
বশির আহমদ : বর্তমান সময়ে দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মূলধনের অভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেকেই মহাজন, এনজিও বা বিভিন্ন উৎস থেকে সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করেন। প্রথমে সামান্য মনে হলেও পরবর্তীতে সুদ ও চক্রবৃদ্ধি সুদের বোঝা তাদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়। ফলে ঋণ শোধ করতেই আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায় এবং তারা দারিদ্র্যের সীমায় চলে যান।
এ অবস্থায় করযে হাসানা (সুদবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ) একটি যুগোপযোগী ও মানবিক সমাধান হতে পারে।
প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি সুদবিহীন ঋণ পান, তাহলে তারা সহজেই ব্যবসার মূলধন বৃদ্ধি করতে পারবেন, পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে পারবেন এবং সুদের গুনাহ থেকে নিজেদের রক্ষা করাও সম্ভব হবে।
ইসলামে সুদ (রিবা) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫)
অতএব, একজন মুসলমানের জন্য সুদ থেকে বেঁচে থাকা শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি ঈমান ও তাকওয়ারও দাবি।
যদি সমাজে করযে হাসানা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চালু হয়, তাহলে এর বহুমুখী সুফল পাওয়া যাবে। মানুষ সুদের পরিবর্তে হালাল পদ্ধতিতে ব্যবসা করার সুযোগ পাবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্বাবলম্বী হবে এবং সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এমনকি সুদের ব্যবসার চাহিদা কমে গেলে সুদী ব্যবসায়ীরাও বিকল্প হালাল ব্যবসায় আগ্রহী হতে পারেন।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন সংস্থা-সমিতির মাধ্যমে করযে হাসানা কল্যাণ তহবিল গঠন করে স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে সুদবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য যে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে কর্দ হাসান (কার্দ আল-হাসান) নামে সুদবিহীন ঋণ এবং ইসলামী ক্ষুদ্রঋণ বা ইসলামিক ক্ষুদ্র অর্থায়ন ব্যবস্থা বিভিন্ন ইসলামিক চ্যারিটি, মসজিদ ও কমিউনিটি সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগে প্রবাসী মুসলমানদের অনুদান ও ওয়াকফ তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
আমাদের দেশের প্রবাসীরাও চাইলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য করযে হাসানা তহবিল গঠনে এগিয়ে আসতে পারেন। কাউকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি যদি তাকে হালাল ব্যবসার পরামর্শ ও সুদমুক্ত মূলধন দেওয়া যায়, তাহলে তিনি শুধু সাময়িকভাবে নয়, স্থায়ীভাবেও স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
তবে এ উদ্যোগের একটি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেকেই ঋণ গ্রহণের পর সময়মতো তা পরিশোধ করতে আগ্রহী হন না। এই প্রবণতা করযে হাসানার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে। তাই ঋণ প্রদানের আগে আবেদনকারীর সততা, সক্ষমতা, ব্যবসার প্রকৃতি এবং একজন বা একাধিক নির্ভরযোগ্য জামিনদার বা সামাজিক গ্যারান্টির ব্যবস্থা রাখা উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি, পরামর্শ এবং মানবিক কিন্তু দৃঢ় আদায় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একজনের ফেরত দেওয়া অর্থই অন্য একজন অভাবী মানুষের নতুন আশার আলো হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, করযে হাসানা শুধু একটি ঋণব্যবস্থা নয়; এটি ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবকল্যাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্যক্তি, সমাজ, মসজিদ, মাদরাসা, প্রবাসী এবং সামাজিক সংগঠনসমূহ যদি সম্মিলিতভাবে এই উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে একটি সুদমুক্ত, মানবিক ও স্বাবলম্বী সমাজ গঠন অনেক সহজ হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সুদের অভিশাপ থেকে হেফাজত করুন।
লেখক: বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, মৌলভীবাজার সদর।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.