মু.ইমাদ উদ দীন॥ ওরা ছিল তার বন্ধু। আমার ছেলে সব সময়ই ওদের সাহায্য করত। তাদের বিপদ আপদে এগিয়ে যেত। পরিবারকে এতটুকু সময় দেয়নি। যতটুকু সময় রাজনীতিতে দিয়েছে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সে খুব আপন ছিল। ঘাতকরা সবাই খুবই ঘনিষ্ট। একই দলের ও গ্রুপের। দল ও গ্রুপে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্ধে পরিকল্পিত ভাবে সবাই মিলে আমার ছেলেটিকে হত্যা করে। ওরা কিভাবে খুন করল তাকে। তাদের পাষান্ড হ্রদয়ও একটুকু কাঁপল না। তুষার,তামিম,প্রতীক ও সৌমিক কে সে অনেক আপন মনে করত। তুষার কে তো আমার ছেলে প্রায়ই বাসা থেকে টিফিন নিয়ে খাওয়াত। তার বিনিময় হত্যার মাধ্যমে সে পরিশোধ করল। এমন আহাজারি আর ক্রন্দন নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাবারে মা সেলিনা রহমান চৌধুরীর। এভাবেই নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাবাব আর মাহির বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পাড়া প্রতিবেশীরা দু’পরিবারকে স্বান্তনা দিতে ভীড় জমাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই থামানো যাচ্ছেনা কান্না। ছেলে হারানোর শোকে মা বাবা ও স্বজনরা বিলাপ করছেন আর মূর্চা যাচ্ছেন। উপস্থিত সকলের কাছে ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন তারা। আর ওদের নানা স্মৃতি বলে আর ছবি বুকে জড়িয়ে শোক নিভৃত করার র্ব্যথ চেষ্ঠা চালাচ্ছেন। তাদের এমন আর্তনাদ আর বোবা কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে উভয় বাড়িতে চলছে স্বজন হারানোর বেদনার মাতম। এমন দৃশ্যে উপস্থিত সবাই অঝোরে কাঁদছেন। উঠতি বয়সী সম্ভাবনাময়ী দুটি সন্তান খুন হওয়ায় ওদের পরিবারের মত নির্বাক পুরো জেলার অভিভাবক মহল। এই খুনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন শিক্ষক,শিক্ষার্থী ও নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। রাজনৈতিক দ্বন্ধে এ জেলায় এই প্রথম জোড়া খুনের ঘটনায় জেলার সর্বমহলের বাসিন্ধাদের মধ্যে বাড়ছে নানা উদ্বেগ উৎকন্ঠা। স্কুল ও কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থী নিয়ে নতুন করে ভাবনায় পড়েছেন অভিভাবক মহল। এ ঘটনার পর থেকে শহরে স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরাও আতঙ্কিত। এ যেন শান্তির শহরে হঠাৎ অশান্তির বিষাক্ত ছোঁবল। ১১ ডিসেম্বর নিহত শাবাব ও মাহির বাড়িতে গেলে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।
সোমবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের পুরাতন হাসপাতালের সিদ্দিক মঞ্জিলের বাসায় নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাবাবের মা সেলিনা রহমান চৌধুরী, বাবা অবসর প্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক ছেলের নানা স্মৃতি তুলে ধরে অঝোরে কাঁদছিলেন। বাসায় শাবারে দুই খালা ও অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বোন ফাতেমা সাফওয়াতসহ স্বজনরা ও পাড়া প্রতিবেশীরা তাদের স্বান্তনা দিচ্ছেন। শাবাবের মা সেলিনা রহমান চৌধুরী কেঁদে কেঁদে জানালেন যাদের কে আমার ছেলে টিফিন খাওয়াল। যাদের কে সময় দিল। সাহায্য সহযোগীতা করল। তারাই আমার ছেলেকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করল। আমার ছেলে স্কুল জীবন থেকে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। রাজনীতির নেশায় সে এতটা বিবোর ছিল যে আমাদের বাধা বিপত্তিতেও সে দমত না।
শাবাব অত্যন্ত মেধাবী,আকর্ষণীয় চেহারা আর সাহসী হওয়ায় আওয়ামীলীগ,যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে অত্যন্ত পচন্দের ছিল। ওই নেতারাই তাকে নানা ভাবে ফুসলিয়ে রাজনীতি সক্রিয় করেন। তারা শাবাবকে লোভ দেখাতেন আগামী জেলা কমিটিতে তাকে ভালো পদ দেওয়ার। বাসায় আমাকে সে প্রায়ই বলত আম্মা আমি আগামীতে জেলা কমিটির ভালো একটি পদ পাব। আমি তখন বলতাম বাবা এই পদ দিয়ে তুমি কি করবা। তুমিতো কিছু দিন পরে দেশের বাহিরে চলে যাবে। প্রতিত্তোরে সে বলত আম্মা রাজনীতি করলে পদ ছাড়া কাজের মূল্যায়ন হয়না। শাবাব সবসময়ই ছাত্ররাজনীতির কর্মকান্ডে ব্যস্ত থাকত। এ কারনে বাসায় এমনকি পরিবার ও স্বজনদেরও তেমন সময় দিতে পারতনা। বাসায় থাকলেই ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা ভীড় করত। বিশেষ করে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মীরা আসত। আমি ওদের জিজ্ঞেস করতাম তারা ওখানে কেন আসে। ওরা বলত তারা ছাত্রলীগের কর্মী। শাবাব তাদের দলের বড় ভাই। সে নাকি তাদের নানা সমস্যা দেখভাল করে। তিনি ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন রেখে বলেন আমার ছেলে যাদের জন্য রাজনীতিতে সক্রিয় হল। যারা আমার ছেলেকে রাজনীতিতে নিয়ে গিয়ে তাদের ফায়দা হাসিল করল। তারা আজ কোথায়। তারা এখন নাকি বলছে আমার ছেলে ছাত্রলীগের কেউ না। তারা আগে কেন আমার বাসায় এসে ভীড় করত।
তিনি বলেন তুষার তার পরিবার থেকে বিতাড়িত হলে আমাদের বাসায় আসত। তার সাথে ফাহিম ও প্রতীক আসত। তাদের টিফিন খাওয়াত শাবাব। অথচ গ্রুপিং দ্বন্ধে দলীয় হীনমন্যতায় তারাই তার ঘাতক হল।
গেল পৌর নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে সেলিনা রহমান বলেন আমার ছেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের দলের প্রার্থীকে জয়ী করাল। তখন মিষ্টি নিয়ে হাঁসিমুখে ওই নেতারা আমার বাসায় এসেছিলেন। এখন ওরা কোথায়। আমার ছেলে ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা থাকলেও সে নিহত হবার পর এখন পর্যন্ত আমাকে ও আমার পরিবারকে স্বান্তনা দেওয়াতো দূরের কথা ওরা কেউ বাসায়ও আসেনি। অথচ ওই নেতারাই আমার ছেলেকে দিয়ে সরকারী কলেজ ও সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড চালাতে উৎসাহ যোগাতেন। বলতেন ওই প্রতিষ্ঠান গুলোতে নিজের দলের কর্মী বৃদ্ধি করতে।
