চা শ্রমিকের কাছে তিনি ছিলেন অতুলনীয়

July 24, 2022,

মোঃ আব্দুল কাইয়ুম॥ লেখার শুরুটা করতে চাই বাঙালী কবি কুসুম কুমারী দাশের আদর্শ ছেলে কবিতা দিয়ে। আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে? মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন‘মানুষ হইতে হবে’এই যার পণ।

কবিতাটি খাটি দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সব যোগেই প্রেরণার অনন্য উৎস হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। যা ব্যক্তি জীবনে প্রতিটি মানুষকে সততা ও আদর্শের মাপকাঠিতে নিষ্ঠাবান ও সৎ কর্মট হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে। বাস্তবতা হলো কর্মক্ষেত্রে আমাদের সমাজে সৎ মানুষের খুব অভাব। এর মাঝেও আমাদের চার পাশে প্রচার বিমুখ অনেক মানুষ আছেন যাদের কর্মক্ষেত্র রয়েছে সাফল্যগাঁথা অন্যন্য ইতিহাস। এমনই এক কর্মট ও সাদা মনের মানুষকে নিয়েই প্রতিবেদনটির মূল উদ্দেশ্য।

বলছিলাম চা কন্যার দেশ শ্রীমঙ্গল উপজেলার সীমান্তবর্তী সবুজ বন বেষ্টিত নাহার চা বাগানের সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপক পীযুষ কান্তি ভট্রাচায্য’র কথ। পীযুষ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে জন্ম নেয়া নিখাদ সংগ্রামী এক তরুণ। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী পীযুষ ছিলেন প্রচন্ড রকমের আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী। শিক্ষা জীবন শেষেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে সময় ক্ষেপণ না করে বেছে নেন বেসরকারী চাকুরী। দেশের বৃহত্তম শিল্প গ্রুপ সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন নাহার চা বাগানে ২০০৬ সালে ব্যবস্থাপক হিসেবে দ্বায়িত্ব গ্রহন করেন। কর্ম জীবনে কথার ফুলঝুরিতে নয়, কাজের মাধ্যমেই তিনি বড় হতে চেয়েছেন।

পরিত্যক্ত চা বাগানটিতে যোগদানের পর ১৬ টাকা দামের দুটি কুপি বাতি জ্বালিয়ে শুরু করেন গহীন বনের ভিতর কঠিন দুঃসাহসী পথচলা।

নামে চাবাগান হলেও বিদ্যুত,গ্যাস,স্যানিটেশন,আধুনিক প্রযুক্তি,চা উৎপাদনের কারখানা কিচ্ছুই ছিলোনা সেখানে। চারিদিকে এক ভুতুরে পরিবেশ। সীমান্ত ঘেঁষে উঁচু উঁচু টিলা বেষ্টিত নাহার চাবাগানে ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর যোগদানের পূর্বে সেখানে কেউই এ পদে বেশিদিন টিকতে পারেননি। কারণ প্রচন্ড ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন এক নির্জন অরণ্যে এই বাগানটির অবস্থান। যোদানের পরেই পরিত্যাক্ত বাগানটি পীযূষ ভট্রাচার্য্যরে প্রবল চেষ্টা আর শ্রমে বদলে যেতে থাকে সময়ের পরিক্রমায়। ২০০৬ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর এই বাগানে ব্যবস্থাপক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সবকটি চাবাগানের মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক পর্যটনবান্ধব প্রকৃতিকণ্যা হিসেবে নাহার চাবাগানটিকে তিলে তিলে গড়ে তুলতে মূল ভুমিকা পালন করেন তিনি। দীর্ঘকাল লোকশানের মুখে থাকা এই বাগানটি ধীরে ধীরে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে থাকে। কুপি বাতির নিভু নিভু আলোর পরিবর্তে যুক্ত হয় বৈদ্যতিক আলো। এই ১৭ বছরে বাগানটিতে সর্বাধুনিক কারখানা স্থাপন,গ্যাস সংযোগ,ইন্টারনেট,রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম চালুসহ চা শ্রমিকদের সন্তানদের লেখা-পড়া,স্যানিট্যাশন,আধুনিক বাসস্থান,উন্নত রেশনিং ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করেন। তার সময়েই বিশাল পাহাড়ের মধ্যে অতিথিদের জন্য গড়ে তোলা হয় অত্যাধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন বাঙলো।

অর্থাৎ দীর্ঘ দেড়যোগেরও বেশি সময়ে টানা দ্বায়িত্বে তিনি নাহার চাবাগানের বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। সততা,কর্মদক্ষতা ও দৃঢ় মনোবলের কারনে মালিক পক্ষের ব্যপক আস্থা অর্জণ করতে শুধু সক্ষমই না, তিনি হয়ে উঠেন অতুলনীয়। ফলশ্রুতিতে সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন জুলেখা নগর নামে আরেকটি চাবাগানেও ব্যবস্থাপক হিসেবে স্বচ্চতার সাথে দ্বায়িত্ব পালন করেন। ওই বাগানটি ক্রয়েও বিশেষ ভুমিকা রাখেন তিনি। দুটি চাবাগানের চা শ্রমিকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেন দেবতাতুল্য। নিরহঙ্কার পীযুষ রাত-বিরাতে চা শ্রমিকদের বিপদে দ্রুত এগিয়ে যেতেন। সাহায্যের প্রয়োজন হলে পকেটে যা থাকত তাই দিয়ে দিতে কখনো কুন্ঠাবোধ করেননি।

চা শ্রমিকদের প্রিয় এই মানুষটি তাঁর দীর্ঘ দেড় যোগেরও বেশি সময়ে সফলভাবে দ্বায়িত্ব পালন শেষে বিদায় জানাচ্ছেন চা সেক্টরকে। কর্তৃপক্ষ না চাইলেও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই এমন কঠিন সিদ্ধান্ত বলে জানান পীযূষ। কারন তিনি সপ্নের দেশ কানাডায় স্থায়ীভাবে স্বপরিবারে পারি দিতে আগামী আগষ্টের প্রথম সাপ্তাহেই দেশ ছাড়ছেন। তাঁর কানাডা পারি দেয়ার খবরে সবচেয়ে ব্যতিত ওই দুটি বাগানের শতশত চা শ্রমিক ও বাগান কর্তৃপক্ষ।

বুধবার ২০ জুলাই চাবাগান দুটির নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যবস্থাপকের কাছে দ্বায়িত্ব হস্তান্তর করেন পীযূষ। এ দিন নাহার চাবাগানে তাঁকে চা শ্রমিকরা বিরল অশ্রুজলে বিদায় জানান তাদের প্রিয় অভিবাবককে। সেখানে দেয়া হয় ফুলেল সম্বর্ধনা ও ক্রেষ্ট উপহার। সৃষ্টি হয় আবেঘন পরিবেশের। চা শ্রমিকদের বিপদে সবচেয়ে আপন মানুষটির বিদায়ে তাঁরা পুরোটাই বাঁকরুদ্ধ। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে অনেক চা শ্রমিককেই হাউমাউ করে কাঁদতে দেখ্ াগেছে।

নাহার চা বাগানের বিদায়ী ব্যবস্থাপক পীযুষ বলেন,মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া একটি ছোট্র শিশু যেভাবে বড় হয়ে উঠে এবং সময়ের কঠিন প্রয়োজনে যখন মা-বাবার চোখের আড়ালে চলে যায়,তখন যে কষ্টটা হয় এই মুহুর্তে অনুভুতিটা সেরকম।

নাহার চাবাগানের বিদায়ী ব্যবস্থাপক পীযুষ কান্তি ভট্রাচার্য্য’র সাথে নানা শ্রেনী পেশার মানুষের পাশাপাশি পেশাগত কারনে এ অঞ্চলের গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে রয়েছে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক। চা অঙ্গনের যেকোন সংবাদের তথ্যের প্রয়োজনেই সম্পর্কের এই উৎস। বিদায়ের খবরে অনেককে সোস্যাল মিডিয়ায় আবেঘন কমেন্ট করতে দেখা যায়। সেখানে অনেকের পাশাপাশি অনলাইন গণমাধ্যম বাংলানিউজের সিনিয়র ডিভিসনাল করেসপন্ডেন্ট বিশ্বজিৎ ভট্রাচার্য্য বাপন মন্তব্য করেন,আপনার এই অপ্রত্যাশিত এবং গৌরবমুখর বিদায়ে প্রচন্ড আঘাত পেলাম।

ইস্পাহানী জেরিন চাবাগানের জিএম সেলিম রেজা বলেন,পীযুষ ভট্রাচার্য্য একজন সদালাপী ও অত্যান্ত সামাজিক মানুষ ছিলেন। তিনি সবসময় চা শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে সেখানকার চায়ের গুণগত মানের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি বলেন,নাহার চাবাগানের আমুল পরিবর্তনে তাঁর নিরলস শ্রম অনস্বীকার্য। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন সততা আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোন পরিস্থিতিতে কর্ম জীবনে সফল হওয়া সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com