মৌলভীবাজারে ৩ হাজার হেক্টর অনাবাদি জমিতে বোরো আবাদ ॥ বাম্পার ফলনে খুশি কৃষকরা

April 21, 2021, এই সংবাদটি ২১০ বার পঠিত

বিকুল চক্রবর্তী করোনাকালে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে ব্যপক সফলতা পেয়েছে মৌলভীবাজার কৃষি বিভাগ। বোরো চাষের আওতায় আনা হয়েছে অতিরিক্ত ৩ হাজার হেক্টর জমি। যার বেশিরভাগ জমিতেই ফলানো সরকারী প্রনোদনার হাইব্রীড ধান। যার বাম্পার ফলনে কৃষক, কৃষি বিভাগ মহা খুশি। এখন শুধু বাড়তি উৎপাদিত ধানগুলো ঘরে তুলে নেয়ার প্রতিক্ষায় কৃষকরা।

পানির অভাবে প্রতিবছর বোরো মৌসুমে জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে। এরকমই একটি এলাকা জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের মীননগর। যেখানে শত শত হেক্টর জমি পানির অভাবে বোরো মৌসুমে পতিত থাকে। কিন্তু একটু পরিশ্রমে পাল্টেগেছে এর চিত্র। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কাজী লুৎফল বারী, শ্রীমঙ্গল,উপজেলার  কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন মোনালিসা সুইটিকে নিয়ে জায়গাগুলো ভিজিট করে মীন নগরের এক পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শাওন ছড়াকে টার্গেট করে এই জায়গাটি চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেন।

আর করোনা মহামারিতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কৃষকদের সাথে একাধিক বৈঠক করে পাশবর্তী শাওন ছড়া থেকে পানি এনে এক সময় এই জমিগুলো চাষের আওয়তায় আনতে সক্ষমহন শ্রীমঙ্গল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

তবে পতিত পড়া এই জায়গা চাষে কৃষকদের উৎসাহ দিতে কৃষি বিভাগ কৃষকদের বিনামুল্যে হাইব্রীড ধান, সার, শাওন ছড়া থেকে পানি আনার জন্য ছড়ার উপরের অংশে বাঁধের ব্যবস্থা, ফিতা পাইপ ও এলএলপি এর ব্যবস্থা করে দেন। হাইব্রীডের সাথে কিছু ধান ব্রিধান৮৮,ব্রিধান ৮৯ ও ব্রিধান ৯২ জাতের বীজ দেন। কৃষকরা অনেকটা উৎসব আমেজে এই পতিত জমিতে সরকারের দেয়া এই ধানগুলো চাষ করেন। চাষাবাদ কালে জমিগুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি  রাখেন কৃষি বিভাগও। আর বীজতলা থেকে জমি তৈরী ও রোপনের ১৪০ দিনের মাথায় মাঠভরা পাকা ধানে খুশি কৃষকরা। পতিত জমিতে ধানের বাম্পার ফলনের সংবাদে মঙ্গলবার বিকেলে শ্রীমঙ্গলের মীন নগরে ছুঠে আসেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী লুৎফুল বারী। ধান দেখে তিনি নিজেই অবাক। প্রতি ছড়ায় ধানের পরিমান এতো বেশি যে তিনি নিজেই লেগে পড়েন ছড়ার ধান গুনতে। এ সময় ধান গুনে চিটা ছাড়া কোন ছড়ায় ২৮০টি কোনটায় ২৭০টি  কোন ছড়ায় ৩শ এর উপরে ধান পাওয়া যায় বলে জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী লুৎফুল বারী।

তিনি জানান, এবছর মৌলভীবাজার জেলায় ৫৬ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। যা গতবছরের চেয়ে ৩ হাজার হেক্টর বেশি। যার মধ্যে ৮ হাজার হেক্টরই হাইব্রীড। করোনাকালে উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিতে এবছর ২৬ হাজার ৮শত কৃষকে বিনামুল্যে  হাইব্রীড বীজ বিতরণ করা হয়। দেয়া হয় সার সহ অনান্য সুবিধাও। তিনি জানান, ফলন খুবই ভালো হয়েছে এখন গোলায় ধান উঠাতে পারলেই পরিপুর্ণ তৃপ্তি। তবে তিনি আগামী সাপ্তাহে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাবাস নিয়ে অনেকটা দুশ্চিন্তাগস্থ। তাই পাকা ধানগুলো দ্রুত কেটে গোলায় উঠানোর জন্য কৃষকদের প্রতি অনুরোধ রাখেন।

