
মাহফুজ শাকিল : কুলাউড়ায় ‘মিড-ডে মিল’ বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ঠিকাদারের সরবরাহ করা বনরুটির মধ্য একটি ধারালো ব্লেড থাকার বিষয় নিয়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়েছে। এটা নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে ঘটনাটি পরিকল্পিত। কারণ ঘটনাটি স্কুলের ভিতরে ঘটেনি এবং স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সকালে দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা স্কুলে বসে সেটি খেলেও সুরাইয়া তার প্যাকেট থেকে একটি বনরুটি খেয়ে বাকিটা বাড়িতে নিয়ে যায়।
সোমবার ২৭ জুলাই বিকেলে কুলাউড়া পৌরসভার জয়পাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুরাইয়া আক্তার নামে তৃতীয় শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর বনরুটির মধ্যে এই ব্লেড থাকার বিষয় নিয়ে প্রথমে জুনাব আলী নামে এক মক্তব শিক্ষক ফেসবুকে পোস্ট করলে বিষয়টি ভাইরাল হয়। এতে অনেকের মধ্যে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এদিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার সকালে স্কুলে যান প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে স্কুলে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ কমিটির লোকদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, সোমবার প্রতিদিনের মতো জয়পাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহ করা হয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থী খাবার পেয়ে সেটি স্কুলেই টিফিনের সময় খেয়ে ফেললেও সুরাইয়া আক্তার নামের ওই শিক্ষার্থী বনরুটির প্যাকেট থেকে একটি বনরুটি খেয়ে বাকিটা বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে সে বিকেলে বায়তুস সালাম জামে মসজিদে যায় প্রাইভেট মক্তব পড়তে। এসময় শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের জানায়, মসজিদে গিয়ে প্রাইভেট পড়ার সময় স্কুলে পাওয়া বনরুটির প্যাকেট থেকে অবশিষ্ট রুটিটি খেতে চাইলে একটি ব্লেড হাতে লাগে। তখন বিষয়টি আমি জুনাব হুজুরকে দেখালে তিনি কৌতুহল নিয়ে ভিডিওটা ধারণ করেন। ঘটনাটি আমি পরিবারের কাউকে জানাইনি।
স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্সের প্রোপ্রাইটর খায়রুল বাশার জানান, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রুটি তৈরি করা হয়। সেখানে এ ধরনের মেটাল থাকার কোনো সুযোগ নেই। আর যদি থেকেও থাকে, তাহলে ওই ব্লেডটিতে পোড়া দাগ থাকত, সেটিও নেই। এখন কীভাবে বনরুটির প্যাকেটে এটা এসেছে সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা শিশুদের খাবার সরবরাহের বিষয়টি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করি। বনরুটিতে ব্লেড থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রকৃত সত্যতা যাচাই না করে সরকারের মহৎ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অনেকেই অপপ্রচার শুরু করেছেন। অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আমরা আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
বায়তুস সালাম জামে মসজিদের ইমাম জুনাব আলী বলেন, সুরাইয়াসহ আরো ৬-৭ জন শিক্ষার্থী আমার কাছে প্রতিদিনের মতো প্রাইভেট পড়তে আসে। এসময় সুরাইয়া বানরুটিটি খেতে চাইলে তার হাতে ব্লেডটি লাগে। তখন সেটি আমাকে দেখালে আমি সচেতনতা তৈরির জন্য একটি ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করি। পরবর্তীতে আমার ফেসবুক থেকে নিয়ে আরো অনেকেই পোস্ট করেন।
জয়পাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেলী বেগম বলেন, নিয়মিত বাচ্চাদের মধ্যে খাবার সরবরাহ করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থী সুরাইয়া তার প্রাপ্ত খাবার থেকে একটি বানরুটি খেলেও আরেকটি সে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে শুনতে পারি সে বিকেলে মক্তব্যে পড়তে গেলে বানরুটিতে ব্লেড পাওয়া গেছে। বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই রহস্যজনক মনে হচ্ছে কারণ ঘটনাটি যদি স্কুলের ভিতরে ঘটতো তাহলে আমরা সেটির জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে দোষারুপ করতে পারতাম। তিনি আরো বলেন, স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী রোধ করতে ও শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে বর্তমান সরকার স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা খুবই প্রশংসনীয়। এই খাবার বিতরণের কারণে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেকটা বেড়েছে। আমরা চাই সরকারের এই ব্যতিক্রমী কার্যক্রম সবসময় অব্যাহত থাকুক।
জয়পাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রস্তাবিত সভাপতি সিপার উদ্দিন আহমদ, সাবেক সভাপতি খালেদ পারভেজ বক্স ও সদস্য জুয়েল আহমদ বলেন, ঘটনাটি জানার পর শিক্ষার্থীর বাড়ি থেকে বনরুটির প্যাকেট স্কুলে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু প্যাকেট দেখে আমরা বুঝলাম নতুন একটি ব্লেড বনরুটির মধ্যে কিভাবে আসলো। কারণ বনরুটি তৈরি করতে যে খামিটি ব্যবহার করা হয় সেটি হাত দিয়ে করলে হাতে লাগতো বা মেশিন দিয়ে তৈরি করলে মেশিনের সাথে সেটি লেগে (ব্লেড) ভেঙ্গে গুড়ো হয়ে যেত। কিন্তু ব্লেডটি এমনভাবে বনরুটির মধ্যে খানে রাখা সেটি দেখে খুবই রহস্যজনক মনে হচ্ছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার জন্য কেউ হয়তো ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটাতে পারে বলে মনে করছি।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, বিষয়টি ফেসবুকে দেখে তাৎক্ষণিক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার সাথে কথা বলি। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে স্কুলে গিয়ে প্রথমে শিক্ষার্থীর বাড়ি থেকে বনরুটিটি এনে দেখি। এসময় শিক্ষক, পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ শিক্ষার্থী সুরাইয়ার সাথে কথা বলে মনে হলো ঘটনাটি সাজানো। বনরুটিটির মধ্যে খানে একদম নতুন একটি ব্লেড সাজানো রয়েছে সেটি দেখে বুঝা যাচ্ছে সেটি পরিকল্পিত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, বনরুটিতে ব্লেড থাকার ভিডিওটা দেখে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় শিক্ষা কর্মকর্তাকে সরেজমিনে স্কুলে পাঠাই। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আমাকে জানালেন, ঘটনাটি সঠিক নয়। তারপরও বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.