
হাসনাইন সাজ্জাদী : বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর নাম যেমন উজ্জ্বল, তেমনি তাঁর সঙ্গে আগত অসংখ্য সুফি দরবেশ বাংলার জনপদে ইসলাম প্রচার ও মানবিক মূল্যবোধ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.)। লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থানীয় ইতিহাসে তাঁর নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, বিশেষ করে মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী অঞ্চলে।
আগমন ও কিংবদন্তি: কথিত আছে, হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.) ছিলেন হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর অন্যতম সঙ্গী। সিলেট বিজয়ের পর তিনি ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি অলৌকিকভাবে খড়ম পায়ে বিশাল হাকালুকি হাওর অতিক্রম করে পাবিুজুড়ী নদীপথে এসে তৎকালীন ক্ষত্রিয় বাজারের নিকটবর্তী একটি টিলায় অবতরণ করেন। এই কাহিনি কেবল অলৌকিক বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং মানুষের মনে তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
আস্তানা ও সমাধিস্থল: হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.) সেই টিলাতেই আস্তানা গড়েন এবং জীবনের শেষ দিনগুলো সেখানে কাটান। পরবর্তীতে সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। আজ তাঁর মাজার অবস্থিত মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর গ্রামে। এই মাজার শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।
অলৌকিক গল্প: হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.) কে নিয়ে একটি কিংবদন্তি হলো তাঁকে একসময় এশার নামাজের পর মাঝার থেকে বেরিয়ে হাকালুকি হাওর দিয়ে সিলেটে হযরত শাহ জালালের মাঝারে চলে যেতে এবং ভোররাতে মাঝারে ফিরে আসতে অনেকেই দেখেছেন বলে দাবি করতেন। ধান ক্ষেতে তখন টং ঘর বানিয়ে রাত জেগে যারা শুকর তাড়াতেন তারা এ দাবি করতেন। এক জ্যোতির্ময় মানুষের আনাগোনা এভাবে তারা প্রত্যক্ষ করতেন।
অলৌকিক বাসনপত্র: হযরত শাহ গরীব খাকীর মাঝারের দক্ষিণ দিকে একটি বড় দিঘি রয়েছে। কথিত আছে এই দিঘিতে আগে পান পাতা দিয়ে বাসনপত্র চাওয়া হতো। বিয়ে বা যে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য চাওয়া বাসনপত্র সময়মতো চলে আসতো। প্রয়োজন শেষে আবার ফিরিয়ে দিত সবাই। একবার কেউ একজন একটি বাসন লোভে পড়ে রেখে দিলে পরে আর চাহিদা মতো বাসন আসা বন্ধ হয়ে যায়।
বংশধর: হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.) এর চার জন সন্তান ছিলেন বলে গল্প প্রচলিত রয়েছে। তাঁদের নাম হাবিদ শাহ, আবিদ শাহ, ফেটিয়া শাহ ও বেলদা শাহ। পরবর্তীকালে তাঁর আওলাদরা নারীর মাধ্যমে বিস্তৃত হয়। পুরুষের নাম আর পাওয়া যায় না। তবে জায়ফরনগর, ভোকতেরা, গোবিন্দপুর ও হামিদপুর গ্রামে তাঁর বংশধরেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রয়েছেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব: হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.)-এর প্রচারিত সুফি আদর্শ ছিল মানবপ্রেম, সহনশীলতা ও নৈতিক শুদ্ধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ ভুলে মানবিক বন্ধন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। তাঁর আস্তানাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে একটি ধর্মীয়ুসামাজিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যা আজও মানুষকে নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথে আহ্বান জানায়।
মাজার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: বর্তমানে তাঁর মাজারে নিয়মিত জিয়ারত করেন দূরুদূরান্ত থেকে আগত ভক্তরা। প্রতি বছর মাঝারের নিকটস্থ শাহ খাকী হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ধর্মীয় মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এলাকার মানুষ একত্রিত হয়, যা জুড়ী অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করে। মাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকবিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠান স্থানীয় ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল।
হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.) কেবল একজন সুফি সাধক নন, তিনি জুড়ী অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর আগমন, আস্তানা স্থাপন ও সমাধিস্থলকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তি ও বিশ্বাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এই ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বাংলার মাটিতে ইসলাম প্রচার হয়েছিল ভালোবাসা, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ ধরে।
শাহখাকি নগর ও জুড়ী সাব পোস্ট অফিস: হযরত শাহজালালের অন্যতম সঙ্গী ও পূর্ব সিলেটের প্রখ্যাত পীরে দস্তগীর হযরত শাহ গরীব খাকির স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে আমাদের গ্রাম গোবিন্দপুরকে শাহখাকি নগর নাম পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম একসময়। আমরা তখন কয়েকজন তরুণ লেখক ও সমাজকর্মী মিলে শাহখাকি সাহিত্য সংসদও প্রতিষ্ঠা করি। আমাদের জীবনে কৈশোরে আমার ফিরে ফিরে দেখা জুড়ী সাব পোস্ট অফিসের গুরুত্ব এবং আমাদের সম্পর্ক আজ অতীত স্মৃতি। জুড়ী সাব পোস্ট অফিস এখন জুড়ী উপজেলা ডাকঘর। কৈশোর থেকেই এর সঙ্গে আমাদের গোপন প্রণয় ছিল। প্রায়ই এ ডাকঘরের মাধ্যমে চিঠিপত্র ও পত্রপত্রিকা আসত। সকালে গিয়ে আমরা খবর নিয়ে আসতাম ডাক এসেছে কি না?
