
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আপসহীন বিপ্লবী নেতা কমরেড আব্দুর রউফ (মুকুুল) দীর্ঘ ৫৫ বছর চলৎ শক্তিহীন অবস্থায় এদেশের বিপ্লবী আন্দোলন অগ্রসর করার ক্ষেত্রে মাকর্সবাদ-লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠায় তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করে যে উদাহরণ তৈরি গেছেন তা শুধু এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনেই নয় বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনেই অনন্য।
২২ মে শুক্রবার সন্ধ্যা মৌলভীবাজার শহরের কোর্টরোডস্থ এনডিএফ কার্যালয়ে প্রয়াত কমরেড আব্দুর রউফ (মুকুল)-এঁর শোকসভা আয়োজক কমিটি, মৌলভীবাজার আয়োজিত শোকসভায় বক্তারা এ কথা বলেন। শোকসভা আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক সাংবাদিক নুরুল মোহাইমীনের সভাপতিত্বে অনুষ্টিত সভার শুরুতে প্রয়াত নেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শ্রমিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত শোকসভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি নিরজ্ঞন দাশ, গণসংঙ্গীত শিল্পী ধ্রুতবারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমলেশ শর্ম্মা, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মো: সোহেল মিয়া, মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো: শাহিন মিয়া, কুলাউড়া উপজেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া আহমেদ, চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ন হাজরা, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি গিয়াস মিয়া, হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন রবিরবাজার আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি জিলহজ্ব মিয়া, নারী চা-শ্রমিকনেত্রী লক্ষী মনি বাক্তি।
শোকসভায় বক্তাগণ বলেন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে বাজার পুনর্বন্টন প্রশ্নে মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ার প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউক্রেনযুদ্ধ, প্যালেস্টাইনে মার্কিন-ইসরায়েলের আগ্রাসন, ইরানে যুদ্ধ; যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বযুদ্ধের বিপদ, এমন কি পারমাণবিক যুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করছে। এই বিরুদ্ধে বিশে^র দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী বঙ্গোপসাগরীয় বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগত সামগ্রিক গুরুত্বের প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদী উভয় পক্ষ স্ব স্ব যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। অন্যদিকে দেশে অর্থনীতির সঙ্কট ঘনীভূত হয়ে দ্রব্যমূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি, আইএমএফের নীতি নির্দেশে জ্বালানী তেল, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা, শিল্প কলকারখানায় উৎপাদন হ্রাস ও বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে জনজীবন দুর্বিষহ অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে কমরেড আব্দুর রউফ মুকুলের দেখিয়ে দেওয়া পথে নয়াউপনিবেশিক দেশসমূহে সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন করার সুমান কর্তব্য রয়েছে শ্রমিকশ্রেণির সামনে।
কমরেড আব্দুর রউফ (মুকুল)-এর জীবনের উপর আলোকপাত করে বক্তারা বলেন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিটব্যুরোর সদস্য। তিনি ১৯৬৯-৭০ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবস্থায় পার্টি বিপ্লব অগ্রসর করার লক্ষ্যে ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ ত্যাগ করে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৫৩ সালে কমরেড স্ট্যালিনের মৃত্যু এবং ১৯৫৪ সালে সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভচক্র ক্ষমতাসীন হয়ে ১৯৫৬-এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬০-এর দশকে ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ সংশোধনবাদ-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক এই মহাবিতর্কে কমরেড আবদুল হক-এর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর বিকল্প বিপ্লবী ধারা অগ্রসর করে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে খুলনায় মন্ত্রী সবুর খানের বাড়ী ঘেরাও কর্মসূচির রূপকার ও নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন। ১৯৭০-৭১ সালে পার্টির খুলনা জেলা কমিটির নবীন ও সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৭১ সালের বিপ্লবী যুদ্ধে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। এ সময়ে ২৬ নভেম্বর ১৯৭১ সালে কমরেড রউফ গুলিতে আহত হন। আহত হয়ে প্যারালাইজড অবস্থায় তাঁকে স্ট্রেচারে করে চলাচল করতে হতো। বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯৭২ সালে কমরেড রউফকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। চিকিৎসায় কমরেড আব্দুর রউফ জীবনে বেঁচে গেলেও তাঁর নিম্নাঙ্গ অর্থাৎ মেরুদণ্ডের নীচের অংশ দুই পা অকার্যকর হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করতেন। দেশে ফিরে আসার পর প্রথমে তিনি খুলনা জেলা পার্টির সাথে যুক্ত হন। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কমরেড আবদুল হক-এর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর আন্তর্জাতিকতাবাদী লাইনের পক্ষে কমরেড রউফ দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘তিন বিশ্ব তত্ত্ব’-এর বিরুদ্ধে কমরেড আবদুল হক-এর নেতৃত্বে পার্টির তুলে ধরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদী লাইনকে প্রতিষ্ঠায় তিনি নেতৃত্বকারী ভূমিকা রাখেন। তিনি কমরেড আবদুল হক-এর জীবদ্দশায় কমরেড আব্দুর রউফ পার্টির ৮ম কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৯ম কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে অব্যাহত থাকেন। শারীরিক কারণে ২০০৬ এবং ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত দশম ও একাদশ কংগ্রেসে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে না থাকলেও কার্যত তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর তাত্ত্বিক নেতা।
দীর্ঘ দিন বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগে অবশেষে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গতকাল ৫ ফেব্রুয়ারি ’২৬ সকাল ৯টা ৪০মিনিটে ৭৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রয়াত নেতার মরদেহে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে খুলনায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.