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার  ইয়াসমিন মোনালিসা  সুইটি জানান, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শ্রীমঙ্গল উপজেলার পতিত থাকা জমিগুলো বাছাই করে সেখানে কিভাবে উৎপাদনের আওতায় আনা যায় তা নিয়ে তিনি প্রথমে অনুসন্ধানী কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ওই এলাকার কৃষকদের সাথে একাধিক বৈঠক করেন। বৈঠকে সম্পৃক্ত করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও। মীননগরের ক্ষেত্রে তিনি শাওন ছড়াকে কাজে লাগান। প্রথমে তিনি শাওন ছড়ায় বাঁধ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। বাঁধ দিতে জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নেন। এলএলপি দিয়ে পাইপের সাহায্যে কৃষকের মাঠে পানির ব্যবস্থা করেন। ওই পানি দিয়ে তিনি প্রথমে ভুট্টা ও সূর্যমূখী ও কিছু সবজী চাষ করান। পরে ওই পানি দিয়ে বোরো আবাদ করান। বিনামুল্যে হাইব্রীড বীজ ও সার দেন। চার মাসের মাথায় বাম্পার ফলনে কৃষকদের মুখে হাসি দেখে তিনি অন্যরকম তৃপ্তি অনুভব করছেন। তিনি জানান, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এই এলাকা ছাড়াও এরকম আরো বেশ কয়েকটি এলাকায় পতিত জমি চাষের আওতায় এনেছেন। এর ফলে এবার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বোরো ধানের উৎপাদন অনেক বাড়বে।

পতিত জমি চাষের আতায় আনা  মীন নগরের কৃষক জু্বরে মিয়া জানান, তারা কৃষি বিভাগের পরামর্শে ও সহায়তায় এবছর এই জমিতে প্রথম বুরো ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, তাদের কৃষি আপা অনেকবার  এসেছেন। এ মৌসুমে পতিত থাকা এই জমিগুলো চাষের জন্য তিনি তাদের পেছনে জুকের মতো লেগে ছিলেন। জমি চাষ করার জন্য পানির ব্যবস্থা, সার, হাইব্রীড ধান সবই সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি আপা করে দিয়েছেন। এখন এই পতিত জমিতে যে ফলন পেয়েছেন তাদের অন্য কোন জমিতে এরকম ফলন হয়নি। তিনি জানান, আশার চেয়েও বেশি ফলন দিয়েছে হাইব্রীড টিয়া। এটি লালতীর কোম্পানী বিদেশ থেকে আমদানী করেছে এবং সরকার তাদের কাছ থেকে ক্রয় করে বীনামুল্যে দিয়েছে।

একই কথা জানান, কৃষক আব্দুর রাফি। তিনি বলেন, ধান লাগানোর পর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তেরের উপ- উপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী একাধিকবার তাদের এই ক্ষেত পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, হাইব্রীড টিয়া প্রনোদনা পেয়ে এবার প্রথম চাষ করেন। এটি এতো ফলন দিবে ভাবতেও পারেননি। এই ফলন দেখে আগামীতে এই এলাকার সকল পতিত জমিই চাষের আওয়াতায় আসবে। বিশেষ করে পানি পেলে এখানে তিন ফসল  হবে। একই সাথে তিনি হাইব্রীড বীজ সরবরাহ অভ্যাহত রাখাও আহবান জানান।

 এ ব্যাপারে অধিক উৎপাদনকারী হাইব্রীড টিয়ার আমদানী কারক লালতীর সীডের সিলেট ডিভিশনার  ম্যানেজার তাপস চক্রবর্তী জানান, এই ধান উত্তরা অঞ্চলে বেশি হয়। কৃষি বিভাগ তাদের কাছ থেকে ক্রয় করে কৃষদের প্রনোদনা দেয়। এ এলাকায় এ জাতটি কেমন ফলন দেয় তা দেখতে এসে তিনি নিজেও অবাক হন।  এতো ফলন হয়েছে যে তা আশারও অধিক। তিনি জানান, কিছু পানির ব্যবস্থা থাকলেই তা চাষ করা যাবে। এ সময় তিনি এই এলাকার পতিত জমি শতভাগ চাষের আওতায় আনার জন্য শাওন ছড়ার উজানে একটি সুইস গেট নির্মান বিশেষ প্রয়োজন  বলে মনে করেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াছমিন মুনালিসা সুইটি জানান, শাওন ছড়ায় একটি সুইস গেট স্থাপনের জন্য তিনি সরকারের উর্ধতন বিভাগের কাছে আবেদন করবেন ।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •