
বশির আহমদ : চাঁদনীঘাট হাফিজিয়া মাদরাসার একসময়ের ছোট মিয়াছাব এবং পরবর্তীতে বড় মিয়াছাব, সাবিয়া জামে মসজিদের সাবেক দীর্ঘদিনের ইমাম, চাদনীঘাট, গুজারাই, সাবিয়া, বলিয়ারবাঘসহ আশপাশ এলাকার মানুষের অত্যন্ত আপনজন, শতশত হাফিজে কোরআনের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আলহাজ্ব শাহ হাফিজ আতাউর রহমান (রহঃ) গত ৪ জুন ২০২৬ ইং চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিলেটের আল হারামাইন হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর ইন্তেকালে আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে তাঁর মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফেরদৌস কামনা করছি।
হাফিজ আতাউর রহমান (রহঃ) দীর্ঘদিন মৌলভীবাজারে অবস্থান করে মাদরাসা, মসজিদ, ছফিনা খতম, দাওয়াত-জিয়াফত এবং সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তাঁর চলাফেরা, আচার-আচরণ ও মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ছিল সত্যিই দৃষ্টান্তমূলক।
তিনি সবসময় হাসিমুখে কথা বলতেন এবং ছোট-বড় সকলকে সম্মান করতেন। বিশেষ করে আলেম-উলামাদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও সম্মান ছিল অসাধারণ। কোনো মাহফিল বা দাওয়াতে দোয়ার জন্য বলা হলে তিনি অনেক সময় নিজে দোয়া না করে উপস্থিত কোনো আলেমকে দোয়া করার জন্য অনুরোধ করতেন। এটি তাঁর বিনয়ী চরিত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমার জানামতে তিনি ছিলেন একজন পরহেজগার, আল্লাহভীরু ও দুনিয়াবিমুখ মানুষ। মহান আল্লাহ তাঁর সন্তানদের ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং স্বচ্ছল জীবনযাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁর ওপর কোনো মসজিদ বা মাদরাসার দায়িত্ব ছিল না, তবে তিনি সর্বদা দ্বীনি খেদমত ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর সুন্দর চরিত্র, নম্রতা ও ভদ্রতা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ।
একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। ২০২০ সালে আমি হঠাৎ ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হলে তিনি কোনোভাবে খবর পেয়ে একদিন সকালে আমার বাসায় চলে আসেন। দীর্ঘসময় আমার পাশে বসে খোঁজখবর নেন। একপর্যায়ে তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন এবং আন্তরিকভাবে দোয়া করেছিলেন। তাঁর সেই ভালোবাসা, মমতা ও দরদ আজও আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। এমন ঘটনা একজন মানুষের প্রকৃত মানবিকতা ও আন্তরিকতার পরিচয় বহন করে।
হাফিজ আতাউর রহমান (রহঃ) ছিলেন একজন সফল শিক্ষক ও মিয়াছাব। আমি তাঁর বহু ছাত্রকে দেখেছি, যারা পরবর্তীতে হাফিজ ও আলেম হয়েছেন। তারা সবাই নিজেদের শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা পোষণ করতেন। বর্তমান সময়ে এমন দৃশ্য খুবই বিরল। এটি প্রমাণ করে যে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা, ইখলাস ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে শিক্ষা দান করেছিলেন। ফলে তাঁর ছাত্ররা বড় হওয়ার পরও তাঁকে হৃদয়ের গভীর থেকে সম্মান করতেন।
তাঁর ইমামতিতে আমি বহুদিন নামাজ আদায় করেছি। তাঁর কোরআন তিলাওয়াত ছিল অত্যন্ত সুমধুর ও হৃদয়স্পর্শী। তাঁর পেছনে নামাজ পড়তে গেলে তিলাওয়াত শুনার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে থাকত। তাঁর কণ্ঠে কোরআনের আয়াত যেন বিশেষ এক প্রশান্তি এনে দিত।
ছাত্রজীবনে আমার সাবিয়া এলাকায় প্রায়ই যাওয়া হতো। কারণ, মরহুম আলহাজ্ব মাসুক আহমদ মেম্বার আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কয়েকদিন না গেলে খোঁজ নিয়ে বাড়িতে ডাকতেন। সেখানে গেলে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করাতেন। অনেক সময় হাফিজ আতাউর রহমান (রহঃ)-ও আমাদের সঙ্গে থাকতেন। এ সুবাদে তাঁর সঙ্গে আমার নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলার সুযোগ হয়েছে।
মৌলভীবাজার থেকে সিলেটে যাওয়ার কিছুদিন আগেও তাঁর সঙ্গে কয়েক দাওয়াতে একত্রে বসে খাওয়া-দাওয়া ও কথা বলা হয়েছে। তখন তাঁর মধ্যে কোনো অসুস্থতার লক্ষণ চোখে পড়েনি। কিন্তু মৌলভীবাজার ছেড়ে সিলেটের শাহপরান এলাকায় যাওয়ার পর তিনি অসুস্থতা অনুভব করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
আসলে সবই মহান আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি যা ভালো মনে করেন তাই করেন। মানুষের জীবন ও মৃত্যু তাঁরই হাতে নির্ধারিত। আমরা তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকি এবং মরহুমের জন্য দোয়া করি।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আলহাজ্ব শাহ হাফিজ আতাউর রহমান (রহঃ)-কে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচায় পরিণত করুন। তিনি শতশত ছাত্র-ছাত্রী, অসংখ্য গুণগ্রাহী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সন্তান-সন্ততি রেখে গেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের সবাইকে সবরে জামিল নসীব করুন।
আমিন ইয়া রব্বাল আলামিন।
লেখক: বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা, মৌলভীবাজার।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.