
স্টাফ রিপোর্টার॥ এবার পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করলেন নানা অপকর্মের হোতা,নারী লোভী, প্রতারক ও মামলাবাজ মৌলভীবাজারের আলোচিত সজিব নামের এক ব্যাক্তি। নিজের নানা অপকর্ম ঢাকতে এমন নতুন ফন্দি তার।
জানাযায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সার্কেলের সাবেক এএসপি (বর্তমানে ডিএমপিতে কর্মরত) আলমগীর হোসেনসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে হেফাজতে নির্যাতন, ছিনতাই ও হয়রানির অভিযোগে মামলা করেন সজিব। গত ৫ জুলাই মৌলভীবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সজিব পিটিশন মামলা দায়ের করলে আদালত ওই দিন পুলিশ সুপারকে মামলা দায়েরের নির্দ্দেশ দেন। আদালত থেকে কাগজাত পৌছালে ৯ জুলাই মৌলভীবাজার মডেল থানায় একটি মামলা হয়।
মামলার অপর আসামিরা হলেন মৌলভীবাজার মডেল থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ মো. আবদুছ ছালেক, এসআই মোঃ নাজিম উদ্দিন, এসআই মঞ্জুরুল হাসান মাসুদ, এসআই মো. আবদুল হাশিম এবং মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও এনটিভির প্রতিনিধি এসএম উমেদ আলী, সাংবাদিক আজিজুল হক বাবুল ও আবদুল মালেক মনি। মামলায় তাকে মেরে ফেলার হুমকি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। এই মামলার প্রেক্ষিতে সংবাদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে একাধীক সংবাদিককে অকথ্যভাষায় গালিগালাজ, ৫৭ ধারায় মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দেন সজিব। তার এমন অশালীন আচরণ ও প্রাণ নাশের হুমকির প্রেক্ষিতে সিনিয়র সাংবাদিক এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের জেলা প্রতিনিধি সৈয়দ মহসিন পারভেজ ও মৌলভীবাজার অনলাইন প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে ১৩ জুলাই পৃথক দুটি জিডি করেন। এই ঘটনা জানাজানি হলে মৌলভীবাজার জেলা ও উপজেলায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট,ইলেকট্রনিক্র ও অনলাইন পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকরা বিক্ষুব্দ হন। জেলার চিহ্নিত নানা অপকর্মের হোতার এমন আস্ফালনে ক্ষোভ ও নিন্দা জানান নানা শ্রেণী ও পেশার মানুষও। এঘটনার প্রতিবাদে এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে খুব শিগগিরই জেলা ও উপজেলার সাংবাদিকরা নানা আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছেন বলে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দরা জানিয়েছেন।
এদিকে নানা অপকর্মের হোতা সজিবের প্রতারনা এখনো থেমে নেই। সম্প্রতি সে আরশদ নামে এক ব্যাক্তিকে সাথে নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে মৌলভীবাজারে আসে এবং নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজের দুটি রুম ২০৬ ও ২০৮ নং কক্ষ ভাড়া নেয়। সে গত ২দিন ঐ ভূয়া পরিচয়ে সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলো। এ বিষয়ে সার্কিট হাউজের দায়িত্বরত অফিসার (এনডিসি) জেপি দেওয়ান বলেন, সাইফুল ইসলাম সজীব সার্কিট হাউসে অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই সজীবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ আসে। পরে আমরা যখন জানতে পেরেছি যে-ঐ ব্যাক্তি (সজীব) সরকারি কর্মকর্তা ও ভিআইপি ক্যাটাগরীর কেউ নয় তখন তাকে আমরা ১৫ জুলাই শনিবার সকালে সার্কিট হাউজ থেকে বের করে দিয়েছি।
