ইমাদ উদ দীন॥ মাছ না ধরতে পারলে খাব কি। এত নির্মম হলে আমরা বাঁচব কি করে। অত্যন্ত এবছর অবাধে মাছ ধারার সুযোগ দিয়ে আমাদের বাচাঁন। আর পারি না। এমনটি না হলে স্ত্রী সন্তান নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। সরকার আর ইজারাদারদের প্রতি এমন আকুতি এখন হাওর তীরের চাষী ও জেলে পরিবারে। দূর্যোগের পর দেশীয় প্রজাতির মাছ ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে হাকালুকি হাওরের বিলগুলোর ইজারা বাতিলের দাবীতে এখন সোচ্চার হচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। মিঠা পানির মাছ বাচাঁতে ও দূর্যোগ মোকাবেলায় ভাসান পানিতে অবাধে মাছ ধরতে বিলগুলোর ইজারা বাতিলের দাবী উঠেছে হাওর পাড়ের কৃষি ও মৎস্যজীবীসহ হাওর উন্নয়ন,কৃষি ও মৎস্য উন্নয়নের জন্য আন্দোলন কারী নানা সংগঠনের তরফে। ইতিমধ্যেই মৎস্যজীবী সমিতি,বাংলাদেশ কৃষক সমিতি,ক্ষেতমজুর সমিতি ও হাওর রক্ষা কমিটিসহ সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে সোচ্চার হচ্ছেন। কয়েকটি সংগঠন ইতিমধ্যে এ বিষয়সহ হাওরের নানা সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে স্মারক লিপি দিয়েছেন বলে তারা জানিয়েছেন। হঠাৎ চৈত্রের অকাল বন্যায় অকল্পনীয় ক্ষতি। এবছর সব হারিয়ে নি:স্ব এ জেলার হাকালুকি,কাউয়াদিঘি ও হাইলহাওরসহ অনান্য হাওর তীরের লোকজন। এর আগে তারা এমন দূর্যোগ দেখেনি কখনো। বোরো ধানের পর মাছ। এরপর পোষা হাঁস ও অনান্য জলজ প্রাণী চোখের সামনে সবই মরেছে। খাদ্য আর বাসস্থান সংকটে গরু,মহিষ আর গবাদি পশু গুলোও বিক্রি করে দিয়েছেন। অবলম্বন করে বেঁচে থাকার কোন উপকরনই আর হাতে নেই। তাই দূর্যোগ কাটিয়ে উঠতে এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা। গেল ক’দিন থেকে সরকারী তরফে ত্রাণের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পর যা পেয়েছেন তা দিয়ে ২ দিন সংসার চালানোর মতও নয়। আরো যে ত্রাণ পাবেন এমনটি আশ্বস্ত হওয়া ছাড়া বাস্তবে অন্য দৃশ্য। জেলায় প্রায় ৪ লক্ষ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্ধ এসেছে ১ হাজার ভিজিএফ কার্ড। এমন অপ্রতুল ত্রাণের দৈন্যদশায় হতাশ হাওর তীরের ক্ষতিগ্রস্তরা। কর্মজীবী এই লোকগুলো কখনই ত্রাণের উপর নির্ভরশীল হতে চায় না। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় তাদের এমন বেহাল দশা।এখন সংসার আর নিজেদের খাওয়া বাঁচার চিন্তায় চরম উদ্বিগ্ন সর্বহারানো হাওর তীরের লোকজন। কর্মহীন এই লোকগুলো কৃষিকাজ আর মাছ ধরা ছাড়া অন্য কাজে অভ্যস্ত নয়। তারপরও খাওয়া বাঁচার তাগিদে অন্য কাজের মনস্থির করলেও কর্ম নেই। হাওর তীরের লোকজন বোরো ধানের পর পুরো বছর মাছ ধরেই মূলত তাদের জীবীকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এবছর চৈত্রের অকাল বন্যায় সবই উলট পালট। ধান নেই মাছও মরেছে। হাকালুকি হাওর তীরের স্থানীয় বাসিন্ধারা জানান ধান পচে হাওরের পানি দূষিত হওয়ার পর ক’দিনের টানা বৃষ্টিতে পানির অবস্থা স্বাভাবিক হয়। এতে বেঁচে থাকা হাওরের মা মাছ গুলো ডিম ছেড়ে পোনা দিয়েছে। এখন হাওরে কমবেশি মা মাছ যেমন দেখা যাচ্ছে তেমনি পোনা মাছও চোখে পড়ছে। গেল ক’দিন থেকে জেলেদের জালেও ধরা পড়ছে মাছ। স্থানীয় বাজার গুলোতেও কমবেশি দেখা মিলছে দেশীয় প্রজাতির মাছের। হাকালুকি হাওর পাড়ের জেলেরা অভিযোগ করে বলেন এবছর ইজারাদারের লোকজন বিলের আশপাশ কয়েক কিলোমিটার এলাকায় তাদের ভীড়তেই দিচ্ছেন না। ভাসমান পানিতে ইজারাদারদের পাহারাদাররা নৌকা যোগে সবসময় টহল দিচ্ছেন। তারা বিল এলাকার পাশ দিয়েও তাদের অন্যত্র যেতে দিচ্ছেন না। অন্য বছর ইজারাদাররা কিছুটা নমনীয় থাকলেও এবছর তাদের সাথে নির্দয় আচরন করা হচ্ছে বলে জেলেরা অভিযোগ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা বলেন বিল এলাকার বাহিরেও যদি মাছ ধরতে বাধাঁ গ্রস্ত হতে হয় তা হলে খাব কি। এবছরতো এমনিতেই সব শেষ। