
আশরাফ আলী/সাইফুল্লাহ হাসান॥ মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদী খনন না হওয়ায় ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে নদীর নাব্যতা। চলতি মাসের ১৯ ফেব্রুয়ারী টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হলেও এখনও শুরু হয়নি ড্রেজিংয়ের কাজ। যার কারণে ফুসে উঠেছেন স্থানীয়রা। মনুনদী খনন ও দখল মুক্ত করতে বুধবার দুপুরে নদীর চাঁদনীঘাট এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন করেন স্থানীয়রা।
ক্রমাগত বৃষ্টিতে বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীর পানি। দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নদী তীরবর্তী এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ। ইতি মধ্যে নদী গর্ভে বাড়ি-ঘর ও দোকান কোঠা বিলিন হয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন অনেক দরিদ্র পরিবার। সর্বশেষ কবে ওই মনুনদী খনন হয়েছিল তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলতে পারছেন না। তবে ধারণা করা হচ্ছে ১’শ বছরের মধ্যেও এটা খনন হয়নি।
জানা যায়, মনু নদী ড্রেজিং এর জন্য ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ২৩ কোটি টাকা ব্যায়ে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় কুশিয়ারা নদীর মুখ হতে মনু ব্যারেজ পর্যন্ত টেন্ডার হয়। ঢাকার বিডিএল নামিয় একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওই কাজটি পায় এবং চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত টেন্ডারের মেয়াদ ছিল। কিন্তু অজানা কারণে টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হলেও এপর্যন্ত কাজ শুরু হয়নি। কিন্তু এনিয়ে কোনে মাথা ব্যথা নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।
জানা যায়, স্থানে স্থানে চর, স্থাপনা নির্মাণ এবং নদী দখল করে পানি প্রবাহ বন্ধ করায় উজানে বাঁধ ভাঙ্গার প্রবণতা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে নদী তীরের মানুষ বাড়ি ঘর ছেড়ে অন্যত্রে বসবাসের চিন্তা করছেন। শহর তীরবর্তী মনু ব্যারেজ নির্মাণকালে ব্যারেজের গভীরতা কমানোর কারণে ক্রমাগত উপরের অংশ ভরাট হওয়ায় পানির ধারণ ক্ষমতাও কমে আসছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানা যায়, ভারত থেকে মনু নদীর উৎপত্তি। এর মধ্যে ভারতে ৫৮ মাইল ও মৌলভীবাজার দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ৫২ মাইল। নদী তীরবর্তী জনপদ রক্ষার জন্য ৮০ দশকে ১৪০ কিঃ মিঃ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ব্লকের কাজ করা হয়। সর্বশেষ গত ১৯৯৩ সালে পৌর শহরকে মনুনদীর ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষার জন্য সাইফুর রহমান রোডে প্রতিরক্ষা দেয়াল দেয়া হয়।
স্থানীয়রা জানান, ব্রিটিশ আমলের পর থেকে এ পর্যন্ত মনুনদী খনন হয়নি। খনন নিয়েও সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই। প্রতি বছর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দায়সাড়া কিছু মেরামত করেই যেন কর্তৃপক্ষের কাজ শেষ। এনিয়ে সুশীল সমাজের নাগরিকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বাপার জেলা সমন্ধয়ক আসম সালেহ সোহেল এর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন- আওয়ামীলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য মো. ফিরোজ, মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো: ফজলুর রহমান, মৌলভীবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি ডা: এম এ আহাদ, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি আবদুল হামিদ মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক সালেহ এলাহি কুটি, মৌলভীবাজার বিজনেস ফোরামের সভাপতি নুরুল ইসলাম কামরান, সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন, বিলাস ষ্টোরের স্বত্বাধীকারী সুমন আহমদ, সম্মিলিত সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি খালেদ চৌধূরী ও সাধারণ সম্পাদক আলিম উদ্দিন হালিম প্রমুখ। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা মানববন্ধনে অংশ নেন। মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার প্রায় সহ¯্রাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
এসময় বক্তারা বলেন- মৌলভীবাজারবাসী প্রতি বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আমরা এর অবসান চাই। গত বন্যায় শহরবাসী খুবই আতঙ্কে ছিল। কিন্তু মনু নদী খননের টেন্ডার পাশ হলেও কি কারণে এখন পর্যন্ত খনন কাজ হচ্ছে না আমারা জানতে চাই। অথচ খনন কাজের মেয়াদকাল শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। আমরা অনতিবিলম্বে মনু নদী খনন চাই। তা নাহলে কঠিন থেকে কঠিনতর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে।
এবিষয়ে জেলার একাধিক বয়স্ক নাগরিকরা বলেন, ১৯৪৮ সালে তৎকালীন মনুরমুখ নৌববন্দরের নাব্যতা হ্রাসের কারণে এবং সহজে জাহাজ চলাচলের সুবিধার জন্য কুশিয়ারা খনন করা হয়। কিন্তু মনু নদী খনন করা হয়নি। এর পরেও অদ্যবধি মনুনদী খননের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকল্প হাতে নেয়া হয়নি। তারা আরোও বলেন, মনুনদী’র ভাঙন থেকে মৌলভীবাজার জেলাকে রক্ষা করতে হলে খনন অতীব জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ.স.ম ছালেহ সুহেল বলেন, বন্যা থেকে রক্ষার জন্য মনুনদী খনন খুবই জরুরি। কিন্তু এর স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশ বসে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ও গবেষণা করতে হবে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.