
স্টাফ রিপোর্টার॥ ঈষাণ কোনে কালো মেঘ জমলেই এখন হাওর পাড়ের কৃষকের মনে সৃষ্টি হয় চরম উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও আতঙ্ক। এই বুঝি ভারী বর্ষণে তলিয়ে যাবে পূরো বছরের তাদের জীবন জীবীকার একমাত্র ভরসার ফসল বোরো ধান।
প্রতি বছরই কম বেশী দূর্যোগ লেগেই থাকে রোরো ধান চাষে। ধান পরিপক্ষ হওয়ার আগেই বজ্রপাত,বৃষ্টি ও শীলাবৃষ্টিতে আগাম বন্যার মহাহুমকিতে পড়েছেন হাওর পাড়ের বোরো চাষীরা। এনিয়ে চরম উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও দু:শ্চিন্তায় রয়েছেন হাওর পারের চাষীরা। চলতি বোরো মৌসুমে নানা প্রতিকূলতার পরও ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে প্রতি বছর ধানের মূল্য কম পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্বেগ, উৎকন্ঠার পরও মাঠে বাম্পার ফলন দেখে কৃষকের মনে উৎকন্ঠার ভেতর হাঁসির ঝলক মারছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কষ্ঠ ও ক্ষোভ হাওর ও নদী বেষ্টিত এজেলায় দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি থাকার পরও জেলার একটি হাওরও এখনো অর্ন্তভূক্ত হতে পারেনি হাওর উন্নয়ন বোর্ডের। এ জেলার হাওর ও নদী থেকে সরকার প্রচুর রাজস্ব পেলেও তার উন্নয়নে চরম উদাসীন। নাব্যহ্রাস হওয়া নদী ও হাওর শুষ্ক মৌসুমে পানিহীনতায় যেমন ধূ ধূ মরুভূমি। তেমনি বর্ষা মৌসুমে পানির ধারণক্ষমতা না থাকায় বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
জেলার সবক’টি হাওর ও নদী তীরে এখন দোল খাচ্ছে আধপাকা বোরো ধান। চোখ যতদূর যায় দিগন্ত জুড়ে শুধু সোনালী ধানের মাঠ। সবুজ ধানের দোলনীতে কৃষকের মনে আনন্দ বাড়ে। ধানের মাঠের এমন দৃশ্যে হাওর পাড়ের কৃষকরা নব উদ্যমে স্বপ্ন বুনছেন। আর কিছু দিন গেলেই ধুম পড়বে ধান কাটার। তখন রাত দিন ব্যস্ত সময় পার করবেন কৃষাণ কৃষাণীরা। প্রত্যাশার বোরো ধান গোলায় তোলতে পারলেই তাদের সব কষ্ঠই স্বার্থক।
এ জেলায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি। এর অবস্থান মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে। হাকালুকি হাওর ছাড়াও এ জেলায় রয়েছে মনু প্রকল্পের অধিন কাউয়াদিঘি হাওর, হাইলহাওর, বড়হাওর, করাইয়ার হাওর, কেওলার হাওর। সবক’টি ছোট বড় হাওরের এখন বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন হাওর পাড়ের কৃষক। তাদের সে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণ হবে কিনা এমন দু:শ্চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছেন। আগাম বন্যা শিলাবৃষ্টি আর বজ্রপাতে মাঠের ধান মাড়াই ঝাড়াই শেষে গোলায় তোলতে পারবেন কি না এ নিয়ে শঙ্কিত তারা। আকাশে বৃষ্টির আভাস দেখলেই এমন দু:শ্চিন্তায় বেড়ে যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, জেলায় এবছর ৭ উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩ হাজার ১’শ ১৬ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদ অর্জিত হয়েছে ৫৩ হাজার ১’শ ৬২ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ হেক্টর ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে সদর উপজেলায় ১০ হাজার ২’শ ৩০, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৯ হাজার ৩’শ ৩০, রাজনগর উপজেলায় ১২ হাজার ৬’শ ৯৩, কমলগঞ্জ উপজেলায় ৪ হাজার ১’শ ৩, কুলাউড়া উপজেলায় ৬ হাজার ৮’শ, বড়লেখা উপজেলায় ৪ হাজার ৪’শ ৪০ ও জুড়ী উপজেলায় ৫ হাজার ৪’শ ৯০ হেক্টর ধান আবাদ হয়েছে।
এদিকে গত বোরো মৌসুমে জেলায় বোরো ধানের লক্ষমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৪শ’ ৭১ হেক্টর এবং অর্জিত হয়েছিল ৫৪ হাজার ১২ হেক্টর। সময় মতো সার, বীজ ও ঔষধ কৃষকদের কাছে সরবরাহ করায় এবার ভালো ফলাফল হয়েছে। আগামীতে আরোও ভালো ধান উৎপাদন করতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
কৃষকরা জানান আবাদকৃত জমিতে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বোরো চাষের প্রথম দিকে ব্রি-২৮, ২৯ ও গাজি ধানে ছত্রাকের আক্রমণে ধান লাল হয়ে পচে যেতে থাকে। এমন সব রোগবালাই রোধ হয়ে এখন বাম্পার ফলনের উঁকি দিচ্ছে হাওর অঞ্চলের জীবন জীবীকার একমাত্র ফসল স্বপ্নের বোরো ধান।
জানা গেল কয়েকদিনের আগাম বৃষ্টিপাতে হাওরের সাথে সংযুক্ত নদী, খাল ও গাঙ্গ গুলোতেও বাড়ছে পানি। ভারী বর্ষণ ও শিলাবৃষ্টি হলে থোড়ওয়ালা ও আধপাকা বোরো ধানেরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
হাকালুকি হাওর পাড়ের ভূকশিমইল ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল খালিক, মজনু মিয়া, লেচু মিয়া ও মানিক মিয়া সহ অনেকেই জানান আর অল্প ক’দিনের মধ্যেই ধুম পড়বে বোরো ধান কাটার। মার্চ মাসের শেষ দিকে থেকে শুরু হওয়া শিলাবৃষ্টি ও ঝড় এখনও ধানের ক্ষতি হয়নি। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে বোরোধান গোলায় তোলা দুষ্কর হবে। যে পরিমান বৃষ্টি হয়েছে তাতে ধানের খুব একটা ক্ষতি হয়নি। বৃষ্টি যদি থেমে যায় এবং ১৫ দিন সময় মিলে তাহলে বোরো ধান নিয়ে কৃষকদের আর দুশ্চিন্তা থাকবে না। ২৮,২৯ ও গাজি ধানের ছড়ায় পচন রোগের প্রার্দূভাবের পরও ফলন ভালোর আশা করলেও বৃষ্টি বন্যা বজ্রপাত মোকাবেলা করে তা গোলা পর্যন্ত তোলা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
হাওর এলাকার ভূকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান নাব্যহ্রাস হওয়ার কারনে হাওরের জৌলুস দিন দিন কমছে। তাই শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি আর বর্ষা মৌসুমে বন্যা। দু’মৌসুমেই কৃষকরা হাওরের এমন বেহাল অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। হাওরের সাথে সংযুক্ত ফানাই নদী সম্প্রতি খনন কাজ শুরু হয়েছে। হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় ভরাট হওয়া বিলগুলো দ্রুত খননের প্রয়োজন।
মনু প্রকল্পের আওতাধিন কাউয়াদিঘি হাওর এলাকার কৃষক কালাম মিয়া, জামাল আলী ও নরেন্দ্র দেব জানান, প্রকল্পের বেরীবাঁধের ভেতর তাদের জমি থাকায় একটু দেরিতে ধান রোপন করেন জমিতে। ধানের ফলন ভাল হয়েছে। প্রকল্পে নতুন করে পাম্পসেট স্থাপন করা হয়েছে। পাম্পগুলো চালু রেখে পানি নিষ্কাসন করা হলে বোরো ফসল ঘরে তোলতে ব্যাঘাত হবে না।
এ বিষয়ে হাওর বাঁচাও, কৃষক বাঁচাও ও কৃষি বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সিরাজ উদ্দিন আহমদ বাদশাহ বলেন, ধান উৎপাদন করতে যা খরচ হয়েছে তার চেয়ে বর্তমান বাজার মূল্য অনেক কম। এভাবে লোকসান দিয়ে কৃষকরা বেশি দিন টিকে থাকতে পারবেনা। কৃষি প্রধান এই দেশের কৃষিকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে দেশের কৃষিকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যতায় দেশে পরিবর্তন আনা সম্ভব নহে।
একটি সূত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে নয় লাখ মেট্রিক টন চাল এবং দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২৬ টাকা দরে ধান এবং ৩৮ টাকা দরে চাল সংগ্রহ করা হয়। এ আলোকে ২০১৮ সালের ২ মে থেকে শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ধান সংগ্রহ অভিযান চলে। তখন প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে ২৪ টাকা ও চাল উৎপাদনে ৩৬ টাকা খরচ হয়েছিল। কয়েকজন কৃষক জানান সরকারি ভাবে প্রতি মণ ধানের মূল্য ১০৪০ টাকা হলেও কৃষকরা ৬’শ থেকে ৭’শ টাকার উপরে বোরো ধান বিক্রি করতে পারেননি। যার ফলে ওই ধান বিক্রির টাকা দিয়ে গত মৌসুমে তাদের উৎপাদন খরচই উঠেনি। বড় অংকের লোকসান গুনতে হয়েছে কৃষকদের। তবে একটি সিন্ডিকেট কমমূল্যে ধান কিনে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে।
এ বিষয়ে জেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অফিসার মনোজ কান্তি দাস চৌধুরী বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের বাহিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আলোকে গত বছর মিল থেকে চাল কিনা হয়েছে। এতে কোনো সিন্ডিকেট করা হয়নি।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.