
শাহ মোহাম্মদ মোজাহিদ আলী আজমী : দীর্ঘদিনের প্রিয় শিক্ষার্থীদের বিদায়ে আবেগঘন পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর চোখে অশ্রু। ‘চারপাশে সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু তোমরাই নেই’ প্রিয় শিক্ষার্থীদের বিদায়ের পর এমনই এক শূন্যতার অনুভূতি যেন ঘিরে ধরেছে মৌলভীবাজারের উলুয়াইল ইসলামীয়া আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
মৌলভীবাজারের উলুয়াইল ইসলামীয়া আলিম মাদ্রাসার আলিম (চূড়ান্ত) পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন ও হৃদয়বিদারক পরিবেশ। প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীদের বিদায়ের মুহূর্তে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেউই চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের কেউ হাউমাউ করে কেঁদেছেন, কেউ শিক্ষকদের বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, আবার কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে শিক্ষকদের পায়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।
দীর্ঘ ৮-১০ বছর ধরে উলুয়াইল ইসলামীয়া আলিম মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা এসব শিক্ষার্থীর বিদায়ে মাদ্রাসার শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝেও নেমে আসে গভীর বেদনা। কেউ প্রথম শ্রেণিতে, কেউ তৃতীয় শ্রেণিতে, আবার কেউ ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে দীর্ঘদিন ধরে এখানকার শিক্ষা, শাসন, স্নেহ ও ভালোবাসার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক আবেগঘন বক্তব্যে মাদ্রাসার শিক্ষক শাহ মোহাম্মদ মোজাহিদ আলী আজমী বলেন, তোমরা এই পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে হেঁটেছো, পড়েছো, হেসেছো, খেলেছো, ভুল করেছো এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছো। এই মাদ্রাসা, এই ক্যাম্পাস ও শ্রেণিকক্ষ তোমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আজ তোমরা বিদায় নিচ্ছো। তোমাদের বিদায়ের পর মাদ্রাসার প্রাঙ্গণ যেন স্তব্ধ, নীরব ও শূন্য হয়ে গেছে। চারপাশে সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু তোমরাই নেই।
শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকসুলভ শাসন ও কঠোরতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ক্লাসে পড়ানোর পাশাপাশি তোমাদের প্রতি আমাদের অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। দায়িত্ব পালনের সময় অনেক ক্ষেত্রে তোমাদের শাসন করেছি, বকাঝকা করেছি। কখনো হয়তো তোমাদের মনে কষ্টও দিয়েছি। কিন্তু মনে রেখো, এসবের পেছনে ছিল তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ, চরিত্র গঠন ও উজ্জ্বল জীবনের প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিদিনের বিভিন্ন প্রশ্ন, পড়া শিখেছো?, লেখা কেন সুন্দর হয়নি?, রুটিনমাফিক পড়াশোনা করছো তো?, মিসওয়াক সঙ্গে আছে?, নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করেছো?, প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াত করছো তো? এসব হয়তো আর প্রতিদিন বলা হবে না। তবে এসব প্রশ্নের পেছনে ছিল কেবল ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
বিদায়ী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, জীবনের যে পথেই এগিয়ে যাও না কেন, সবসময় সৎ, আদর্শবান ও বিনয়ী মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। দ্বীন, দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। সত্যের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তোমরা যে প্রতিষ্ঠানেই ভর্তি হও, যে জায়গাতেই থাকো—সবসময় বিনয়ী ও ভদ্র থাকবে। জ্ঞান অর্জনের পথে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে।
শিক্ষকদের স্মরণ রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তোমরা যেখানে থাকো, তোমাদের মুহতারাম উস্তাদদের কখনো ভুলে যেও না। তাঁদের সম্মান করবে এবং সবসময় তাঁদের জন্য দোয়া করবে। একজন শিক্ষকের দোয়া ও ভালোবাসা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অনেক বড় সম্পদ।
বিদায়ী শিক্ষার্থীদের কাছে নিজের শেষ প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, যদি কোনো একদিন তোমরা শুনতে পাও, আমি আমার দুনিয়ার সফর শেষ করে চলে গেছি, তখন আমার জন্য প্রাণ খুলে আল্লাহ তাআলার কাছে মাগফিরাতের দোয়া করবে। সম্ভব হলে আমার জানাজায় শরিক হবে। এটাই তোমাদের কাছে আমার শেষ প্রত্যাশা।
শেষে তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে বিদায়ী শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, আলিম (চূড়ান্ত) পরীক্ষায় ভালো ফলাফল এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবির জন্য দোয়া করেন।
তিনি বলেন, তোমরা জীবনে অনেক বড় হও, কিন্তু কখনো তোমাদের এই মাদ্রাসা, তোমাদের উস্তাদ এবং এই প্রিয় প্রাঙ্গণকে ভুলে যেও না। তোমাদের জন্য আমাদের ভালোবাসা, দোয়া ও শুভকামনা সবসময় থাকবে।
নিবেদক: শাহ মোহাম্মদ মোজাহিদ আলী আজমী, উস্তাদ, উলুয়াইল ইসলামীয়া আলিম মাদ্রাসা মৌলভীবাজার।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.