হাকালুকি হাওরের বানভাসি মানুষের আতংক ‘আফাল’ ও ‘বলন’

July 11, 2017,

ইমাদ উদ দীন॥ দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হাওর পাড়ের মানুষ। কাটছে নির্ঘুমরাত। রাত জেগে পালা করে দিচ্ছেন পাহারা। উদ্বেগ উৎকন্ঠায় এখন তাদের রাত দিন একাকার। কারন নতুন উপদ্রব ‘আফাল’ আর ‘বলন’। এই দু’টি উপদ্রবই হাকালুকি হাওর এলাকার মানুষের নতুন আতংক। এমন শঙ্কায় দিশেহারা হাওর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্ধারা। রাক্ষুসে হাওরের উত্তাল এই উপদ্রবের কবল থেকে রক্ষায় চলছে তাদের জীবন যুদ্ধ। নিজস্ব নানা কৌশলে বসত ভিটা রক্ষার এ সংগ্রামে শক্তিশালী হাওরের ধকল সামলাতে গিয়ে নিস্তেজ হচ্ছেন তারা। আফাল (বড় ঢেউ) ও বলনের (ঘূর্ণয়মান ঢেউ) তোড়ে চোখের সামনে ঘরবাড়ি বিলিন হচ্ছে। কেড়ে নিচ্ছে তাদের যক্ষের ধন। কিছুতেই রক্ষা করা যাচ্ছে না ঘর বাড়ি। তাদের শেষ ভরসাস্থল মাথাগুঁজার ঠাঁইটি এখন কেড়ে নিতে চায় আফাল আর বলন। তাই নানা ভাবে বলন ও আফালের কবল থেকে রক্ষা পেতে প্রানান্তকর চেষ্ঠা। কিন্তু সবচেষ্ঠাই যেন ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম। ইতিমধ্যে আফাল আর বলন গিলে খেয়েছে তাদের আশপাশের অনেক ঘরবাড়ি। হঠাৎ এমন দূর্ভোগে ভিটে মাটি হারানোর দুশ্চিন্তায় তরা নির্বাক। গতকাল সরজমিনে হাকালুকি হাওর তীরের জালালপুর,মদনগৌরি,মীরশংকর,সাদিপুর,ভূকশিমইল,বাদে ভূকশিমইল,উত্তর সাদিপুর,কাইয়ারচর,শশারকান্দি, বেড়কুড়ি,শাহপুর ও  বেলাগাঁও এলাকায় গেলে চোখে পড়ে মানুষের এমন দূর্দশার চিত্র। ওই এলাকার অধিকাংশ লোকজনই ঘরবাড়ির ফেলে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছেন না। আবার অনেকেই আশ্রয় কেন্দ্র দূরে হওয়ায় আর ঘরবাড়ি রক্ষায় ঝুঁকি নিয়ে পানিবন্ধি অবস্থায় বসবাস করছেন। দূর্ভোগগ্রস্থ স্থানীয় বাসিন্ধারা জানান রাত দিন বলন আর আফালের ভয়ে তারা তটস্ত থাকছেন। তারা জানালেন মাস দিন আগেই উত্তাল হাওর তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। এতোদিন পানি বন্ধি হলেও এখন নতুন শঙ্কা আফাল আর বলন। আফাল আর বলনের থোড় গ্রাস করতে চায় তাদের ঘরবাড়ি। জালালপুর গ্রামের আব্দুর রহমান ও আছিয়া বেগম জানালেন তাদের পরিবারে সদস্য ১১ জন।

