন তৈরি করেও তা রোধ করতে পারছি কী? এব্যাপারে আর কথা না বাড়িয়ে বলতে চাই আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকার আগ্রহ কেনো হারিয়ে ফেলছে দিনে দিনে? কেনো হয়ে উঠছে গুর”গৃহ কিংবা কোচিং সেন্টারমুখি সকাল থেকে রাত অবধি? এখানেই আমাদের শক্সক্ষা আরো তীব্র হয়ে উঠে। নানাক্ষেত্রে গভীর ষড়যন্ত্রের কথা শুনি এবং বলি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার হাটু ভেঙ্গে দিতে পরিকল্পিত এও কোনো নতুন ষড়যন্ত্র কি না? প্রতিষ্ঠান বিমুখতার কথা শুনে কখনো কখনো বিপন্ন বিষ্ময়ে ভাবিÑকী হবে তাহলে শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীহীন শিক্ষালয়ের বিশাল বিশাল ভবনগুলোর? কাদের দখলে যাবে কিংবা কাদের পদচারণায় মুখরিত হবে এ জ্ঞানচর্চাকেন্দ্রসমূহ? বিষয়টি গুর”ত্বের সঙ্গে একটু ভাবা দরকার।
‘শিক্ষা সুযোগ নয় অধিকার’। সকলের জন্য সমান এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। সুতরাং যথাযথভাবে মানুষের এ অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়-দায়িত্বও পুরোপুরি নেবে রাষ্ট্র এবং সরকার । যেনতেন প্রকারে খুদকুঁড়ার মতো ছিটিয়ে-ছড়িয়ে দেয়াতেই এ দায়িত্ব শেষ হবে না। জবাবদিহীতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে সকল স্তরে। তানাহলে হযবরল অবস্থা তৈরি হতে পারে। একটা বিষয় লক্ষ্য করলে আমরা দেখব, অতীতের তুলনায় বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার দ্বার আমাদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। সরকারি,  বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয় ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন ডিগ্রি কলেজেতা উপজেলা সদর থেকে শুর” করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজগুলোতেও অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু হয়েছে বা হচ্ছে। এটা একদিকে আমাদের জন্য  গৌরবের, আনন্দের এবং অন্যদিকে হতাশার কারণও বটে। গৌরব এবং আনন্দ এ জন্য যে উচ্চশিক্ষার সুবিধা আমাদের একেবারে দোরগোড়ায় এসে পৌঁচেছে। রাষ্ট্র এবং সরকার এ সুযোগটা আমাদের করে দিয়েছেন। ব্যাপক হারে উচ্চ শিক্ষা অর্জনে আজ আমাদের কোনো বাঁধা নেই, বেগ পেতেও হচ্ছে না। আর হতাশার কারণ এ জন্য, এটা কী আসলেই মানসম্মত উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নাকি অন্য কোনো মতলব এর পেছনে কাজ করছে। অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালুর পূর্বে যেসব সুযোগ সুবিধা বা পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন ছিল, সরকার তা যথাযথভাবে করতে  পেরেছেন কি? আমাদের বিশ্বাস অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ সৃষ্টি সম্ভব হয়নি এবং বিভাগওয়ারী শূন্য পদে পদায়ন ও অনেকক্ষেত্রে পদায়নকৃত শিক্ষকদের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অগনিত শিক্ষক এমপিওভূক্তি থেকে বঞ্চিত। শ্রেণিকক্ষ, ব্যবহারিক ক্লাসের স্থান এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধা বা গ্রন্থাগার ওইভাবে গড়ে ওঠেনি, বাড়েনি বই পুস্তকের সংগ্রহ। ফলে বিশেষ বিষয়ের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থেকে, বিষয়ের মূল কিংবা সহায়ক পুস্তকের সঙ্গে পরিচিত বা সম্পৃক্ত না হয়ে সাড়াবছর ‘মুখপুস্তকে’র [face book] নিরবচ্ছিন্ন চর্চা করেও পরীক্ষার পূর্বমূহূর্তে দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সহজলভ্য উচ্চশিক্ষার সোপান, সুদৃশ্য রেডিমেট নোট বা গাইড বইয়ের বদৌলতে বেশ ভালোভাবেই হয়তো অনার্স-মাস্টার্স এর সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারছে। প্রাথমিক ও নি¤œমাধ্যমিক পর্যায়ে নোটবই, গাইডবই আইনত নিষিদ্ধ হলেও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে তা মহাসমারোহে বহাল তবিয়তেই সারা দেশব্যাপী বিদ্যমান। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারীদের পাঠাভ্যাস যেভাবে গড়ে ওঠার কথা ছিল, বিষয়ের গভীরে যেভাবে প্রবেশ করা উচিৎ ছিল, মানবিক এবং নৈতিক চেতনাকে যেভাবে জাগ্রত, ধারণ এবং লালন করার প্রয়োজন ছিল, সৃজন ও মননের উৎকর্ষ সাধনে যতটুকু কার্যকরি ভূমিকা নেওয়া যৌক্তিক ছিল তা অনেক ক্ষেত্রে সেভাবে হয়ে উঠছে বলে অনেকে মনে করেন না। ফলে স্বল্প শ্রমে একটা উচ্চশিক্ষিত বিশাল বেকার সম্প্রদায় তৈরি হচ্ছে। যাদের বৃহৎ অংশই উচ্চতর সনদপত্র নিয়েও প্রত্যাশিত চাকুরি বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করতে পেরে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন এবং প্রতি বৎসর নতুন নতুন বেরিয়ে আসা উচ্চশিক্ষিতের বৃহৎ সংখ্যা সংযুক্ত হয়ে বেকারের মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী ‘সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টি’ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়ণের কথা আমরা শুনে আসছি দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনের তুলনায় সম্প্রসারণের গতি কেমন এবং  শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের এ ক্ষেত্রে কতটুকুইবা অনুপ্রাণিত, উদ্বুদ্ধ করা যাচ্ছে এ প্রশ্নটা আমাদের মধ্যে থেকেই যায়। আমরা মনে করি ভাষার শুদ্ধ চর্চা যেমন বিশুদ্ধ দেশপ্রেমের পরিচায়ক হতে পারে তেমনি যথার্থ শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে দেশকে, দেশের মানুষকে, সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্যকে গভীরভাবে ভালোবাসা এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তাই শিক্ষাকে, শিক্ষার মাধ্যমকে সর্বাধিক গুর”ত্ব দিয়ে গভীর মনোনিবেশ সহকারে ও পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। মেধার লালন এবং সৃজন ও মননের মৌলিক বিকাশে গভীর পাঠ ও অধ্যবসায়ের বিকল্প কোনো কোণাকুণি পথ আছে বলে মনে হয় না।
লখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •