ইমাদ উদ দীন॥ অপারেশন ‘হিট ব্যাক’ এর পর নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানার ওই বাড়িটি এখন পুলিশ হেফাজতে। বাড়ির প্রধান ফটকেই পুলিশ। রোববার ২ এপ্রিল দুপুরে সরজমিনে দেখা গেল বাড়িটির প্রধান ফটকের বাহিরে ওই গ্রামেরই উৎসুক জনাকয়েক লোক। আর তথ্য নিতে আসা দু’চারজন সংবাদকর্মী। সবার চোখ একতলা বাড়িটির পাকা টিনসেড ঘরগুলোর দিকে। কিন্তু কাউকে বাড়ির ভেতরে যেতে দিচ্ছেনা পুলিশ। বাড়িটির নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে থাকা পুলিশের এএসআই সৈয়দ নাসির উদ্দিন জানালেন ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ কেউ যেন বাড়ির ভেতরে না ঢুকে। তিনি জানালেন পুলিশ, ক্রাইম সিন ইউনিট ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ দল ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছেনা। কারণ এখনো ক্রাইমসিন ইউনিটের ফরেনসিক কার্যক্রম শেষ হয়নি। তাই নিরাপত্তা জনিত কারনেই এমন বাধা নিষেধ। বাড়ির ভেতর ও বাহিরে পুলিশ নিয়ন্ত্রনে সতর্ক প্রহরা।
বাড়ির প্রধান ফটকের একপাশে ন্যামপ্লেইটে লিখা ‘এসএমএন বাগানবাড়ি, নাসিরপুর, মৌলভীবাজার’। বাড়ির তিন দিকে পাকা প্রাচীর থাকলেও কোন দক্ষিণ পাশ খোলা। বাড়ির সামন, পেছন ও দক্ষিণ পাশ থেকে দেখা গেল বাড়িটির বর্তমান ভীবৎস্ব চিত্র। দেয়ালের চারপাশে অসংখ্য ছিদ্র। নেই সেই রঙের আগের চাকচিক্য। বাড়ির ভেতরের কয়েকটি দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ায় ভেতরে ইটগুলো দেখা যাচ্ছে। জানালার ফেইম ও কাচঁগুলো ভাঙ্গা। আর ভাঙা কাঁচের টুকরো গুলো জানালার কার্নিসে ও ফ্রেইমের সাথে আটকে আছে। বাড়ির সামনের সবগুলো দরজা-জানালা খোলা। ভেতরের অবস্থা ঝাঝরা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রয়োজনীয় নানা আসবাব পত্রের ভাঙ্গাছোঁড়া অংশ। দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে বাড়িটি কি ধকল সামলে নিয়েছে। বাড়িটির সামনের দিকের অংশটি পাকা। সুসজ্জিত ও মনোমুগ্ধকর কারুকাজ। সামনে রয়েছে গাছগাছালি সুসজ্জিত বাগান। ফুলের পাশাপাশি লাগানো হয়েছে সবজিও। রয়েছে পুশু পাখি পালনের একটি ছোট ঘর। বাড়ির চৌসীমার ভিতর সানবাধাঁনো ঘাটসহ দুটি পুকুর। আর পেছনের দিকে একটি ছোট মৎস্য খামারের পুকুর। বাড়িটির মোট আয়তন এক একরের উপরে। বাড়ির পেছনে রয়েছে একটি পরিবার থাকার মত টিন শেডের ঘর। সামনের পাকা দুপর্সনে দুটি ঘর পাকা টিনসেড।