গোবিন্দপুর গ্রামের নাম শাহখাকি নগর রাখার সিদ্ধান্ত নেই আমরা। আমি, আব্দুর রহমান ভাই, সামসুল ইসলাম, ফখরুল ইসলাম শামিম মামা, মুহিব জামালি চাচা ও হাফিজ আব্দুল মান্নান চাচা মিলে -সিলেট,ছাতক ও ঢাকা থেকে নানাভাবে শাহখাকি নগর লিখে ব্রাকেটে গোবিন্দপুর দিয়ে চিঠি পাঠাতাম। আবার গ্রহণ করতাম। পত্রপত্রিকায় ও এভাবে ঠিকানা দিতাম। উদয়ন, মাসিক মদিনা, মাসিক ঢাকা ডাইজেস্ট, মাসিক পৃথিবী সহ অনেক খ্যাত অখ্যাত পত্রিকার আমরা ডাকযোগে গ্রাহক হতাম। আবার জুড়ী প্রতিনিধি হিসাবে দৈনিক ও সাপ্তাহিক ও অনেক কাগজে কাজ করতাম। তারাও পত্রিকা পাঠাতো। পোস্টম্যান পরিচিত। চেহারা দেখেই প্রতদিনের হাজিরা পেয়ে হাসতো। তাঁকে সালাম দিতাম। বাইরে জোর করে নিয়ে গিয়ে তাঁকে চা খাওয়াতাম। হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.) তখন নিরবে বসে আছেন জায়ফর নগরের জঙ্গলে। তাকে ভক্তিভরে প্রচার করা দরকার। প্রতিষ্ঠা করলাম 'হযরত শাহ গরীব খাকি সাহিত্য সংসদ'। শামীম মামা সভাপতি আর আমি সেক্রেটারি। অন্যরা নানা পদে। আরো ছিলেন আব্দুস সামাদ কলামিয়া ভাই। ঢাকার কাগজে নিউজ করালাম।১৯৭৭থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত শাহখাকিকে আলোয় নিয়ে আসার আমদের এভাবে নানা চেষ্টা ছিল।পরে তিনি এমন ভাবেই বেরুলেন। বাড়ির পাশেই এখন শাহখাকি আলিয়া মাদ্রাসা। ভোকতেরায় শাহখাকি মসজিদ, শাহখাকি ইদগাহ রোড, শাহখাকি যাত্রী ছাউনি আর জায়ফর নগরে শাহখাকি হাফিজিয়া মাদ্রাসা আজ তার স্মৃতিকে বহন করে চলেছে। কিন্তু শাহখাকি নগর ভাবনা থেকে পরবর্তীকালে আমরা বেরিয়ে আসি অসাম্প্রদায়িক চিন্তা থেকে। গোবিন্দপুর গ্রামের নাম পালটে শাহখাকি নগর বানালে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ পায় -তাই এখানেই থেমে গেলাম। ঢাকায় এসে ২৫/৩০ বছর একটানা এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম। এখন বেশি বেশি থাকা হয়। জুড়ীকে দেখি। আমির মঞ্জিল দেখি। তৃপ্তি শেষ হয়না। এ যেনো প্রেমিকার চিবুক।মাস্কের আড়ালে হারিয়ে পড়া চিবুক। সুযোগ পেলেই চেয়ে থাকতে মন চায়। সম্প্রতি হাফিজ আব্দুল মান্নান মারা গেছেন। দেখা হয় শামীম মামার সঙ্গে। আর শাহ খাকি তো এখন আমার বাড়ির প্রবেশ দ্বারেই আমাকে দেখেন। মিটমিটিয়ে হাসেন। কখনো কখনো মনে হয় সেসব অতীত। তবে খুব বেশিদিন নয় আমাদেরও অনেকের অতীত অতিথি হবার দিন সামনে দাবমান।
তাই হয়তো আর বেশিকিছু ভাবতে চাই না।
আমির সাধুর গানে ও প্রবাদে শাহ গরীব খাকি ও তাঁর বংশধর প্রসঙ্গ: লোকসাহিত্যিক আমির সাধু হযরত শাহ গরীব খাকি (রহ.) কে নিয়ে মরমী সংগীত রচনা করেছেন।
তিনি লিখেছেন :
'বাবা গরীব খাকী দীন ভবানী
তোমারা তারে চিননি?
