হোসাইন আহমদ॥ সম্প্রতি বৃহত্তর সিলেট বিভাগ জুড়ে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে সিলেটের আতিয়া মহল, মৌলভীবাজারের নাসিরপুর ও বড়হাটে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মেলে এবং সেগুলোতে সফল অভিযান চালিয়ে তাদের নির্মূল করা হয়। কীভাবে প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজারকে জঙ্গিরা তাদের নিরাপদ ঘাটি বানাচ্ছে এ নিয়ে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত মৌলভীবাজারবাসীদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অনেক তথ্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী জঙ্গিরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেঁছে নিয়েছিল সিলেট অঞ্চলকে। সেখান থেকে তারা দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করত। সিলেটের আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর অভিযান চলাকালে, সেখানে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায় মৌলভীবাজারের বড়হাট আস্তানার জঙ্গিরা। শুধু তাই নয়, তারা নিরাপদে আস্তানায় ফিরে আসে বলেও জানান সিটিটিসি প্রধান মোঃ মনিরুল ইসলাম। তাহলে কি জঙ্গিরা পরিকল্পিত আস্তানা করেছিল সিলেট বিভাগে? কেন তারা সিলেটকে বেছে নিল?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩৬০ আওলীয়ার পূণ্যভুমি সিলেটের মানুষের ধর্মের প্রতি অনুরাগ রয়েছে। ধর্মের কথা বলে তাদের সহজে প্রভাবিত করা যায়। জঙ্গিরা খুবই শান্তশিষ্ট ব্যবহার করে, মানুষজনের সাথে কথা কম বলে। যার কারণে সেখানকার সহজ-সরল মানুষ তাদের সহজে বিশ্বাস করে ফেলেন। আর ঐ সুযোগে তারা ছদ্ধবেশে সহজে বাসা বাড়িগুলোতে আশ্রয় নিতে পারে।
এছাড়া শান্তি প্রিয় পর্যটন এলাকা হওয়াতে বহিরাগতদের তেমন পুলিশি নজরদারি নেই। তাই অনায়াসে তারা ঘুরে বেড়াতে পারে এবং তাদের কার্যক্রম বিস্তার ঘটাতে পারেন নির্দ্বিধায়।
জঙ্গিরা কিভাবে বিলাশবহুল বাড়িগুলোতে আস্তানা করে তার কারণ হিসেবে দেখা গেছে, ফার্নিচারসহ বাসা ভাড়া দেয়া হয় মৌলভীবাজারের অধিকাংশ বিলাশ বহুল বাড়ি গুলো। জঙ্গিরা প্রবাসী কিংবা বড় কর্মকর্তা পরিচয়ে সহজে এসকল বাসায় উঠতে পারে।
এছাড়াও এই অঞ্চলের বাসার মালিকেরা প্রবাসে বসবাস করায় তাদের পরিবর্তে তত্ত্বাবধায়ক বাসা বাড়ি দেখাশুনা করেন। যারা বেশিরভাগ অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত হয়ে থাকেন আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিরা ভুল তথ্য দিয়ে বাসায় উঠে পড়ে।
সরেজমিন মৌলভীবাজারের মুসলিম কোয়ার্টার, গীর্জা পাড়া, শাহ মোস্তফা রোড, সৈয়ারপুর, মধ্যপাড়া, পুরাতন হাসপাতাল রোড, কাজির গাঁও, কুসুমবাগ, বড়হাট, গবিন্দ শ্রী, বেরিরপার ও ঢাকা বাস্ট্যান্ড এলাকায় প্রায় শতাধিক বাড়িতে প্রবাসীদরে জন্য ফার্ণিচারসহ বাসা ভাড়া দেয়া হবে হলে সাইনবোর্ড ঝুলানো দেখতে পাওয়া যায়। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এসকল বাড়ির মালিকরা সবাই প্রবাসে থাকেন। কেয়ারটেকার এর কাছে বাড়ি দেখবালের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। কেয়ারটেকাররা বিভিন্ন অস্থায়ী ও অন্য প্রবাসীদের কাছে বাসা ভাড়া দিয়ে থাকেন।
