৯৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প আশার আলো দেখছেন মনু পাড়ের মানুষ

July 29, 2020, এই সংবাদটি ৩৩৭ বার পঠিত

মাহফুজ শাকিল॥ প্রতি বর্ষা মৌসুমে মৌলভীবাজার জেলায় মনু নদী এক আতঙ্কের নামে পরিণত হয়। জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর এই তিন উপজেলার মনু নদী তীরের মানুষ বন্যা আতঙ্কে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করেন। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলসহ পানি নেমে এলেই পানির অস্থিতিশীলতার কারণে মনু নদের বাঁধের কোথাও না কোথাও ভাঙন দেখা দেয়। বছরের পর বছর ধরে মনু নদের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি ছিল এতদ অঞ্চলের কয়েক লক্ষাধিক ভুক্তভোগীদের। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর অবশেষে মনু নদীর দু’পাড়ের মানুষের দুঃখের অবসান হচ্ছে। মৌলভীবাজারের ইতিহাসে পাউবো’র সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি ইতোমধ্যে একনেকে অনুমোদন হওয়ায় এতদ অঞ্চলের মানুষ এখন আশার আলো দেখছেন।  প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর বর্ষায় মনু নদের বন্যার আতঙ্ক থেকে রেহাই পাবে এতদ অঞ্চলের বাসিন্দারা এমনটি দাবি সংশি¬ষ্টদের।

এদিকে গত বছরের বর্ষায় মনু নদীর পানি বৃদ্ধি হওয়ায় কুলাউড়া উপজেলার হাজিপুর ইউনিয়নের শতবর্ষী কাউকাপন বাজার ও কটারকোনা হাসিমপুর এলাকায় বড় ধরণের দুটি ভাঙ্গন দেখা দেয়। এতে হাজিপুর ইউনিয়নের শতবর্ষী কাউকাপন বাজারের প্রায় দেড় শতাধিক দোকান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম ছিল। তখন কাউকাপন বাজারের মধ্যখানে ভাঙ্গনের কারণে বাজারের সামনে ও দুপাশের প্রায় ৬৫ টি দোকান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে মেরামত কাজ করায় রক্ষা পায় শতবর্ষী এই বাজারটি।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে মনু নদী ভরাট হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙ্গে আশপাশের এলাকা প¬াবিত হয়ে ব্যাপক ফসলহানি ঘটায়। দীর্ঘদিন থেকে মনু নদী খনন না করায় পলি জমে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় অতি বৃষ্টিতে নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙ্গে হাজার হাজার একর জমির ফসলের যে ব্যাপক ক্ষতি হতো তা চিরতরে বন্ধ করতে গত ২১ জুন রবিবার মনু নদী ভাঙ্গন রক্ষা প্রকল্পের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ৯৯৬ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা ব্যয় ধরে “মনু নদীর ভাঙন থেকে মৌলভীবাজার জেলার সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলা রক্ষা প্রকল্প” নামের প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। এই প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ায় নদী প্রবাহিত কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের পর এই প্রথম মনু নদীতে মৌলভীবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হয়েছিলো- সেগুলো ছিল ছোট প্রকল্প। এটাই মৌলভীবাজারের ইতিহাসে পানি উন্নয়ন বোর্ড তথা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কুলাউড়া উপজেলায় ২৭ টি ভাঙ্গণ প্রবণ স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ, রাজনগর উপজেলায় ২০ টি ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ২০ টিসহ মোট ৬৭ টি ভাঙ্গণপ্রবণ স্থানে ৩০ দশমিক ২৪ কিলোমিটার সিসি ব-কের মাধ্যমে নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া ৮৫ দশমিক ৯১ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ পুনর্বাসন বাঁধ, মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিমাঞ্চলের আড়াই কিলোমিটারে নতুন করে আরসিসি ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ, শহরের বিদ্যমান ৭৬৬ মিটার ফ্লাড ওয়াল পুনর্বাসন ও উঁচুকরণ করা, ১২ দশমিক ১১ কিলোমিটারের চর অপসারণ ইত্যাদি রয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। মনু নদের উৎস ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায়। ১৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নদের ৭৪ কিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে। প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার তিনটি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।

