বিকুল চক্রবর্তী॥ ১৯৪৫ সালের ১৭ নভেম্বর তৎকালীন সিলেট জেলার কুলাউড়া আলালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মৌলভীবাজার জেলার আওয়ামীলীগের জনপ্রিয় নেতা, বঙ্গবন্ধুর গুনমুগ্ধ, সাবেক সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল জব্বার। নিভৃত পল্লিতে বেড়ে ওঠা কৃষক পরিবারের সন্তান ব্যক্তিগত আরাম আয়েস, ভোগ বিলাস, স্বাচ্ছন্দকে তুচ্ছ করে যিনি আমৃত্যু নির্যাতিত, বঞ্চিত, নিরন্ন, বানভাসী, অসহায় মানুষের অধিকার ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর অবদান শুধু কুলাউড়া উপজেলা নয় সমগ্র জাতির জন্য এক আলোর দিশারী। বর্তমান প্রজন্ম ও আগামী প্রজন্মের মেধা, মনন বিকাশে, সঠিক ইতিহাসচর্চা, জ্ঞান আহরণ ও সুবিবেচক এবং বাংলাদেশের সুনাগরিক হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার যে প্রয়াস নিয়ে এগিয়ে চলছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তাঁর সে প্রয়াসকে বাস্তব রূপদান করতে হলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত ও নিবেদিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আত্মকর্ম ও জীবনাদর্শ ব্যাপকভাবে তরুন প্রজন্মের নিকট তুলে ধরার দাবী রাখে। আর হারিয়ে যাওয়া সেই সকল ত্যাগী নেতা-কর্মীরা যারা লেখনী ধরার পুর্বেই অমোঘ সত্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন ইতিমধ্যে, সেই সকল মানুষদের জীবনালেখ্য তরুণ প্রজন্ম তথা জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখতে পারে। এমনি এক মফস্বলের অবিসংবাদিত নেতা, কুলাউড়া তথা সিলেট আওয়ামীলীগের নিভৃতচারী নক্ষত্র মরহুম মো. আবদুল জব্বার। অতি ক্ষুদ্র পরিসরে, কৃষক পরিবারেও জন্মগ্রহণ করে কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে মহান জাতীয় সংসদে উপনীত হওয়ার উদাহরণ মরহুম মো. আবদুল জব্বার। ৬২ সালের শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান, ৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ সর্বত্রই ছিল তাঁর অংশগ্রহণ ও বিচরণ আওয়ামীলীগ তথা এ দেশকে করেছে মহিমান্বিত। আর স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশরে প্রতিকুলতাগুলো মোকাবেলায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
১৯৫৭ সালে আওয়ামীলীগের একটি বিরাট অংশ ‘কাগমারী সম্মেলনের’ মরহুম মৌলানা ভাসানীর নেতৃত্বে দল ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামীলীগে নেতা কর্মীরা প্রায়সবাই ন্যাপে চলে যান। তখন সংগঠনের এই দুদিনের দলকে ধরে রাখতে এবং পুনরায় সুসংগঠিত করার কাজে যে কয়জন নেতা অগ্রগণ্যদের তালিকায় ছিলেন তাদের মধ্যে মরহুম আবদুল জব্বারও একজন ।
১৯৫৮ সালে সালে সামরিক শাসনের সময় বহু নির্যাতন ও কষ্ট ভোগ করে জীবনকে বাজী রেখে সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। দেশ স্বাধীন হবার পরও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রতিবাদ করায় ১৯৭৫ সালে ১১ মাস ও ১৯৭৭ সালে প্রায় একবছর তাঁকে জেল কাটতে হয়েছে। তার নিখাদ দেশপ্রেম ও নির্ভেজাল গণসংযোগের ফলে কুলাউড়া থানাসহ পুরো সিলেট জেলায় আওয়ামীলীগের ভিত মজবুত হয়। এছাড়া, জাতীয় পর্যায়ে সংগঠনের ভিত মজবুত রাখতে আজীবন সততার সাথে পরিশ্রম করে গেছেন। নিখাদ জনপ্রিয়তার একটি পূর্বশর্ত হলো ব্যক্তিগত সততা । তিনি সমাজের সকল শ্রেণিগোষ্ঠী জাতির নিকট একজন সৎ ও নির্ভীক নেতা হিসেবে বিদিত ছিলেন। জনগণের দল আওয়ামীলীগ ও জনগণের কল্যাণ কামনা ও কল্যাণকর কর্মই ছিল তাঁর ভাবনাবিলাস। তিনি মূলত কৃষকফ্রন্টে কাজ করলেও সকল শ্রেণির মানুষের সাথে তাঁর সদ্ভাব ছিল। তিনি চা বাগানের শ্রমিকদের ও নেতা ছিলেন। মহান