পরিবারের উর্পাজন কারী একজন। এখন কাজ নেই,টাকা নেই,ঘরে চালও নেই। তাই পেট ভরে খাবার নেই। এতদিন কোনরকম নিজের বসত বাড়িতে পানিবন্ধি অবস্থায় ঠিকে ছিলেন। এখন আফাল আর বলনের কবল থেকে হয়ত বসতভিটাও আর রক্ষা করা যাবেনা। এ নিয়ে রাত দিন তাদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। একই বাড়ির অপর বাসিন্ধা আব্দুস শহিদ ও রোকেয়া বেগম। তাদের ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে সবাই পড়ালেখায় আছেন। এবছর চৈত্রের অকাল বন্যায় বোরো ধান বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের সব স্বপ্ন শেষ। এরপর একের পর এক বন্যায় চরম ক্ষতিগ্রস্থ তারা। সর্বশেষ চলমান বন্যায় এখন ঘরবাড়িতে পানি। আর গেল ক’দিন থেকে নতুন দুশ্চিন্তা। আফাল আর বলন তাদের তাড়া করছে। ভয় নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোন রকম দিন যাপন করছেন। বানের পানি না কমলে আর ঘরবাড়ি রক্ষা করা যাবেনা বলেও তারা জানান। তাদের মত ওই বাড়িতে বসবাস আরো ৩টি পরিবারে। তাদের সকলের ঘরে হাঁটু আর উঠানে কমর পানি। দেখা গেল ঘরের চারপাশে কচুরি পানা আর গাছের ডাল ও বাঁশের পালা (অগ্রভাগ) দিয়ে আফলের কবল থেকে রক্ষার চেষ্ঠা চালাচ্ছেন। বাড়ির লোকজন জানালেন বানের পানি শরিরে লাগলে চুলকায়। তাছাড়া রয়েছে সাপ ও জোঁকের ভয়। একই গ্রামের চিনু মিয়া ও স্বপ্না বেগম জানালেন তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৯ জন। গেল ঈদের আগে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কিছু চাল পেয়েছিলেন এদিয়ে আর দোকান বাকী করে খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন যাচ্ছে। আর নানা অসুখ বিসুখও নিত্য সঙ্গী হয়েছে। আর গেল কয়েক দিন থেকে আফাল আর বলনের শক্তিশালি থোড় সবই কেড়ে নিতে চাইছে। তাই ঘরের ভিতরে থাকতে যেমন ভয় হচ্ছে। তেমনি বাড়ি ছেড়ে যেতেও মন যাচ্ছেনা। কারন বাড়ি ছেড়ে গেলে বাড়ি ঘরের চারপাশে কচুরিপানা দেওয়া যাবেনা। এমন সুযোগে আফাল আর বলনে আমাদের বাড়ি নিশ্চিহ্ন করে দিবে। তাই তারা বসভিটার মায়ায় বাড়ি ছাড়ছেন না মনের ঠাঁনে। সাদিপুর গ্রামের জয়ফুল বেগম জানান গেল কয়েকদিন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা জ্বর সর্দি ও পানিবাহিত রোগে ভোগছেন। ঘরে চালও যেমন নেই। তেমনি ওষুধও। বৃদ্ধ জয়ফুলের ঘরের সামনে বুক পানি। আর একটি ঘরে ভেতরে কোমর পানি। অন্য ছোট্ট একটি ঘরের ভিটে কিছু উচঁ থাকায় কোনরকম পানির কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। ওই ঘরেই ঠাঁই নিয়েছেন পরিবারের ছোট বড় ৯ সদস্য। জয়ফুল (৬৩)বেগম জনালেন এনজিও সংস্থা আশা আর কারিতাস থেকে ঋণ নিয়ে বসত ভিটা আর ঘরবাড়ি বানিয়ে ছিলেন। তার মৎস্যজীবী ছেলের রোজগার আর তিনি ভিক্ষা করে ওই ঋণ দিতেন। পানি বন্ধি হওয়ায় এখন তাদের কোন আয় রোজগার নেই। তাই ঋণের টাকা জমে যাচ্ছে। প্রতিদিন কিস্তির জন্য তাগিদও দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন ঘরে ভাত নেই। অর্ধহারে  অনাহারে কাটছে দিন। এরমধ্যে ঋণের কিস্তি দেই কিভাবে। মদনগৌরি গ্রামের নাদির মিয়া (৭০) জানান এবছর ৫ বিঘা জমি বোরোধান চাষ করেছিলেন কিন্তু সব কেড়ে নিছে উত্তাল হাওর। ৩য় দফার চলমান বন্যায় গেল কয়েকদিন থেকে আফালের কবলে তার বাড়ির গরু ঘর কেড়ে নেওয়ার পর নিজের বসতঘরও ভেঙ্গে দিয়েছে। তিনি ৭জনের পরিবার নিয়ে এখন অন্যত্র বসবাস করছেন। কায়ারচরের কামরুল ইসলাম জানান তার মা,ভাই আর স্ত্রী নিয়ে ৬ জনের সংসার। এবছর একের পর দূর্যোগের ধকলে তারা চরম ক্ষতিগ্রস্থ। তাদের এলাকার লোকজন নামমাত্র সরকারী সহায়তা পেলেও ক্ষতিগ্রস্থ অনেকেই কিছুই পায়নি। সবহারিয়ে তারা মানবেতর দিনযাপন করছেন। তিনি বলেন এখন হাওর তার ভঙ্কর রুপ আমাদের দেখাচ্ছে।

আফালের ভয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। উত্তর সাদিপুরের লয়েছ মিয়া ও রুসনা বেগম জানালেন তাদের টিবওয়েল পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই খাবার আর রান্নাবাড়ার ভরসা বানের পানি। বন্যার পানিতে যেমন রয়েছে জোঁক। তেমনি ঘরের পাশের পানি শরীরে লাগলে চুলকায়। তাদের একটি ঘর পানিতে ডুবে গেছে। আর অন্য ঘরটিতেও আঘাত হানছে আফাল। তাদের মত অবস্থা পুরো হাওর পাড়ের বাসিন্ধাদের। দিন দিন বাড়তে বাড়তে ঘরের ভেতরে দখল করেছে বানের পানি। তারপরও কোনরকম দিনযাপন করছিলেন তারা। কিন্তু এখন হাওরের বিশাল ঢেউ ঘরের বেড়া আর ভিটার মাটি ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বেলাগাঁও গ্রামের মাজু মিয়া (৫০) জানালেন এখন বলতে গেলে পানির সাথে লড়াই করে তারা ঘরবাড়িতে টিকে আছেন। বন্যার ভয়াবহতা চিন্তা করেই সমতল থেকে ১০-১২ ফুট উচ্চতায় বাড়ির ভিটে বাধেন। তার আরও উপরে তৈরি করেন বসতঘর। কিন্তু তারপরও আফালের থোড় থেকে রক্ষা মিলছেনা তার বসতভিটার। হাকালুকি হাওর তীরবর্তী কুলাউড়ার ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির ও জুড়ীর জায়ফরনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাছুম রেজা জানান, হাকালুকি হাওর এখন তার উত্তাল রুপ দেখাচ্ছে। ভয়াবহ ঢেউ তীরবর্তী এই এলাকাগুলোর রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি করছে। মানুষের বাড়িঘরও ভাঙছে। এবছর একের পর এক প্রাকৃতিক দূর্যোগে হাওর পাড়ের মানুষ চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ওদের এমন বিপদের দিনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে তারা সরকারের পাশাপাশি সমাজের বৃত্তশালীদের এগিয়ে আসার আকুল আবেদন জানান।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com