
স্টাফ রিপোর্টার : মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান বলেছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের অধীনে ‘ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট’-এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উইং থাকা প্রয়োজন, যা সরাসরি ও সমন্বিতভাবে মাদ বিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করবে। মাদকাসক্ত তরুণদের ক্ষেত্রে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে ‘ডিটেনশন সেন্টার’ বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো দরকার যাতে সমাজ ও পরিবারের ক্ষতি করার আগেই তারা নিরাময়ের সুযোগ পায়।
সোমবার ২৭ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টায় জেলা শিল্পকলা অডিটরিয়ামে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ আয়োজিত ‘নাগরিকবৃন্দের সাথে মাদক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মোঃ জিল্লুর রহমান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোঃ মনিরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোঃ ফয়জুল করিম ময়ুন, সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন, মৌলভীবাজার জেলা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি মৌলভী আব্দুল ওয়ালী সিদ্দিকী, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক বকশি মিছবাউর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জামাল উদ্দিন আহমেদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্ট, মৌলভীবাজার-এর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রুনু কান্ত দত্ত।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেট রেঞ্জ কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মোঃ আমিনুল ইসলাম এবং মৌলভীবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা। অনুষ্ঠানে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
এম নাসের রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়েছেন প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানসম্মত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা জন্য। স্কুলের মাঠ এবং মাদকের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যদি এলাকায় খেলাধুলার মাঠ থাকে, তবে তরুণরা মাদকের দিকে যাবে না। তারা ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল সহ বিভিন্ন খেলায় ব্যস্ত থাকবে। এতে করে তাদের মন ও মানসিকতা খেলাধুলার ওপরই মননিবেশ থাকে। যখন খেলাধুলার সুযোগ থাকে না, তখন অলস মস্তিষ্কই অন্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বর্তমানে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ায় মানুষ ফেসবুক আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আসক্তি এতটাই বেড়েছে যে, গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ এতে মগ্ন থাকে। খেলাধুলার সুব্যবস্থা থাকলে এই আসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কমে আসত। প্রতিটি ইউনিয়নে একটি খেলার মাঠ থাকলে স্থানীয় তরুণরা সেখানে খেলাধুলার সুযোগ পাবে। খেলার মাঠ প্রত্যক্ষভাবে মাদক কমানো বা রোধ করতে ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহ থেকে আমাদের দেশে যেভাবে ফেন্সিডিল প্রবেশ করছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকল্পিতভাবে এবং তাদের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সহায়তায় এসব ফেন্সিডিল কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। পাকিস্তান কিংবা নেপাল সীমান্তে এ ধরনের কোনো কারখানা দেখা যায় না, অথচ বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা জুড়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাজ নয়। ভারত থেকে আসা মাদকের এই স্রোত দিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্রেরই অংশ।
মাদক চোরাচালান রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বিশাল চালানের একটি ক্ষুদ্র অংশ আটক করা হলেও বড় অংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আমরা দেখতে পাই, কোনো থানার ভারাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একা চেষ্টা করলেও অধস্তন কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার অভাবে কার্যকারী ফল পাওয়া যায় না। বিশেষ করে অতীতে যারা বিগত সরকারের স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন, সেসব অধস্তন কর্মকর্তারা বর্তমান প্রশাসনিক কার্যক্রমে শতভাগ সহযোগিতা করছেন না।
যেসব কর্মকর্তা বিগত দিনগুলোতে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার সহযোগী ছিলেন, তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে তাদের প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন বা সংস্কারের আওতায় আনতে হবে। যারা নিরপেক্ষ ও বিগত সময়ে কোনো নিপীড়নের সাথে যুক্ত ছিলেন না, তাদের যোগ্য স্থানে পদায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, থানার মূল নির্বাহী শক্তি বা প্রধান সহযোগী যদি আন্তরিক না হলে কেবল প্রধান কর্মকর্তার একার পক্ষে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মোঃ জিল্লুর রহমান সভাপতির বক্তব্যে বলেন, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা সেবনকারী—কারো পক্ষ থেকেই কোনো ধরনের তদবির বরদাস্ত করা হবে না। আমি আমার অধীনস্থ সকল সহকর্মীকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, মাদকসংক্রান্ত কোনো তদবির আসলেই তা সাথে সাথে আমাকে জানাতে হবে। আমি দেখতে চাই সেই তদবিরের পেছনে কে আছেন।
যে মাদক সংক্রান্ত অন্যায়ে তদবির করে, সে অপরাধের সমান সহায়তাকারী। আর রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয় ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে’। অর্থাৎ, অপরাধী এবং অপরাধের সমর্থনকারী উভয়েই সমান অপরাধী। তাই কাউকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এছাড়া কিশোর গ্যাং নিয়ে বলেন, কোন নির্দিষ্ট এলাকায় ঠিক কোথায় এই গ্যাং কালচার বা অপরাধ ঘটছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য বা ‘পাই টু পাই’ প্রমাণ যদি আপনারা দিতে পারেন, তবে সেখানে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এ বিষয়ে উপস্থিত সকলকে দিকনির্দেশনা জানিয়ে বলেন, কোনো তথ্য থাকলে সরাসরি আমাকে জানাবেন, আমরা তা যাচাই-বাছাই করে দ্রুত পদক্ষেপ নেব। অপরাধীরা স্থানীয় হোক বা বাইরের হোক তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। আমি আপনাদের ওয়াদা দিচ্ছি, তাৎক্ষণিক অ্যাকশন শুরু হবে।
মাদক এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মোঃ জিল্লুর রহমান বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা সেবনকারী কারো পক্ষ থেকেই কোনো ধরনের তদবির বরদাস্ত করা হবে না।

রেঞ্জ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “মাদকসংক্রান্ত যেকোনো তদবির এলেই তা তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে জানাতে হবে। আমি দেখতে চাই, সেই তদবিরের পেছনে কারা জড়িত।”
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত পঙ্কতি উল্লেখ করে ডিআইজি বলেন, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে’। যে ব্যক্তি অপরাধীকে বাঁচাতে তদবির করে, সেও মূল অপরাধেরই সমান অংশীদার। অপরাধী কিংবা তার সমর্থক কাউকেই ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় অপরাধ দমনে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর জোর দিয়ে ড. মোঃ জিল্লুর রহমান জানান, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের ‘পাই টু পাই’ বা সঠিক প্রমাণ দেওয়া হলে সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এ সময় তিনি উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যে কোনো অপরাধের সঠিক তথ্য সরাসরি আমাকে জানান। আমরা প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে দ্রুত পদক্ষেপ নেব। অপরাধী স্থানীয় হোক কিংবা বহিরাগত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। আমি কথা দিচ্ছি, তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.