জাতীয় সংসদে তিনি কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সুখ দুঃখ, আশা আকাক্সক্ষার কথা বলতেন। তিনি ছিলেন ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী মরহুম আবদুল জব্বার ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের প্রতি উদারতা মানুষকে আকৃষ্ট করত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা পর তিনি এর প্রতিবাদ করলে, তাকে বার বার জেল খাটতে হয়। শুধু জেল নয় তৎকালীন মাথাচাড়া দিয়ে উঠা একাত্তরের রাজকাররা তাকে হত্যারও পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্ত এদেশের মানুষের কাছে তিনি একজন নিবেদিত প্রাণ ছিলেন বলে তাদের পক্ষে তা করা সম্ভব হয়নি। তিনি যে, মানুষের নেতা ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে। তৎকালীন সামরিক জান্তা সরকার স্বাধীনচেতা মানুষকে ভয় ও আতংকের মধ্যে রেখেছিলো বঙ্গবন্ধু প্রীতিভাব দেখলেই তাদের উপর চলে আসতো জেল জুলুম। এ অবস্থায় মানুষ আওয়ামীলীগকে ভোট দিতে গিয়েও পারেনি। তদুপরি সাহসিকতার সাথে ৭৯ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পক্ষে নির্বাচন করে তিনি বিপুল ভোট জয় লাভ করেন। সে নির্বাচনে সারা দেশে মাত্র ৩৯ জন আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বলা চলে পরাশক্তি মদদকারী ৭৫-এ ক্ষমতা দখলকারীদের ভয়ে সে দিন যদি আবদুল জব্বারদের মতো নেতারা মৃত্যুকে উপেক্ষা করে আন্দোলনে না নামতেন, নির্বাচনে না যেতেন, তাহলে আজকে বিশ্বের একটি অন্যতম রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগ হয়তো রূপ নিতো না।
তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য, কুলাউড়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক, উপজেলা পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও কৃষক লীগের একজন ত্যাগী নেতা ছিলেন।
তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রাক্তন হুইপ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আজিজুর রহমান জানান, ১৯৬২ সালে কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধি আন্দোলনে তাকে কারাবরণ করতে হয়।
তিনি ১৯৬৫ সালে কুলাউড়া থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে মৌলভীবাজার মহকুমা আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে গতি সঞ্চারক হিসেবে তিনি অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্থ বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কাজে অমুল্য অবদান রাখেন।
তাঁর নেতৃতে ১৯৮৯ সালের ১৯ মার্চ বৃহত্তর সিলেটের কৃষক মহাসমাবেশ কুলাউড়ায় অনুষ্ঠিত হয়। সেই সমাবেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সহ অনেক কেন্দ্রীয় নের্তৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন, তখনকার স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের সকল ষড়যন্ত্রের একমাত্র মোকাবেলাকারী। তিনি তখন জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি নিজেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন মাঠকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে গৌরব বোধ করতেন। ক্ষমতার দাপট কখনো দেখাননি, তাঁর মধ্যে প্রকাশ হয়নি কখনো অহমিকার বিন্দুমাত্র লেশ। নিখাদ দেশপ্রেম ও নির্ভেজাল গণসংযোগের ফলে কুলাউড়া থানাসহ পুরো সিলেট জেলায় আওয়ামীলীগের ভিত মজবুত হয়। এছাড়া, জাতীয় পর্যায়ে সংগঠনের ভিত মজবুত রাখতে আজীবন সততার সাথে পরিশ্রম করে গেছেন।