এসময় কেয়ারটেকার শাহিন মিয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমার বিল্ডিংটি শুধু প্রবাসীদের জন্য ফার্ণিচার সহ ভাড়া দেয়া হয়। এ সময় তাদের পরিচয় হিসেবে পাসপোর্ট ও স্থানীয়দের ভোটার আইডি কার্ড রাখি। শাহিনের বাড়ি ঢাকার সাভারে। তিনি শুধু ওই বাসাটির দেখাশুনার দায়িত্বে রয়েছেন।
এছাড় অনেক সময় ব্যাচলর ভাড়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া দিতে রাজি থাকে জঙ্গিরা। যার ফলে লাভের আশায় মালিকেরা ভাড়া দিয়ে দেন। এমনকি বেশি ভাড়া আদায়ের প্রবণতা সেখানকার মালিকদের রয়েছে। তারা অনেক সময় স্থানীয় লোকদের বাসা ভাড়া দিতে রাজি থাকেন না। কারণ বাইরের অঞ্চলের মানুষদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা যায়। যা স্থানীয়দের থেকে সম্ভব হয়না।
মৌলভীবাজার ইম্পিরিয়েল কলেজের কো-অর্ডিনেটর মোঃ সিতাব আলী বলেন, ব্যবসা, লেখাপড়া ও নানা কারণে এজেলার গ্রামের বাসিন্দারা মৌলভীবাজার শহরে থাকতে চান। কিন্তু স্থানীয়দের বাসা বাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে মালিকরা নানা অজুহাত দেখান। বাড়া বেশি পাওয়ার প্রলোভনে তারা বাহিরের লোকদের কাছে বাড়া দিয়ে থাকেন।
মৌলভীবাজারের সচেতন নাগরিক কলামিষ্ট মোঃ আবু তাহের, এডভোকেট আব্দুল মতিন, উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজান, প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগম, নেপুর আলী, সৈয়দ তোফাজ্জল হোসেন, ডাঃ এ কে জিল্লূল হক, জাকের আহমদ আপু, ফিরোজ জামান ও প্রভাষক হুমায়ন কবিরসহ একাধিক ব্যক্তির সাথে বাসা বাড়ার বিষয়ে কথা হলে তারা বলেন, প্রবাসী অধ্যূষিত মৌলভীবাজারের বাসা-বাড়ি ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়দের প্রাধান্য দেয়া উচিত। কারণ এজেলার একজনের সাথে অন্যজনের পরিচয় রয়েছে। প্রয়োজনে তাদের গ্রামের বাড়িতেও খোঁজ খবর নেয়া যাবে। বাসার মালিক ভাড়া টিয়াদের গতিবীধি লক্ষ রাখতে পারবেন। নিজ জেলায় বাড়াটিয়ারা কোন অপকর্মের সাথে জড়িত হবে না বলে তারা মন্তব্য করেন বিশিষ্টজনরা।
এদিকে মৌলভীবাজারে বড়হাটে ১০জন মানুষ থাকার উপযোগী ডুপ্লেক্স বাসায় ৩জঙ্গি কিভাবে ভাড়া নেয় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই বিশিষ্টজনরা মনে করেন এখানে আরো জঙ্গি থাকতে পারে। এই অঞ্চলের মানুষ এখনো অসচেতন। তারা মনে করেন, সন্দেহজনক কাউকে বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। কেন তারা বড় বাসা ভাড়া নিচ্ছে, বেশি মানুষ থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন বাসায় তিনজন মানুষ কেন থাকতে চায় তা বিবেচনা করা উচিত।
জঙ্গি আস্তানায় অভিযান শেষে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গি নির্মূলের জন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে বাসার মালিকিরা যাতে যাচাইবাচাই করে ভাড়াটিয়া দেয়। বাসায় যে সকল ভাড়াটিয়া আছেন তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সন্দেহজনক কিছু থাকলে পুলিশকে অভিহিত করা উচিত।
মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার শাহ জালাল বলেন, আমারা পুরো জেলায় ভাড়াটিয়াদের তথ্য হালনাগাদ করতেছি। যাতে করে জঙ্গিরা ছদ্মবেশে বাসা বাড়িতে আশ্রয় নিতে না পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বাসা মালিকদেরকে আরো সচেতন হতে হবে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.