পাউবো আরও জানায়, কুলাউড়ার হাজিপুর ইউনিয়নের শতবর্ষী কাউকাপন বাজার এবং কটারকোনা হাসিমপুর নামক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের নদীর দিকে ¯ে¬াপ, ক্রেষ্ট এবং বেশ অনেকগুলো দোকানঘর নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। কাউকাপন বাজার সংলগ্ন বাপাউবোর বাঁধের উপর এলজিইডি কর্তৃক পাকা রাস্তা নির্মান করা হয়েছে যা তারাপাশা বাজার হতে কটারকোনা বাজার সংযোগ সড়ক হিসেবে পরিচিত। বাঁধের নদীর দিকে ¯ে¬াপ বিলীন হয়ে যাওয়ার কারনে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ, বাজার ও রাস্তাটি তখন বেশ ঝুঁকিপূর্ন হয়ে উঠে। আপদকালীন জর”রী অবস্থা মোকাবেলা করার জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার কর্তৃক জর”রী কাজ হিসেবে নদীর দিকে কাউকাপন বাজারে ২০০ মিটার এবং কটারকোনা বাজার সংলগ্ন স্থানে ৪২ মিটার, মোট ২৪২ মিটার দৈর্ঘ্যে জিও ব্যাগ, সিনথেটিক ও গানি ব্যাগ দ্বারা অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজের মাধ্যমে ভাঙ্গন প্রতিরোধ কাজ করা হয়। যাতে ব্যয় হয় প্রায় ১.৬ কোটি টাকা। গত বছরের আগস্ট মাসে শুর” হয়ে অক্টোবর ২০১৯ এ শেষ হওয়া কাজটির মাধ্যমে গত বর্ষায় কাউকাপন বাজার ও সংলগ্ন এলাকা বন্যা ও ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা পায়। যারফলে বন্যা ঝুঁকি থেকে কিছুটা স্বস্থিতে রয়েছেন এতদ অঞ্চলের হাজারো মানুষ। জর”রী ভিত্তিতে উক্ত স্থানে মেরামত কাজ করা না হলে গত বছর এবং চলতি বছরের বন্যায় ব্রীচ সৃষ্টির ফলে তারাপাশা-কটারকোনা সংযোগ সড়ক বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ কাউকাপন ও কটারকোনা বাজার সংলগ্ন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেত। এছাড়া কুলাউড়ার হাজিপুর ইউনিয়ন, রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়ন ও কমলগঞ্জের পতনউষার ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প¬াবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন হতো।

জেলার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত মনু নদ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি হয়েছে। ১৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মনু নদের ১১২ কিলোমিটার পড়েছে ভারত অংশে। বাংলাদেশে ৭৪ কিলোমিটার। কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের তেলিবিল এলাকা দিয়ে মনু নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে মিশেছে। মনু নদীর বাংলাদেশ অংশের উভয় তীরে ১৪০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। মনু নদীর বন্যা জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার জন্য একটি স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিবছরই এই তিনটি উপজেলার কোথাও না কোথাও মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে কমবেশি বন্যা নিয়ম হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িসহ মূল্যবান নানা স্থাপনা। বারবার বন্যার ছোবলে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে নদীর দুই পাশের অনেক পরিবার। অনেক সময় বাংলাদেশ অংশে ভারী বর্ষণ না হলেও উজানে ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাত হলে নদীটি দ্র”ত ফুলে ফেঁপে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে নদী ভরাট হওয়ার কারণে উজান থেকে দ্র”ত নেমে আসা পানি ধারণ করতে পারে না। তখন নদীর দুই পারের কোথাও না কোথাও বাঁধ উপচে বা বাঁধ ভেঙে বন্যা হচ্ছে। এতে মানুষের ফসলের পাশাপাশি ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও নানা রকম স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রতিবছর রাস্তাঘাট নির্মাণে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

মনু তীরবর্তী হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাংবাদিক আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর মনু নদীর ভাঙ্গন থেকে তিন উপজেলাকে রক্ষাকল্পে শীর্ষক ৯৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন করায় এতদ অঞ্চলের মানুষের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পাউবোকে অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। মৌলভীবাজার পাউবো’র সময়োচিত পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে হাজিপুর ইউনিয়নের শতবর্ষী কাউকাপন বাজারে নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের মেরামত কাজ করায় শতবর্ষী কাউকাপন বাজারটি রক্ষা পায়। এই কাজ না হলে মনু নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের মাঝে বন্যা ও নদী ভাঙনের আতঙ্ক দেখা দিত।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, আগামী শুষ্ক মৌসুমে মনু নদী রক্ষা প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ৬৭টি স্থানের নদী প্রতিরক্ষা বাঁধে স্থায়ীভাবে কাজ করা হবে। এতে নদের ভাঙন রোধ হবে। এসব স্থানে জমি অধিগ্রহণ থেকে শুর” করে অনেক ধরনের কাজ হবে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর যার জন্য একনেকে ৯৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মনু নদের বন্যার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যাবে। তিনি আরো বলেন, গত বছরের বর্ষায় হাজিপুর ইউনিয়নের কাউকাপন বাজার ও কটারকোনা হাসিমপুর এলাকায় ভাঙ্গন মোকাবেলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জিও ব্যাগ ডাম্পিং ও পে-সিং এর মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। উক্ত কাজ দুটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০২০ সালের চলমান বর্ষা মৌসুমেও তিনটি ইউনিয়নের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানসহ বাজার এবং গুর”ত্বপূর্ণ সড়ক বন্যা ও ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •