
মু. ইমাদ উদ দীন॥ আগুনে পোড়া বাসা আর দোকান। চোখের জলে তা প্রত্যক্ষ করছেন নিহতদের স্বজনরা। সম্পদ ও স্বজন সব হারিয়ে এখন তারা নি:স্ব। ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা। পোড়া বাসা আর দোকানে ভীড় জমিয়েছিলেন নিহতদের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী আর দু’টি তদন্ত টিমের সদস্যরা। সুভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা তদন্ত দলের কাছে ওই দিনের ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিচ্ছেন। আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। অগ্নিকান্ডের নেপথ্যের ঘটনা জানতে তদন্ত কমিটির সদস্যরা আগুনে পোড়া দোকান ও বাসার বিভিন্ন জিনিস খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছেন আর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নানা তথ্য জানার চেষ্ঠা করছেন।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত ৭ সদস্যের তদন্ত দল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছিয়ে নানা তথ্য উপাথ্য সংগ্রহ করেন। এই দূর্ঘটনার রাজস্বাক্ষী পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যরা তদন্ত দলকে সহযোগিতা করছেন। নিহত সুভাষ রায়ের ভাতিজা সঞ্জয় রায় (২৩) জানান ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকেই চাচাত বোন শিক্ষক প্রিয়াংকা রায়ের বিয়ে উপলক্ষে বাসা আত্মীয় স্বজন ছিলেন। ওই দিন বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে অনেকেই রাত করে ঘুমান। তিনিসহ তার ৪ জন আত্মীয়সহ পাশের বাসার দোতলায় ঘুমান। হঠাৎ আগুনের তাপ আর চিৎকার শোনে দৌঁড়ে বাহিরে আসেন। তিনি বলেন চোখের সামনেই নিমিষেই সবই ছাই হয়ে যায়। ওই দিন ২য় তলায় ৯ জন থাকলেও ৫ জন আগুনে পোড়ে মারা যান। আর ৪ জন কোনো রকম প্রাণে বাঁচেন। সঞ্জয় বলেন আমাদের একান্নবতী পরিবারে ১৪-১৫ জন এই বাসাতে বসবাস করতাম। এই দোকানী ছিল আমাদের জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। হঠাৎ সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব।
এসময় পাশে দাঁড়ানো তার চাচাত বোন নিহত সুভাষ রায়ের মেয়ে স্কুল শিক্ষক প্রিয়াংকা রায়, ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সৌম রায় ও পাপিয়া রায় কথাগুলো সায় দিয়ে চোখের জল ফেলছিলেন। ওই দিন ওরা প্রিয়াংকা রায়ের জামাই বাড়িতে থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত তদন্ত দলের প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজেষ্ট্রেট তানিয়া সুলতানা জানান তদন্ত কাজ চলছে। আমরা পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিচ্ছি ও সবকিছু খতিয়ে দেখছি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারব বলে আশা রাখছি। এদিকে ৩ দিন অতিবাহিত হলেও ভয়াবহ এই অগ্নিকান্ডের মর্মান্তিক ঘটনাটি এখন সবার মুখে মুখে। ঘটনার দিনের করুণ দৃশ্য নিয়ে আলোচনা সবার। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ওই পরিবারের চরম দূর্দিনে তাদের কল্যাণে যারা এগিয়ে এসেছিলেন জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করেছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন নিহতদের স্বজনরা। ইতিমধ্যে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ওই দুঃসময়ে সহযোগিতাকারী এক সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক ও স্কুল শিক্ষার্থী। আগুন নেভাতে ও উদ্ধার কাজে তাদের উদার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। সে