কে সেই সাইফুল ইসলাম সজীব: জেলার কমলগঞ্জ থানার আদমপুর গ্রামের দরিদ্র পল্লী চিকিৎসক হাবিবুর রহমানের ২য় স্ত্রীর পুত্র সাইফুল ইসলাম সজীব। মৌলভীবাজারে জেপিএল ফার্ণিচার নামে রয়েছে তার একটি ফার্নিচারের দোকান। ফার্নিচার ব্যবসার আড়ালেই চলে তারা নানা অপর্কম। তার দোকানে ফার্নিচার ক্রয় করতে আসা মহিলাদের সঙ্গে নানা কৌশলে সখ্য তৈরীর পর দোকানের নিজের বসার চেম্বারের পিছনের একটি কক্ষে, মৌলভীবাজার শহরে ও ঢাকায় ভাড়া করা বাসায়, পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতে নিজের বাসায়, কখনো ভূক্তভোগীর বাসায় অবৈধ মেলামেশার দৃশ্য গোপন ক্যামেরা,মোবাইল ফোন ও স্কাইপিতে ধারন করে রাখে। বিশেষ করে প্রবাসীদের সুন্দরী স্ত্রীদের উপর তার টার্গেট। পরে ওইসব অশ্লীল ছবি দেখিয়ে সে দিনের পর দিন মহিলাদের যৌন নিপীড়নে বাধ্য ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করে। শুধু নারী নয়। একাধিক পুরুষও সজীবের ব্ল্যাকমেইলের শিকার। একাধিক নারী দিয়ে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে গোপনে এসব দৃশ্য ধারণ করে অর্থ আদায়ের ঘটনাও রয়েছে একাধীক। একজন চতুর ও দক্ষ সাইবার ক্রিমিনাল সজীব নিজের মোবাইলে এসব কথাবার্তা রেকর্ড করা তার নেশা।
যেভাবে মহিলাদের ফাঁদে ফেলে লম্পট সজীব:-একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রথম দিকে তার প্রতিষ্ঠানের ফার্নিচার ক্রয় করতে ধনাঢ্য মহিলা, প্রবাসী স্ত্রীদের আপ্যায়ন ও মনভুলানো আচরনের মাধ্যমে কৌশলে মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে বিভিন্ন অজুহাতে মোবাইল ফোনে কথা বলে। সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর তাদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে এবং ওই দৃশ্য গোপনে ধারন করে। এক পর্যায়ে তা ভূক্তভোগীকে দেখিয়ে দীর্ঘদিন তার সঙ্গে মেলামেশা করতে বাধ্য করে এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করে। আর আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল মহিলাদের নগদ অর্থ দিয়ে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ায়।
অসংখ্য ব্ল্যাকমেইলের হোতা সজীব: মহিলাদের নানা ফাঁদে ফেলে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তা গোপন ক্যামেরায় ধারন করে ব্ল্যাকমেইলিং করা তার নেশা। শারীরিক সম্পর্ক করতে না পারলে ভাড়াটে মাস্তান লেলিয়ে দেয়া তার কাজ। তার লালসার শিকার মহিলাদের বেশিরভাগই বিবাহিত নারী চিকিৎসক, আইনজীবী, গৃহীনি, গৃহশিক্ষিকা, স্কুল কলেজের ছাত্রী থেকে শুরু করে গৃহকর্মীও বাদ যায়নি। এসকল মহিলাদের শুধু লালসার শিকার বানিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি সে। কোন কোন ক্ষেত্রে অন্তরঙ্গ মিলনদৃশ্য নিজে তৈরী করে ভূক্তভোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল অর্থও। কিন্তু মান সম্মানের ভয়ে ভূক্তভোগীরা মামলা বা অভিযোগ দিতেও পারছেন না।এ ভাবে ব্ল্যাকমেইলিং স্বীকার হয়েছেন হাইকোর্টর আইনজীবী মাহফুজা হক। এ আইনজীবি গত ১৭/০১/১৫ তারিখে ঢাকার আদাবর থানায় প্রতারক সজিবের বিরুদ্ধে একটি জিডি করেছেন। জিডি নং ৮২৬।
পরিস্থিতি বুঝে বিভিন্ন পরিচয় সজীবের:- যখন যেখানে যে পরিচয় দিলে প্রতারণা করা যায় সেভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করে সে। বংশের কেউ কোন দিন জেলা আইনশৃংখলা কমিটির সদস্য না থাকলেও ঢাকায় বসবাসরত এক মহিলাকে বিয়ে করার জন্য নিজেকে জেলা আইনশৃংখলা কমিটির সদস্য হিসেবে অভিজাত লোক জাহির করে। ওই মহিলাকে তার মাসিক ৪০ লক্ষ টাকা আয়, নিজে ডাক্তারের ছেলে ইত্যাদি পরিচয় দিয়ে ওই মহিলাকে ভালবাসে এবং আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তাকে মোবাইলে বিয়ের শপথ করে স্থায়ীভাবে সংসার করার স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ায়। যদিও এই মহিলার স্বামী ও ২ ছেলে সন্তান রয়েছে যার একজন অনার্সে, আরেকজন স্কুলে পড়াশোনা করে। ঢাকার রামপুরায় এক বাড়ীর মালিক জনৈক মহিলার সাথে আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে মহিলাকে তার সাথে বাহিরে চা খাওয়ার অফার দেয়। মহিলা তার বোনের সাথে দেখা করার জন্য লন্ডন যাবেন জানতে পেরে সজীবও লন্ডন যাবে জানিয়ে একসাথে লন্ডন যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ওই মহিলা তার কথায় গুরুত্ব না দিলে তাকে সজীব মৌলভীবাজারে বেড়াতে আসার প্রস্তাব দিয়ে জানায়, এখানে সে ডুপ্লেক্স বাংলোবাড়ী ও রাবার বাগান করেছে যা দেখার মত। মহিলা তাকে বাড়ীটি ভাড়া দেওয়ার পরামর্শ দিলে সজীব জানায়, সে এটিকে বৃদ্ধাশ্রম বানাবে। তার বড় ভাই ও ছোট বোন এমবিবিএস ডাক্তার। ডাক্তার পরিবারের সবাই নাকি বাংলোটিতে বৃদ্ধদের চিকিৎসা সেবা দিবে। যদিও বাস্তবে এসবের অস্তিত্ব নেই। সিলেটে তার পরিচিত একজনের কাগজপত্র বিহীন পিকআপ ট্রাফিক পুলিশ আটক করলে সজীব ফোনে পুলিশকে জানায়, সে বাংলাদেশ টেলিভিশন আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় নেতা এবং প্রাক্তন আইজিপি মোদাব্বের হোসেন চৌধুরীর বড় বোনের ছেলে। ঢাকা থেকে জৈনক ২ সন্তানের জননী তার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে ওই মহিলাকে সিঙ্গেল সিট দেয়ার জন্য হানিফ পরিবহনের সুপার ভাইজারকে ফোনে জানায়, সে মৌলভীবাজার হানিফ কাউন্টারের বিল্ডিং এর মালিক। এভাবে সজীব বিভিন্ন মিথ্যা পরিচয় দিয়ে প্রতারনা করে। মৌলভীবাজারে কর্মরত একজন এমবিবিএস মহিলা চিকিৎসকের সাথে দৈহিক সম্পর্ক করে তার ভিডিও দৃশ্য ধারন করে দীর্ঘদিন ব্ল্যাক মেইলিং করে নানা সুবিধা নিয়ে এক পর্যায়ে সম্পর্কের অবনতি হলে স্কাইপিতে ধারন করা ভিডিও দৃশ্য সিডি আকারে মহিলার স্বামীর কাছে এবং ওই চিকিৎসকের বিদেশে অনার্সে অধ্যয়নরত মেয়ের ই-মেইলে পাঠিয়ে দেয় এবং চিকিৎসকের মোবাইলে হুমকি মূলক মেসেজ দিয়ে তার মেয়ের ইমেইল চেক করতে বলে। মান সম্মান হারিয়ে মহিলা সজীবের বিরুদ্ধে ধর্ষনের মামলা করলে উল্টো জামিনে এসে মহিলাসহ পুলিশের কর্মকর্তাদের হয়রানির চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। শত শত লম্পট্যের নায়ক সজীব নিজের অপকর্ম ঢাকতে এখন পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছেন।
মৌলভীবাজার মডেল থানায় ব্ল্যাকমেইল করতে গিয়ে গ্রেফতার:- ২০১৪ সালের ১৪ আগষ্ট বৃহস্পতিবার রাত ৮ টার দিকে মৌলভীবাজার মডেল থানায় ঢুকে পুলিশ কর্মকর্তার সাথে গোপনে কথোপকথন মোবাইলে ধারণ ও দুইজন পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগে একাধিক মামলার এ আলোচিত আসামী সাইফুল ইসলাম সজিবকে আটক করে থানা পুলিশ। সজিবের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি, সুন্দরী মহিলাদের গোপনে ছবি ধারণ করে ব্লেকমেইল ও হুমকী প্রদর্শনের অভিযোগে মৌলভীবাজার সহ দেশের বিভিন্ন থানায় অভিযোগ রয়েছে। ওই দিন সজিব কয়েকজন লোককে সাথে নিয়ে মৌলভীবাজার সদর থানায় প্রবেশ করে উপ-পরিদর্শকদের কক্ষে গিয়ে বসে। একপর্যায়ে সে এসআই নাজিম উদ্দিনের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করে এবং দুজনের মধ্যে চলা কথোপকথন গোপনে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে ধারণ করতে থাকে। এসময় এসআই নাজিম উদ্দিনের সন্দেহ হলে তিনি তার অপর সহকর্মী পুলিশ এসআই মঞ্জুরুল হাসান মাসুদকে বিষয়টি জানান। বিষয়টি জেনে এসআই মাসুদ সজিবের ধারণ করা ভিডিও চিত্রের বিষয়টি জিজ্ঞেস করেন। সজিব প্রথমে ধারণ করার বিষয়টি অস্বীকার করে এবং পরে তার সঙ্গীয় লোকজন উত্তেজিত হয়ে একসাথে তাদের উপর হামলা চালায়। এসময় সজিব ও তার সঙ্গীরা কিল ঘুষি মেরে এসআই মঞ্জুরুল হাসান মাসুদ ও নাজিম উদ্দিনকে আহত করে। পরে থানায় উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এসে তাকে আটক করে। এ সময় সজিবের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। যার ফোন মেমোরিতে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অসংখ্য অডিও ও ভিডিও রেকর্ড পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা তার বক্তব্য ও ভিডিও ফুটেজ ধারণ করতে গেলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন কথাবার্তা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে তার সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে পুলিশ এ্যাসল্ট, ব্ল্যাকমেইলিং ও আইটিসি এক্টে মামলা দায়ের করে আদালতে প্রেরণ করে। আদালত তাকে জামিনে মুক্তি পেয়ে একই ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে লম্পট সজিব।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.