প্রতিবেশীদের তথ্যমতে ওই বাড়িতে মোট তিনটি পরিবার থাকত। বাড়ির পেছনের অংশে থাকত রিকশা চালক উজ্জ্বল তার স্ত্রী হ্যাপি ও ২ ছেলে। এরমধ্যে বড় ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ত। বাড়ির সামনে একপাশে থাকত বাড়ির কেয়ারটেকার জুয়েল তার স্ত্রী রিপা বেগম ৪ বছরের মেয়ে সোহানা ও ৯বছর বয়সের ছেলে রুহেল। উজ্জ্বল ও জুয়েলের পরিবার দুটির ওই বাড়িতে বসবাস প্রায় ৮ বছর ধরে। বাড়ির সামনের অংশের অন্যপাশে ভাড়া নিয়ে থাকত জঙ্গিরা। ওই জঙ্গি পরিবারে সদস্য ছিল ৫টি মেয়ে। এর মধ্যে একজনের প্রায় বয়স ১৪ বছর। ২-৩ মাস আগে যার বিয়ে হয়েছে টাঙ্গাইলে। অন্য ৪ মেয়ে সকলের বয়স ১ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। ছিল ১ জন মহিলা ও ২জন পুরুষ। প্রতিবেশীরা জানালেন ২-৩ মাস আগে ওখানে ভাড়া নিয়ে থাকত ওই জঙ্গি পরিবার। সাত হাজার টাকায় ওই বাড়ি ভাড়া নেয় জঙ্গিরা। তারা সবসময় থাকত চুপচাপ। প্রতিবেশীদের সাথে মিশত কম। বাড়ির পুরুষ লোকেরা একসাথে পুরো মাসের বাজার খরচ করত। রিকশা বোঝাই করে এক সাথে সব প্রয়োজনীয় খরচ আনত। ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া পুরুষরা গ্রামের মসজিদে নামাজ পড়তে যেত না। আর মাঝে মধ্যে গেলও সবার সাথে খুব একটা পরিচিত হত না। কেউ আগ্রহ নিয়ে পরিচিত হতে চাইলে নিজেকে কখন একটি বেসরকারী কোম্পানীর কর্মকর্তা কিংবা ইঞ্জিনিয়ার বলে পরিচয় দিত। বাড়ির শিশুরা নিজেদের মধ্যেই খেলাধূলা করত। বাড়ি থেকে বের হত কম। তবে এদের কথাবার্তা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা ছিলনা। বাড়ির মেয়ে শিশু ও মহিলারা সবসময় হিজাব পরত। আর বাড়ি থেকে বের হলে বোরকা পরত। গ্রামবাসীরা জানালেন তাদের গ্রামে যে ক’টি সৌখিন সুন্দর বাড়ি তার মধ্যে জঙ্গি আস্তানার ওই বাড়িটি ছিল অন্যতম। বাড়িটির কেয়ারটেকার জুয়েল মিয়া মালিকের নির্দেশেই পাখি ও খরগোশ পোষত। ওখানে কালো, সাদা ও ধূসর রঙের মোট চারটি খরগোশ ছিলো। বাড়ির মালিক মৃত আছদ্দর লন্ডনীর একমাত্র ছেলে সাইফুর রহমান। সাইফুরের ২চাচার মধ্যে ছোট চাচা সিকন্দর মিয়া মারা গেছেন আর বড় চাচা মছব্বির মিয়া জীবত। তবে তাদের গ্রামের শেষ মাথায়। যে যার মত পৃথক বাড়িতে আছেন। গ্রামের ওই বাড়ি ছাড়া মৌলভীবাজার পৌর শহরের বড়হাটেও একটি বাড়ি রয়েছে সাইফুরের। বড়হাটের ওই বাড়িটি প্রায় ২ বছর আগে ভাড়া নিলেও নাসিরপুরের ওই বাড়িটি ভাড়া নেই ২-৩ মাস আগে। প্রতিবেশীরা জানান প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার ভোরে ওই বাড়ির কেয়ারটেকার জুয়েলকে নিয়ে পুলিশ জঙ্গি আস্তানার ওই ঘরে যায়। জুয়েল দরজায় নক করলেই তারা দরজা খোলে। এসময় জুয়েল জিজ্ঞেস করে আপনারা জঙ্গি কি না? পুলিশ আপনাদের খোঁজছে কেন। এমন কথা শোনার পর দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেয় জঙ্গিরা। এরপর ২টি বোমা বিস্ফরিত হয়। হঠাৎ তাদের এমন আক্রমণে বড় ধরণের দূর্ঘটনা থেকে রক্ষাপান অভিযানের নেতৃত্বে থাকা মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহজালাল ও সাথের অন্যরা। এরপর বাড়ি ঘিরে রেখে পুলিশ গুলাগুলি শুরু করে। নিরাপত্তার কারনে পার্শ্ববর্তী বাড়ি গুলোর বাসিন্ধাদের তাদের সহযোগীতায় অন্যত্র সরিয়ে যেতে বলে। এসময় পুরো গ্রাম আতঙ্কিত হয়ে উঠে। উদ্বেগ উৎকন্ঠায় গৃহবন্ধী হয়ে পড়ে সবাই। প্রতিবেশী মো: সামছু উদ্দিন (৬০) ও মো: সিরাজ মিয়া (৭০) জানান বুধবার সকালে হঠাৎ পুলিশ সহ জুয়েল ও তার স্ত্রী হ্যাপি দৌঁড়ে আমাদের ঘরে প্রবেশ করে। তাদের সাথে পুলিশ দেখে আমরা ভয় পেয়ে যাই। এসময় পুলিশ আমাদের অভয় দেয়। এর একটু পর দেখি পুলিশ আর পুলিশ ওই বাড়ির চারপাশে ও আমার বাড়িতে। এসময় কয়েকজন পুলিশ পানি,শুকনো খাবার ও বসার স্থান চায়। আমার ঘরে থাকা খাবার, পানি ও বসার জায়গা দেই। আমার অসুস্থ শ্বশুর,শ্বাশুড়ি ও স্ত্রী কে নিয়ে আতঙ্ক পড়ে যাই। পরে পুলিশ বলে ওই বাড়িতে জঙ্গি রয়েছে অভিযান হবে নিরাপত্তার স্বার্থে যেন আমরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাই। আমার বৃদ্ধ শ্বশুর ও শ্বাশুড়ি সহ সবাইকে কে নিয়ে আমার এক আত্মীয়র বাড়িতে চলে যাই। অভিযান শেষ শুক্রবার বিকেলে বাড়িতে আসি। এখনো আমাদের ভয় কাটেনী। আমরা নানা উদ্বেগ উৎকন্ঠায় আছি। বাড়ির একটি অংশের বাসিন্ধা রিকশা চালক উজ্জ্বল,তার পরিবার ও কেয়ারটেকার জুয়েলের পরিবার নিরাপদে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে কেয়াটেকার জুয়েল পুলিশ হেফাজতে রয়েছে বলে পুলিশ সুত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। উল্লেখ্য, জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টা থেকে মৌলভীবাজার পৌরসভার বড়হাট এলাকায় একটি বাড়ি এবং শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে খলিলপুর ইউনিয়নের নাসিরপুর গ্রামে আরও একটি বাড়ি ঘিরে রাখে পুলিশ। পরে সোয়াত আস্তানা দুটিতে পৌঁছে অভিযান চালায়। দু’টি জঙ্গি আস্তানায় রুদ্ধশাস অভিযান চলে ৮২ ঘন্টা। বৈরী আবহাওয়া আর রাতে আলোস্বল্পতায় কৌশলগত কারনেই থেমে থেমে চলে এই অভিযান। বৃহস্পতিবার বিকেলে শেষ হয় অপারেশন “হিট ব্যাক”। আর শনিবার দুপুরে সমাপ্ত হয়‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’। নাসিরপুরে অপারেশন হিটব্যাক এর পর জঙ্গি আস্তানার ওই বাড়িতে মিলে সাত জনের ছিন্ন ভিন্ন দেহ। তন্মেধ্যে রয়েছে ১ থেকে ১২ বছর বয়সের ৪টি শিশু, ২ জন মহিলা যাদের বয়স (২৫, ৩৮) ও ১জন পুরুষ (৩৮) বছর বয়স বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর মৌলভীবাজার শহরের বড়হাটের অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ এ নিহতের সংখ্যা ৩ জন। এরমধ্যে একজন মহিলা ও দুজন পুরুষ রয়েছে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.