আমার ছেলেকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে সিলেট মেট্রপলিটন ইউনির্ভারসিটিতে আইন বিভাগে ভর্তি করালেও ওই নেতাকর্মীরাই রাজনৈতিক স্বার্থে তাকে আবার মৌলভীবাজারে নিয়ে আসেন। সে সরকারী কলেজে ডিগ্রীতে পড়া লেখা করত। গেল প্রায় মাস দিন থেকে সে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক হয়। আগে তাকে বিদেশ যেতে বললে রাগ করত। কিন্তু দলীয় রাজনীতির গ্রুপিং আর হিংসাপরায়নতা তার আগের সিন্ধান্তকে অনেকটা বিচলিত করে। চলতি মাসের ১২ তারিখে তার পাসপোর্ট হাতে আসার কথা। আমেরীকায় স্বপরিবারে যাওয়ার আবেদন থাকলেও। সে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কারন ওখানে তার দু বোন রয়েছেন। শাবাবের মা আক্ষেপ করে বলেন আমার শাবাব দেশের চলমান নোংরা রাজনীতির জন্য প্রাণ দিল।
একই দল ও গ্রুপের সহকর্মী বন্ধুদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হল। তিনি বলেন দেশের এমন ঘৃণ্য রাজনীতি যেন অচিরেই বন্ধ হয়। এভাবে যেন আর কোন মায়ের বুক খালি না হয়। তিনি এই জোড়া খুনের ঘাতকদের দ্রুত গ্রেফতার করে ফাঁসি বাস্তবায়ন করা জোর দাবী জানান। তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা জানান সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত মাহি ঘটনার ২-৩ দিন আগে হন্তদন্ত হয়ে বাসায় এসে শাবাবের খোঁজ করছিল। তার কারন জানতে চাইলে সে বলেছিল তাদের মধ্যে মারামারি হয়েছে। শাবাবের কাছে বিচার দিতে এসেছে। তার বিমূর্ষ অবস্থা দেখে শাবারে মা তাকে বসিয়ে পানি ও নাস্তা খাওয়ান। তারা বলেন তার সহপাঠী, বন্ধু ও সহকর্মী সুত্রে জেনেছেন তুষার ও তামিমের সাথে দলীয় গ্রুপিং দ্বন্ধের কারনেই পূর্ব পরিকল্পিত ভাবেই এই খুনের ঘটনা ঘটে।
শাবাবের বাবা বলেন মরে গিয়ে সে বেঁচে গেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক অবক্ষয় থেকে সে রক্ষা পেয়েছে। তিনি বলেন শাবাব নামের অর্থ যুবক। সে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই নোংরা রাজনীতির খপ্পরে পড়ে দুনিয়া ছাড়তে হল। আমি দেশবাসীর কাছে এই হত্যা কান্ডের দৃষ্টান্ত মূলক বিচার চাই। অপর দিকে কনকপুর ইউনিয়নের দূর্লভপুর গ্রামে একই অবস্থা। নিহত মাহির মা জুলেখা বেগম ও বাবা বিল্লাল মিয়া মৃত্যুশয্যায়। মা এই ঘটনার পর থেকে ছেলের শোকে মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। শোকের মাতম ছলছে গোটা পরিবারে। কৃষক পরিবারে ছেলে মাহিই ছিল তার পরিবারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার আশা। এমনটি জানান তার মামা গোলাম ইমরান আলী।
মামলার এজাহার ও পরিবার সুত্রে জানা যায় দলীয় গ্রুপিং দ্বন্ধের কারনেই এই হত্যা কান্ডের ঘটনা ঘটে। এই হত্যা কান্ডের অন্যতম হোতা ও পরিকল্পনা কারীছিল তারই বন্ধু ও একই গ্রুপেরই কর্মী আনিসুল ইসলাম তুষার। মূলত দল ও গ্রুপের মধ্যে নিজেদের আদিপত্য বিস্তার নিয়ে এই খুনের ঘটনা ঘটে। মৌলভীবাজার থানা পুলিশ সুত্রে জানা যায় রিমান্ডে থাকা তিন এজাহারভুক্ত আসামী রুবেল, কনক ও জামিল এইসময় উপস্থিত থাকলেও হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিলনা বলে জানায়। এই মামলায় এখন পর্যন্ত এই তিনজন ছাড়া আর কেউ গ্রেফতার হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে তারা আসামী ধরতে তৎপর রয়েছে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.