
চৌধুরী ভাস্কর হোম॥ কখনও কখনও মানবতা ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায়। এড়িয়ে যাওয়া যায়না মানবিক দায়বদ্ধতা। তাই সেই দায়বোধ থেকে উদাহরণ হয়ে যান কেউ কেউ। এমনি এক মানবিক করোনাযোদ্ধা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল র্যাব-৯ ক্যাম্পের কামান্ডার সহকারী সিনিয়র পুলিশ সুপার মোঃ আনোয়ার হোসেন শামীম। নানা ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত শ্রীমঙ্গল র্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি মো. আনোয়ার হোসেন শামীমের নেতৃত্বে র্যাবের একটি দল এবার সামাজিক দূরুত্ব নিশ্চিতে লাখো মানুষের জমায়েত থামিয়ে দিয়েছেন। আর এই ঘটনাটি ঘটেছে মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার ঢেউপাশা এলাকায়।
করোনা প্রকোপে যখন স্থবির চারপাশ তখন প্রসূতি নারীকে কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াসহ বেতনের টাকায় নিজ মাথায় চালের বস্তা নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন কর্মহীন, অসহায় নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে। সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখতে নিজ হাতে সম্পন্ন করছেন দাফনের কাজও।
জানা যায়, শ্রীমঙ্গলস্থ বৃহৎ বরুণা মাদরাসার মোহাদ্দেস মাওলানা আবদুল মুমিত (৭২) গত মঙ্গলবার দুপুরে নিজ বাড়িতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন। পরে তাকে সিলেটের মাউন্ট অ্যাডোরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎক মৃত ঘোষণা করেন। ওইদিন রাতে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বুধবার ২৯ এপ্রিল ভোরে তার দাফন করা হয়। যেহেতু তিনি একজন প্রখ্যাত আলেম, তার অনেক ভক্ত, শুভাকাংকি, ছাত্র রয়েছে এবং এ মাদ্ররাসায় পূর্বের তফসির বা হুজুরদের জানাজার নামাজে লাখো মানুষের জমায়েতের ইতিহাস রয়েছে। তাই আব্দুল মুমিতের মৃত্যুর পর তার জানাজাকে ঘিরে লাখো মানুষের জমায়েত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
রাতেই ঘটনা শুনে মরহুমের বাড়ি ঢেউপাশা গ্রামে র্যাব ফোর্স নিয়ে রওনা দেন আনোয়ার হোসেন শামীম। সারারাত অবস্থান করে স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ, মরহুমের পরিবারের সদস্য, পুলিশ, প্রশাসন ও র্যাব সবার সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে ভোরেই জানাজার ব্যবস্থা করা হয়। ভোর ৪টা ১০ মিনিটে সামাজিক দূরুত্ব বজায় রেখে ধর্মীয় মর্যাদায় জানাজার নামাজ আদায় হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজার অংশ নেন সীমিত সংখ্যক মানুষ।
বরুণা মাদ্ররাসার শিক্ষক ওলিউর রহমান জানান, তিনি শিক্ষকতা করেন। এক যুগ ছিলেন বরুণা মাদ্ররাসায়। তিনি ছাত্রদের পাশাপাশি হুজুরদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে লাখ লাখ মানুষ তার জানাজায় অংশ নিত। র্যাবের ভূমিকায় এবং আমাদের সচেতনতায় মানুষ ভিড় করতে পারেনি।
র্যাবের এএসপি আনোয়ার হোসেন শামীম বলেন, প্রচুর সমালোচিত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ঘটনা। একই ঘটনা এখানে ঘটতে পারতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরুত্ব নিশ্চিত করতে তাই দিনের আগেই কীভাবে জানাজা শেষ করা যায় তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ এ হুজুরের যে পরিচিত বা ভক্ত রয়েছেন তাতে দিন হলেই লাখো মানুষের সমাগম ঘটতো। যেহেতু এখানে আবেগের একটা বিষয় ছিল তাই কৌশলী হতে হয়েছে। সারারাত সবাইকে বুঝিয়ে রাজি করাতে আমরা সক্ষম হই এবং ভোরে জানাজার নামাজ হয় সামাজিক দূরুত্ব মেনে এবং কোনো জমায়েত ছাড়াই। তিনি আরো বলেন, জানাজা শেষে দাফন নিশ্চিত করে ফিরতে গিয়ে সেহেরিও খাওয়া হয়নি। কারণ আমরা ফিরলেই মানুষের জমায়েত হতে পারতো।
প্রসবকালীন জটিলতায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার শহরতলীর দক্ষিণ উত্তরসুর গ্রামের গৃহবধূ শিল্পী রানী পাল। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া দরকার। কিন্তু লকডাউনের এই রাতে রাস্তায় কোনো যানবাহন পাওয়া যাচ্ছিলো না। এলাকায় পরিচিত যে সিএনজি অটোরিক্স চালকরা ছিলেন, হাসপাতালে যাওয়ার কথা শুনে সাথে সাথে না করে দিয়েছেন তারা।
এমন সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক র্যাবের গাড়ি নিয়ে সেখানে ছুটে গেলেন পুলিশের এএসপি আনোয়ার হোসেন নিজেই। শুধু তাই নয়, হাঁটতে অপারগ হওয়ায় তিনি ওই প্রসূতি নারীকে কোলে করে গাড়িতে ওঠান এবং হাসপাতালে পৌঁছার পর কোলে করেই নিচ তলা থেকে দু-তলায় অবস্থিত প্রসূতি ওয়ার্ডে নিয়ে যান। তখন প্রসূতির রক্তক্ষরনে ভিজে যায় তার গায়ের ইউনির্ফম।
এছাড়া যেখানেই খবর পাচ্ছেন, সেখানেই ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য নিজ মাথায় চালের বস্তা ও খাবার নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন র্যাব-৯ সহকারী সিনিয়র পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন ও তার দল। নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন খাদ্য সহায়তা। এমন নানা ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত একজন মানুষের স্থান তৈরী করেছেন তিনি। আর মৌলভীবাজার বাসীর কাছে মো. আনোয়ার হোসেন শামীম এখন মানবিক করোনাযোদ্ধা।
প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সৃষ্টির পর শ্রীমঙ্গল র্যাব-৯ ক্যাম্পের কামান্ডার সহকারী সিনিয়র পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন শামীম তার মানবিক কাজের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছেন। তিনি ৩৪তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। তার গ্রামের বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন উত্তর বড়বিল গ্রামে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.