মৌলভীবাজার-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য, সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ মো: আব্দুস শহীদ বলেন, জনসেবায় তাঁর অবদান দেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট রহমত আলী বলেছিলেন, সারাটা জীবন তিনি অন্যায়ে বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। মাসের পর মাস কারাবরণ করেন। তিনি ছিলেন মুজিব আদর্শের সুযোগ্য সৈনিক। কখনো ঐ আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতির লক্ষণ তাঁর জীবনে ঘটেনি। তিনি ইউপি চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় সংসদ সদস্যসহ সকল পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে সার্থক ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ।
প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও জনপ্রিয় আওয়ামীলীগ নেতা সুলতান মো: মনসুর আহমদ জানান, কৃষকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেও যে রাজনৈতিক দর্শন কুলাউড়াবাসীর জন্য রেখে গেছেন তা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। মহান মুক্তিদ্ধের একজন বলিষ্ঠ সংগঠক ও যোদ্ধা হিসেবে তাঁর অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।
বর্তমান মহাজোটের শরীক বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, তিনি শুধু কৃষক আন্দোলনের নেতা নন, তিনি আপাদমস্তক একজন কৃষক, তাঁর কাছে মাটির মানুষের সুবাস পেয়েছিলাম। সংসদেও প্রাণমুখর দিনগুলোতে তিনি গঠনতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন একনিষ্ট কর্মী হিসেবে সংসদে মাটি মানুষ ও কৃষকের কথা তুলে ধরতেন।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এম.এ. রহিম জানান, ১৯৭৫ সালে একসাথে জেলে থাকার সময় মাঝে মাঝে আমরা হতাশ হয়ে কান্নাকাটি করলেও তিনি অভয় দিতেন, মিটিমিটি হেসে বলতেন সব ঠিক হয়ে যাবে, কোন ভয় নেই। জেল থেকে যখন আমি ছাড়া পাই, তখন কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘রহিম, বাইরে সবাইরে এক কর, এক রাখ, কিছু একটা হবেই’।
এছাড়া, তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের বিমুর্ত প্রতীক। তিনি আমৃত্যু আওয়ামীলীগের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাবান থেকে পরিছন্ন জনবান্ধব রাজনীতি করার এক অনন্য দৃষ্ঠান্ত স্থাপন করে যান।
১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় সংসদে বক্তব্য দিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি বলতেন, প্রথমত আমি বাঙালি তারপর আমি সিলেটি।
১৯৮৪ সালের বন্যার সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুলাউড়া ও রাজনগরের বন্যা দুর্গত এলাকায় বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বণ্টন করে কুলাউড়া ডাকবাংলোয় জনসভা করেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাবার টেবিলে, তিনি তাঁকে বলেছিলেন আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, জনগণ অনেক আশা করে আপনার দিকে চেয়ে আছে। আপনি পিতার মত জনগনের পাশে থাকবেন, জনগণ এটাই চায়। এবং জনগণ আজকে আমরা বঙ্গবন্ধুর মতই জনবান্ধব নেত্রী হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে পেয়েছি।
এই আগস্টেই বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর মাসে ১৯৯২ সালের ২৮ আগস্ট আব্দুল জব্বার আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন।
বর্তমান প্রজন্মকে স্বপ্নহীন, আশাহীন, লক্ষ্যহীন, আস্থাহীনতা, আত্মস্বার্থে নিয়োজিত রুগ্ন রাজনৈতিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে সুস্থ রাজনীতির জন্য এই মহৎপ্রাণ আবদুল জব্বারের মতো মানুষের জীবনসংগ্রামের চর্চা অতিব জরুরি। তাই এই ত্যাগী নেতাকে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.