দিন মৌলভীবাজার শহরের এম সাইফুর রহমান রোডের পিংকি সুস্টোরের সে আগুন নেভাতে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট। তাদের সঙ্গে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবীরাও। এর বাইরে অনেকেই ফেসবুকে লাইভে ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক সে সময়ে নিজের সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি দূরে রেখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে আগুন নেভাতে যোগ দেন মখলিছুর রহমান। আর নিজ সহপাঠীদের নিয়ে উদ্ধার কাজে তৎপর ছিলেন মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মোঃ হাসান মাহদী। মাহদী বিএনসিসির একজন সদস্য। এতটুকুন বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন বাঁচাতে আন্তরিকতার সাথে দ্রুত কাজ করা দেখে উপস্থিত অনেকেই তাকে অভিনন্দন জানান। মাহদী এক প্রতিক্রিয়ায় জানায় ঘটনার খবর পেয়ে ওখানে ছুটে যাই। ওদের রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্ঠা করি। কিন্তু ওদের বাচাঁতে পারিনি এটাই দুঃখ। সে বলে যারা সামনে বসে অযতা ভীড় করেছিল কিংবা মুঠোফোনে তা ধারন করেছিল তারাও যদি উদ্ধার কাজে লাগত তাহলে হয়ত ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কম হত। তারমত একই ভাবে নিবেদীত হয়ে উদ্ধার কাজ চালান কমলগঞ্জের কালেঙ্গা এলাকার মোহাম্মদ মখলিছুর রহমান মখলিস। তিনি শহরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। ঘটনার সময় তিনি কয়েকজন যাত্রী নিয়ে শহরের ভেতর দিয়ে কুলাউড়ায় যাওয়ার জন্য রওনা দেন। কুসুমবাগ পয়েন্টে আসার পর মখলিসের গাড়ি আটকে দেয় ট্রাফিক পুলিশ। ওই সময় পুলিশ সদস্যরা তাকে জানান এম সাইফুর রহমান রোডের একটি দোকানে আগুন লেগেছে তাই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই কথা শোনে যাত্রী নামিয়ে অরক্ষিত অবস্থায় অটোরিকশা রেখে মখলিস দৌঁড়ে ছুটে যান আগুন লাগার স্থানে। যোগ দেন আগুন নেভানোর কাজে। মখলিছ তার প্রতিক্রিয়ায় জানান তিনি দৌঁড়ে গিয়ে দেখেন ভয়াবহ আগুন জ্বলছে। সেখানে গিয়ে দেখেন শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে ভিডিও করছে কিন্তু তারা এগিয়ে আসছে না। তিনি বলেন আগুনের ভয়াবহতা দেখে নেমে পড়েন নেভানোর কাজে। পাশের বিল্ডিং থেকে টিন কেটে ভেতরে পানি ঢোকাতে ফায়ার সার্ভিসকে সাহায্য করেন। এরই মধ্যে বালু চলে এলে বালু দিয়ে গ্যাসের রাইজার থেকে আগুনের উৎস বন্ধ করতে বালু দেন। মখলিছ বলেন ফায়ার সার্ভিসের প্রথম দলের সাথে পাইপ নিয়ে ভেতর পর্যন্ত যান। পানির পাইপ টানতে টানতে কীভাবে চলে গেছে ২ ঘণ্টা তা টেরই পাননি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা বলেন নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে একজন সিএনজি চালক তার গাড়ি ফেলে রেখে যেভাবে আগুন নেভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেছেন, তা খুব কম দেখা যায়। গতকালের ঘটনার সময় অনেকেই ব্যস্ত ছিলেন মোবাইলে ছবি ও ভিডিও ধারণ নিয়ে। পুলিশকে বারবার অতি উৎসাহী মানুষ সরানোর কাজ করতে হয়েছে। তারা ক্ষোভের সাথে জানান কোনো কিছু ঘটলেই ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে ছবি তোলা এবং ফেইসবুকে লাইভ করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০ টার দিকে মৌলভীবাজার শহরের এম সাইফুর রহমান রোডের পিংকি সু-স্টোরে ভয়াবহ আগুনে পোড়ে ৫ জন নিহত হন।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.