
এস এম উমেদ আলী : দেশের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন, বাক-স্বাধীনতা এবং চিকিৎসাসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১২ তারিখের নির্বাচনের আগে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার সরকার। জনগণের অর্থ যাতে সঠিকভাবে দেশের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সজাগ থাকতে হবে।”

বুধবার ১৭ জুন বিকেলে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত একযোগে ২০টি জেলায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্বোধনী বক্তব্য রাখার আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রধানমন্ত্রী বাটন চেপে সুবিধা-বঞ্চিত পরিবারের সদস্যদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। একই সাথে ২০টি জেলার তৃতীয় পর্যায়ে ৯০৮২ জন উপকারভোগীর মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়, যেখানে অন্যান্য ১৯টি জেলার উপকারভোগীরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।
কর্মসূচির আওতায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫৫টি পরিবার এবং রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এর পর তিনি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নিতেশ্বর এলাকার দোসাই রিসোর্টে বিএনপির সিনিয়র পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে যোগ দেন।
প্রবল বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও দুটি স্থানে প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে ও বরণ করতে হাজার হাজার জনতার উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। সিলেট থেকে সড়ক পথে মৌলভীবাজার আসার সময় রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাদের স্বাগত জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “নির্বাচনী প্রচারণার সময় আমি সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ অঞ্চলের চা শ্রমিকদের বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার কষ্ট নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। সেই কষ্টের কথা বিবেচনা করেই সরকার গঠনের পর সারা দেশে নারী প্রধানদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশাপাশি চা বাগানের নারী শ্রমিকরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই সুবিধার আওতায় আসছেন।”
তিনি আরও জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের ৬০০টি উপজেলার প্রতিটিতে অন্তত ৮,০০০ পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের ৪ কোটি পরিবারের কাছে এই সুবিধা পৌঁছাবে। এছাড়া, প্রশাসনের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।
গ্রামের মানুষ, নারী, শিশু এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারের গৃহীত পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষকে যেন কষ্ট করে দূরবর্তী শহরে ছুটতে না হয়, সেজন্য প্রতিটি উপজেলার বর্তমান ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। একই সাথে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের স্থানীয় পর্যায়ে সেবা দিতে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিনের ব্যবস্থা করা হবে।”

কৃষি প্রধান দেশের কৃষকদের অর্থনৈতিক চাপ কমাতে এককালীন সহায়তা নিশ্চিত করতে ১ বছরে ৪০ লক্ষ কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। এর মধ্যেই ৪০,০০০ কৃষককে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যে ১২ লক্ষ কৃষকের ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা: আগামী জুলাই মাস থেকে গ্রামীণ অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য বিনামূল্যে এক জোড়া স্কুল ড্রেস এবং একটি করে স্কুল ব্যাগ দেওয়া শুরু হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি: মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং মন্দির-গির্জার ধর্মীয় প্রধান ও পুরোহিতদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা চালু করা হয়েছে। আগামী বছরে প্রতি উপজেলায় ৮ হাজার জন এই সম্মানী পাবেন। পরিবেশ রক্ষা: আগামী ৫ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে বর্তমান বাজেটে ৬০টি পণ্যের ওপর থেকে ট্যাক্স তুলে নেওয়া হয়েছে।
দেশের বর্তমানে পূর্ণ বাক-স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজ সংবাদমাধ্যম বা সাধারণ নাগরিক যে কেউ সরকারের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে নির্দ্বিধায় সত্য ও সঠিক বক্তব্য তুলে ধরতে পারছেন। কোনো ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি এখন নেই। এই স্বাধীন পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই সরকার জনগণের কল্যাণে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারছে।”
মৌলভীবাজার জেলার স্থানীয় উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই এলাকায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরেই এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের মূল উন্নয়ন হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছে এবং দেশের মানুষ এখন শান্তি, স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান চায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের
“জনগণ বিএনপিকে পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার রায় দিয়েছে। অথচ যারা অতীতে জনগণের ভোটের অধিকার হরণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তারা এখন আবার বলছে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না। বিএনপির শক্তির উৎস কোনো বিদেশি শক্তি নয়, বরং দেশের সাধারণ জনগণ।”
তিনি আন্দোলনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের স্মরণ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে রাজপথের আন্দোলন এবং স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন, গুম ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। যারা ফ্যামিলি কার্ডের অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে যেভাবে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, জনগণকে সাথে নিয়ে সেই পাচার রুখে দেওয়া হবে এবং দেশের সম্পদ দেশের মানুষের কল্যাণেই ব্যবহার করা হবে।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক উক্তি স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই বাংলাদেশই আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা।” দেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের মূল দর্শনই হচ্ছে— “করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ; সবার জন্য বাংলাদেশ।”
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সঞ্চালনা ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংসদ সদস্য ও হুইপ আলহাজ্ব জিকে গউছ, সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু, নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু, সংসদ সদস্য জহরত আদিবা চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহিদুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ প্রশাসক মিজানুর রহমান মিজান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন, সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন।
উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা, সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকী, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটির প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ।
প্রবল বৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়া মধ্যেও দু’টি স্থানে প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে ও তাকে বরণ করতে হাজার হাজার জনতার উপিস্থিত ছিলো লক্ষণীয়। সিলেট থেকে সড়ক পথে মৌলভীবাজার আসার সময় রাস্তার দু’পাশে দাড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। এসময় প্রধানমন্ত্রীও তাদের সালাম ও অভিবাদনকে হাত নেড়ে স্বাগত জানান।

সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.