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীদের আকুতি অত্যন্ত এবছর তাদের অবাধে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হউক।হাওর তীরবর্তী সাদিপুর গ্রামের কৃষি ও মৎস্যজীবী কয়েছ আহমদ বটলাই (৪২) বলেন আমাদের এলাকার লোকজন বোরো ধানের মৌসুমে কৃষক আর বর্ষা মৌসুমে মৎস্যজীবী। বোরো ধান ঘরে তোলার পর হাওরে যখন পানি আসে, তখন তারা দল বেঁধেই মাছ ধরেন। স্বপ্নের ফসল বোরো ঘরে উঠলে ভাতের জন্য তখন আর কোনো চিন্তা করতে হয় না। তাই ওই সময় হাওরে মাছ ধরেই তারা অনান্য খরচ যোগাড় করেন। এবার ধান নেই। হাওরের মাছও মরেছে। তারপরও এখনো যে মাছ হাওরে আছে তা যথেষ্ট বলে মনে করছেন তারা। কিন্তু এবছর তাদের মাছ ধরতে এখন থেকেই বাঁধা নিষেধ আরোপ করছেন ইজারাদারদের লোকজন। এখন ভাসান পানিতে যদি এরকম নজরদারী আর বাধাঁ বিপত্তি থাকে তা হলে পানি কমতে থাকলে তখন আমাদের কি হবে।
তারমত উদ্বিগ্ন একই গ্রামের ইসমাঈল আলী (৫৫),নুনু মিয়া (৫৮),গুলজার মিয়া (৬৫),ইসমেত আলী (৪৯), তমই মিয়া (৫০) সহ মৎস্যজীবীরা। তারা বলেন সরকার হাওরের বিল গুলো ইজারা দেওয়ায় আমরা ওই ইজারাকৃত বিল এলাকার কয়েক কিলোমিটার দূরেও মাছ ধরতে পারি না। জাল নিয়ে মাছ ধরতে গেলে বিল পাহারাদাররা নানা অত্যাচার করে। ভাসমান পানিতেও যদি মাছ ধরতে এরকম সমস্যা হয় তাহলে সামনের দিন গুলোতে আরো ভয়াবহ অবস্থায় পড়তে হবে। তারা বলেন এবছর অকাল বন্যায় সব হারিয়ে আমরা নি:স্ব। এখন হাওরে মাছ ধরার সুযোগ পেলে কিছুটা রক্ষা হয়। মানুষের ঘরে খাবার নেই। হাত খালি। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন যাচ্ছে।এই অসহায় মানুষেরা হাওরে অবাধে মাছ ধরার সুযোগ চায়। সরকার মৎজীবী ও দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় এক বছরের জন্য হাওরের ইজারা বাতিল করার জোর দাবী আমাদের। হাওরের বিলের নির্দিষ্ট জায়গাটুকু সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রভাব খাঁটিয়ে ইজারাদাররা পুরো হাওরই ভোগ করতে চান। তাই বর্ষায় হাওরজুড়ে যে খানে ভাসমান পানি তাকে সেখানে স্থানীয় জেলে ও চাষীদের মাছ ধরতে বাঁধা দেন ইজারাদাররা। জেলা প্রশাসন সুত্রে জানা যায় জেলায় জলমহাল আছে ৫৬৮টি। এর মধ্যে ২০ একরের উপরে ১১২টি। ২০ একরের নিচে ৪৫৬টি। এসব জলমহাল মন্ত্রণালয়,জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ইজারা দেয়। (২০১৬/১৭ অর্থ বছরে) এ পর্যন্ত এবছর ১৭টি জলমহাল ইজারা বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ কোটি ২৮ লক্ষ ২১ হাজার ২শত ৬৪টি টাকা।
জেলা প্রশাসক মো:তোফায়েল ইসলাম বলেন ইজারার বাইরে থাকা জলমহালগুলো উন্মুক্ত থাকে। এতে সবাই মাছ ধরতে পারেন। তা ছাড়া অনেক হাওরের পুরো অংশ ইজারা দেওয়া হয় না, ইজারা হয় নির্দিষ্ট অংশ। এর বাইরে মাছ ধরতে বাঁধা নেই। এবছর হাওর তীরের ক্ষতিগ্রস্থ বোরো চাষী ও জেলেদের জন্য জেলার হাওর ও জলাশয় উন্মুক্ত করে দেওয়ার কোন উদ্যোগ আছে কি না এ বিষয়ে তিনি বলেন এটা সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ার এব্যাপারে আমাদের হাত নেই।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.