
ইমাদ উদ দীন ॥ মৌলভীবাজারে চা বাগান গুলোতে চলছে নতুন মৌসুমের চা পাতা সংগ্রহ। কারন এবছর চা শিল্পের কাঙ্খিত ‘গোল্ডেন রেইন’ এর দেখা মিলেছে। মৌসুমের শুরুতে এমন অনুকূল আবহাওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন প্রত্যাশা। এখন এমন স্বপ্ন প্রত্যাশায় রেকর্ড উৎপাদন লক্ষ্য নিয়ে উৎফুল্ল এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। চা চাষের অন্যতম অঞ্চল মৌলভীবাজারে এ মৌসুমের চা পাতা চয়ন শুরু হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিক থেকে চলছে নতুন পাতা সংগ্রহের কাজ। আগাম বৃষ্টিপাতের কারনে এবছর জেলার ৯২ টি ছোট বড় চা বাগানে এখন কম বেশি সংগৃহিত হচ্ছে চায়ের নতুন কুঁড়ি। এবছর অনেকটা আগাম পাতা সংগ্রহ করতে পেরে নতুন রেকর্ড গড়ার স্বপ্ন প্রত্যাশায় উজ্জীবিত এশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন গেল ক’য়েক বছরের মধ্যে এবছর চা পাতা সংগ্রহের শুরুটা ভালো। আবহাওয়াও যথেষ্ট অনুকূলে। আর এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৬ সালের চা শিল্পের সেই ঐতিহাসিক রের্ডক অতিক্রম করার প্রত্যাশা বাগান মালিক,শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের। জেলার অধিকাংশই চা বাগান জুড়ে এখন কচি চা পাতায় সবুজ রঙের ছোঁয়া। অঙ্কুরিত চা পাতায় জানান দিচ্ছে এখানেই সুবুজের রাজ্য। আর নতুন কুড়িতে পরিচয় দিচ্ছে এই রাজ্য দু’টি পাতা একটি কুড়ির। বাগান গুলোতে সবুজ পত্রপল্লবের সমারোহ। ঝরা খরা শেষে এখন বাগান জুড়ে জেগে উঠেছে সবুজ সতেজ চা গাছ। জানা যায় কিছুদিন আগেই চা গাছের মাথা ছাঁটাই করা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রতি বছরই এভাবে চা গাছগুলোর মাথা নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী ছেঁটে ফেলা হয়। তারপর চলে অপেক্ষা। চা গাছে কখন নতুন কুঁড়ির দেখা মিলবে। গেল কয়েকদিন আগে বৃষ্টির কারনে জৌলুস ফিরে আসে চা বাগানগুলোর। আগাম বৃষ্টিতে কুঁড়ি ছাড়তে শুরু করে চা গাছ। আর এতেই আনন্দিত এশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা।
জেলার ক’য়েকটি চা বাগান ঘুরে দেখা গেল নতুন কঁড়ি সংগ্রহে ব্যস্ত চা শ্রমিকরা। চা শ্রমিক রাম ভর,সীতা রাণী গোয়ালা,সম্ভু পাচী,ইরেন নাইডু,সমিরন পাচী,নিতেশ রাম কৈরী সাথে আলাপে তারা হাস্যজ্জ্¦ল মুখে জানালে এবছর ফলন অনেক ভালো। বৃষ্টি হওয়াতে আগাম পাতা সংগ্রহ চলছে। তারা জানালেন মাস তিনেক আগে এই গাছগুলোর অগ্রভাগ ও ডালপালা ছাটানো হয়েছে। গেল কয়েক দিন আগের বৃষ্টিতে খরাতে থাকা চা গাছ প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আর এখন চা গাছগুলো নতুন কুঁড়ি ছাড়ছে। আর বড় হয়ে যাওয়া কুঁড়ি সংগ্রহ করছেন তারা। এবছর শুরুটা ভালো হওয়ায় তারা আনন্দিত। জানা যায় ডিসেম্বরে মৌসুম শেষে চা গাছ ছাটাই এর পর নিয়মানুযায়ী ২ মাস ফ্যাক্টরী বন্ধ থাকে। বৃষ্টির পর নতুন কুঁড়ি গজালে শুরু হয় পাতা চয়ন এবং উৎপাদন। এবার মৌসুমের শুরুতে ভাল বৃষ্টিপাতকে ‘গোল্ডেন রেইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বৃষ্টি চা গাছের জন্য ভাল সুফল বয়ে আনবে। বিশেষ করে ইয়াং টি এর জন্য খুব ভাল হবে এবং রেড স্পাইডারও কমে যাবে। জানা যায় চা উৎপাদনর ইতিহাসে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৫০ লাখ কেজি চা-উৎপাদিত হয়। কিন্তু তার পরের বছরেই উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮০ লাখ কেজিতে। তবে ২০১৮ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮ কোটি ২০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়। চা-বাগান পরিচর্যাকারী ও গবেষকরা জানিয়েছেন সঠিক সময়ে সার ও কীটনাশক ব্যবহার এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চা উৎপাদনে এই সফলতা এসেছিল। তাদের আশা এবছরও এই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার। তাছাড়া শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপিত হওয়া এবং নিলাম কার্যক্রম চলায় এজেলার বাগান মালিক,শ্রমিক ও উপকারভোগীরা এশিল্পের বিকাশ ও অগ্রযাত্রা নিয়ে আশান্বিত। মৌলভীবাজারের হামিদিয়া চা বাগানের জেনারেল ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম জানান মৌসুম শুরুতে এ বছর আমাদেরকে আশার আলো জাগাচ্ছে। এবছর মৌসুম শুরুর প্রথম দিকের উৎপাদন আমাদেরকে ২০১৬ সালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন বৃষ্টি, রোদ ও আবহাওয়া চা উৎপাদনের অনুকূলে থাকলে কাঙ্খিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। সিলেট বিভাগ চা সংসদের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন মৌসুমের শুরুর অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে এবছর চা উৎপাদনের বছর। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কাঙ্খিত উৎপাদন সম্ভব। চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়া চা-বাগানে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয়। দেশ স্বাধীনের সময় দেশে চা-বাগানের সংখ্যা ছিল ১৫০টি। তখন ৩ কোটি কেজির মত উৎপাদন হত। বর্তমানে চা-বাগানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৬ টিতে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারেই রয়েছে ৯২টি চা বাগান। বাকিগুলোর মধ্যে হবিগঞ্জে ২৪টি, সিলেটে ১৯টি, চট্রগ্রামে ২২টি, পঞ্চগড়ে ৭টি, রাঙামাটিতে ২টি ও ঠাকুরগাঁওয়ে ১টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে মোট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪৩৯ একর।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.