মারফতির ছবক দিয়া
মাটির ঘরো আছইন তিনি।।
জায়ফর নগর মোকাম যে তার
দ্বীন ইসলামের মশালদার
শাহজালালের আদেশ লইয়া
আছইন তিনি নিরাকার।।'...
গানের ব্যাখ্যা: নিচে আমির সাধু রচিত হযরত শাহ গরীব খাকী (রহ.)ুকে নিয়ে গানের পংক্তিগুলোর ভাবার্থ ও মারফতি ব্যাখ্যা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো—
গানের পংক্তি
“বাবা গরীব খাকী দীন ভবানী
তোমারা তারে চিননি?
মারফতির ছবক দিয়া
মাটির ঘরো আছইন তিনি।।”
ব্যাখ্যা
এই অংশে সাধক আমির সাধু সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন— “তোমরা কি তাঁকে চিনেছ?” এটি কেবল ব্যক্তিকে চেনার প্রশ্ন নয়, বরং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রশ্ন। “দীন ভবানী” বলতে বোঝানো হয়েছে—তিনি ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আলোর ধারক। “মারফতির ছবক” মানে মারফতি বা তত্ত্বজ্ঞানমূলক শিক্ষা। শাহ গরীব খাকী (রহ.) ছিলেন বাহ্যিক আড়ম্বরহীন কিন্তু অন্তর্গত জ্ঞানে সমৃদ্ধ এক সাধক। “মাটির ঘরো আছইন” — তাঁর সাধনজীবনের প্রতীক। অর্থাৎ, তিনি বিলাসিতা বা ক্ষমতার কাঠামোয় নয়, সাধারণ মানুষের মতো মাটির ঘরেই অবস্থান করতেন। এটি সুফি দর্শনের ফকিরি ও বিনয়ের চূড়ান্ত রূপ।
এখানে সাধক বোঝাতে চান—
আল্লাহর বন্ধুদের (আউলিয়া) চেনা যায় বাহ্যিক সাজে নয়, চেনা যায় তাঁদের জ্ঞান, বিনয় ও মারফত দিয়ে।
গানের পংক্তি
“জায়ফর নগর মোকাম যে তার
দ্বীন ইসলামের মশালদার
শাহজালালের আদেশ লইয়া
আছইন তিনি নিরাকার।”
ব্যাখ্যা: এই অংশে গানের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়। “জায়ফর নগর মোকাম” এখানে বোঝানো হয়েছে—বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর অঞ্চল, যেখানে হযরত শাহ গরীব খাকী (রহ.)ুএর আস্তানা ও মাজার অবস্থিত। এটি কেবল একটি স্থান নয়, বরং একটি রূহানি কেন্দ্র। “দ্বীন ইসলামের মশালদার” তিনি ইসলামের আলো বহনকারী। অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা। “শাহজালালের আদেশ লইয়া” এখানে ঐতিহাসিক সত্যের ইঙ্গিত রয়েছে—হযরত শাহ গরীব খাকী (রহ.) ছিলেন হযরত শাহজালাল (রহ.) এর অন্যতম সঙ্গী ও অনুসারী। শাহজালাল (রহ.)ুএর নির্দেশে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। “আছইন তিনি নিরাকার” এটি অত্যন্ত গভীর মারফতি ভাষা। এখানে ‘নিরাকার’ বলতে শারীরিক রূপহীনতা নয়, বরং আত্মবিলোপ (ফানা) বোঝানো হয়েছে— নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে আল্লাহর ইচ্ছায় বিলীন হয়ে যাওয়া।
সারকথা (মারফতি সারাংশ): আমির সাধুর এই গানটি কেবল জীবনীমূলক নয়; এটি একটি সুফি দর্শনের পাঠ। এই গানে বলা হচ্ছে— ওলিদের চিনতে চোখ নয়, লাগে হৃদয়। ক্ষমতা নয়, বিনয়ই হলো আল্লাহর নৈকট্যের পথ। মাটির ঘরে থেকেও কেউ হতে পারেন ইসলামের মশালদার। গুরু শিষ্য ধারায় (শাহজালাল → শাহ গরীব খাকী) ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের রূহানি আলো। এ কারণে এই গান সিলেট অঞ্চলের মারফতি ও সুফি লোকসংগীতের এক মূল্যবান দলিল।
(সুত্র: হযরত শাহজালাল ও সিলেটের ইতিহাস/ হাসনাইন সাজ্জাদী, প্রকাশক: পূর্বাপর, ২০২৮৷ ঢাকা)
তাঁর রচিত একটি প্রবাদে শাহ গরীব খাকির পুত্র হাবিদ শাহের কথা এসেছে। প্রবাদটি হল-'নেরার মাঝে নারায়ণ / নিরাইর মাঝে ছনাই/ মাতে কথাতে হাবিদ শাহ টান/ আর মিছা মাতে নাছির মোড়লরে আন।'
হযরত শাহ গরীব খাকী (রহ.) পূর্ব সিলেট এক বিশাল আলোকবর্তিকা যার হাত দিয়ে এতদঞ্চল শান্তির আলোকিত হয়েছিল।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.