
স্টাফ রিপোর্টার : মৌলভীবাজারে নানা আয়োজনে ৬ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবস পালিত হয়েছে। শনিবার মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল জেলা পরিষদের অডিটরিয়ামে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ চা বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে প্রধান অতিথি হিসেবে চা দিবস অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী। উদ্বোধন উপলক্ষে বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে দিবসটির আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আতাউর রহমান খান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো: মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ। বক্তব্য রাখেন টি ট্রেডার্স এসোসিয়েসন সভাপতি শাহ মাঈন উদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ চা সংসদের সভাপতি কামরান টি রহমান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, বিএনপির শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, বট লিফ টি মালিক সমিতির সভাপতি নিয়াজ সিদ্দিকী, টি প্ল্যান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ চা শিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন ও চা শ্রমিক প্রতিনিধিরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, “চা শুধু একটি পানীয় নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের চা শিল্পকে আরও আধুনিক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে নতুন প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।”
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ১৬০টিরও বেশি চা বাগান এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র চা বাগান জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের চা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে, যা দেশের জন্য গর্বের বিষয়।
চা শ্রমিকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে সংসদ সদস্য বলেন, “চা শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম ছাড়া এ শিল্প এতদূর এগিয়ে আসতে পারত না। তাদের ন্যায্য মজুরি, উন্নত আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, শ্রীমঙ্গল শুধু দেশের চা শিল্পের প্রাণকেন্দ্রই নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সবুজ চা বাগান, হাওর, ছড়া, জাতীয় উদ্যান এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানের ‘চা পর্যটন’ গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে তিনি সরকারের কাছে ‘শ্রীমঙ্গল পর্যটন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আতাউর রহমান খান বলেন, দেশের চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, চা শিল্পের উন্নয়নে শ্রমিক, মালিক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও সহমর্মিতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো: মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, চায়ের গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আপনারা অবগত আছেন যে, আমাদের 'বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট' (বিটিআরআই) নিরলসভাবে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তারা উচ্চ ফলনশীল ও উন্নত মানের চায়ের বীজ উদ্ভাবন এবং গুণগত মানসম্পন্ন ক্লোন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি, চা বাগান মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন চ্যলেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা প্রতিনিয়ত সহযোগিতা দিয়ে আসছি। সামগ্রিকভাবে, সকল অংশীজনকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশ চা শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করতে আমরা বদ্ধপরিকর, যাতে আমরা একটি আন্তর্জাতিক মানের চা শিল্প উপহার দিতে পারি।
আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের চা শিল্পকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আমরা স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। বিগত বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে আমরা প্রায় ১০ মিলিয়ন কেজি অতিরিক্ত চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। এই ধারা বজায় রেখে আগামী ৫ বছর সফলভাবে অতিবাহিত করতে পারলে, ইনশাআল্লাহ্ আমরা দেশীয় উৎপাদন ১ লক্ষ ২৫ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৩০ হাজার কেজিতে উন্নীত করতে সক্ষম হব।
চায়ের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয়েও আমাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে। রপ্তানি বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো চায়ের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে আমরা ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি এবং অন্যান্য প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। বিশ্ববাজারে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় যদি আমরা সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে এই উন্নত মানের চা বাজারজাত করতে পারি, তবে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে যা যা করণীয়, তার সবকিছুই আমরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে যাচ্ছি।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে চা দিবসের অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করা হয় এবং তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও সনদ তুলে দেওয়া হয়। এবার একরপ্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান। সর্বোচ্চ গুণগতমানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগানের স্বীকৃতি পেয়েছে মধুপুর চা বাগান। শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারকের পুরস্কার অর্জন করেছে দি কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড।
শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রায়তন চা উৎপাদনকারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান। শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য শ্রেষ্ঠ চা বাগানের সম্মাননা পেয়েছে মির্জাপুর চা বাগান।
চা পণ্যের উদ্ভাবনী বাজারজাতকরণ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন চা মিশ্রণ বাজারজাতকরণের স্বীকৃতিস্বরূপ দুটি পৃথক ক্যাটাগরিতে বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড।
এ ছাড়া শ্রমিক ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন নেপুচা চা বাগানের জেসমিন ওরাওঁ। জাতীয় চা দিবসের বিশেষ পুরস্কার হিসেবে শ্রেষ্ঠ বটলিং চা কারখানা নির্বাচিত হয়েছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল এলাকায় অবস্থিত সৃষ্টি টি লিমিটেড।
পরে অতিথিরা জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চা মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং চা উৎপাদন, বিপণন ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.