
শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি॥ বছরটিতে যেন ভালো ফসল হয়, সন্তান সন্ততি যেন ভালো থাকে, আর দেশ ও এলাকার মঙ্গল নিহিত হয়, এই কামনায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ফুলছড়ি গারো লাইন এলাকায় অনুষ্ঠিত হলো নৃতাত্বিক জনজাতিগোষ্টি ‘গারো’ সম্প্রদায়ে’র প্রধান ধর্মীয় উৎসব ওয়ানগালা। প্রতিবছর কার্ত্তিক মাসের শেষ দিকে নতুন ফসল উত্তোলন করে বিভিন্ন আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে তাদের প্রধান দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে তারা পালন করেন এ ওয়ানগালা উৎসব বা গারো সম্প্রদায়ের নবান্ন উৎসব। সময়ের আবর্তে এক সময়ের প্রকৃতি পূজারী গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা খ্রিষ্টান ধর্মে দিক্ষিত হলেও এ সম্প্রদায়ের লোকেরা ভুলেনি তাদের আদি পূজনীয় দেবতা মিসি সালজংকে। সারা বছর খ্রীষ্ট ধর্মীয় নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করলেও বিগত কয়েক বছর ধরে গারো সম্প্রদায়ের যুব সংগঠন শ্রীচুক গারো যুব সংঘ পালন করছে তাদের জাতিগত প্রধান ধর্মীয় উৎসব ওয়ানগালা।
এই দিন গারো তরুন তরুনীরা রঙ-বেরঙের পোশাক ও পাখির পালক মাথায় দিয়ে লম্বা ডিম্বাকৃতি ঢোলের তালে তালে নাচে। সারা গারো পাহাড় ঢোলের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। অন্যরকম এক আনন্দে মেতে উঠে গাঢ় অধিবাসীরা। তবে মিশি সালজংকে নতুন ফসল উৎসর্গের পাশাপাশি তারা আরাধ্য প্রভু যিশু খ্রিষ্টের কাছেও এ ফসলাদি উৎসর্গ করে। এই উৎসবে তারা দেবতা মিসি সালজংকে একটি বনমুরগ উৎসর্গ করে প্রধান পুরোহিত তার মাধ্যমে আগামী বছর কেমন কাটবে তা সবাইকে অবহিত করবেন। দেবতাকে নতুন ফসল উৎসর্গ করার পর তারা এক সাথে নতুন চালের ভাত আহার করেন।
গারো ধর্মযাযক মাধাং পাকির কামাল বলেন, গারো পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষ হতো এবং বছরে মাত্র একটি ফসল হতো। তখন ওই জুম বা ধান ঘরে উঠানোর সময় গারোদের শস্যদেবতা 'মিসি সালজং'কে উৎসর্গ করে এ উৎসবের আয়োজন করা এক সময় তারা তাদের শস্যদেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করলেও এখন তারা নতুন ফসল কেটে যিশু খ্রিস্টকেও উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করেন।
আয়োজক কমিটির সভাপতি পার্থ হাজং, সা-সাৎ-সাওয়া ধুপারিতের মধ্য দিয়ে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়। এরপর দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কুতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দুপুরে ওয়ানগালার মূল প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা এবং স্বাগত বক্তব্য পাঠ করা হয়। এছাড়া, এতে বিভিন্ন খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরা উপস্থিত ছিলেন। পরে ওয়ানগালার নাগড়া, আদুরী, দামা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন এবং সর্বশেষ গারোদের নিজস্ব কৃষ্টির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মূলত গারোরা ছিলো প্রকৃতিপূজারী কিন্তু কালের পরিক্রমায় গারোরা ধীরে ধীরে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রথাটি এখন ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একত্রে করে পালন করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য খ্রিস্টভক্ত এবং গারাগানজিং, কতচু, রুগা, মমিন, বাবিল, দোয়াল, মাতচি, মিগাম, চিবক, আচদং, সাংমা, মাতাবেং ও আরেং নামে ১২টি গোত্রের গারো সম্প্রদায়ের লোকজন উপস্থিত ছিলেন। এদিকে, ওয়ানগালা উৎসব উপলক্ষে বসেছে জমজমাট মেলা। মেলায় গারোদের ঐতিহ্যবাহী জিনিস ও শিশুদের নানা রকমের খেলনা বিক্রি করা হয়।
গারো সম্প্রদায়সহ সরকার এমন সবকয়টি নৃ-তাত্তিক জনগোষ্টীর ধর্মীয় উৎসবগুলোর ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসবে এমটাই চাওয়া উৎসব উপভোগ করতে আসা দর্শনার্থীদের।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.