কুলাউড়ায় রাতের আধারে অবাধে কাটা হচ্ছে টিলা : মাটি দিয়ে কবরস্থান ভরাট করে মার্কেট নির্মাণ করার অভিযোগ

January 30, 2022,

মাহফুজ শাকিল॥  কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরায় গত কয়েক মাস ধরে পাহাড়ি টিলার মাটি কেটে সাবাড় করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ওই চক্র ভাটেরা ইউনিয়নের ইসলামনগর এলাকার কয়েকটি টিলা থেকে পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পিকআপভ্যান ও ট্রলি বোঝাই করে মাটি বিক্রি করছেন অন্যত্র। এসব মাটি স্থানীয় বিত্তশালীদের নির্মাণাধীন বিলাসবহুল বাড়িসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বসত বাড়ির ভিটাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় মাটি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে। অবৈধভাবে মাটি কাটায় টিলার পাদদেশে থাকা বসতঘরের বাসিন্দারা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছেন। টিলা ধসে যেকোন সময় প্রাণহানিসহ ঘটতে পারে বড় ধরণের দুর্ঘটনা। এদিকে টিলার মাটি দিয়ে নিজের চাচা ও দাদীর কবরস্থান ভরাট করে দোকান মার্কেট নির্মাণ করছেন কামাল ইবনে শহীদ চৌধুরী নামে এক প্রবাসী ব্যক্তি বলে খবর পাওয়া গেছে। তিনি ভাটেরা ইউনিয়নের স্টেশন বাজার (মাইজগাঁও) এলাকার বাসিন্দা মৃত আব্দুস শহীদ চৌধুরীর ছেলে।

সরেজমিন শনিবার বিকেলে ভাটেরার পাহাড় অধ্যুষিত ইসলামনগর এলাকায় গিয়ে স্থানীয় এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওই এলাকায় সরকারি ও ব্যাক্তি মালিকানাধীন ছোট বড় প্রায় অর্ধশত পাহাড়ি টিলা রয়েছে। এসব টিলার উপরে ও পাদদেশে কয়েক হাজার মানুষের জনবসতি রয়েছে। প্রভাব খাটিয়ে অনেক ব্যক্তি পরিবেশ আইন লংঘন করে টিলা কাটছেন। গত কয়েক সপ্তাহ থেকে ইউনিয়নের বাসিন্দা রহিম উদ্দিন, বাবলু মিয়া, আজাদুর রহমান, গাড়ি চালক নূর উদ্দিনসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র ইসলামনগর গ্রামে ইদন মিয়ার টিলা, নুরাই মিয়ার টিলা, কুতুব মিয়ার টিলা ও সিংহনাদের প্রবাসী মোস্তফা মিয়ার টিলাসহ বিভিন্ন টিলার মাটি কাটছেন। আর এসব মাটি পিকআপভ্যান বোঝাই করে দেয়া হচ্ছে স্থানীয় বিভিন্ন ধর্নাঢ্য ব্যক্তির বসতবাড়ি ও মার্কেটের ভিটে ভরাটের জন্য। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসলামনগরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের মালিকানাধীন টিলা থেকে বাবলু ও আজাদ নামে দু’জন ব্যক্তি কিছু মাটি কাটেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন নজরদারী না থাকায় এই চক্রটি বেপরোয়া হয়ে ওঠছে। এক মাস ধরে কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা ইদন মিয়ার মালিকানাধীন ইসলামনগরে প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার টিলা থেকে দিন ও রাতের আঁধারে টিলার মাটি কাটছে ওই চক্রটি। বিনিময়ে ইদন মিয়াকে গাড়ি প্রতি ৩০-৫০ টাকা দিচ্ছে গাড়ির মালিকরা। ওই টিলার পাদদেশে ২০০ মিটার এলাকার মধ্যে দশটি পরিবারের বসতি রয়েছে। অবাধে মাটি কাটায় টিলা ধসে ঘরের ওপর আছড়ে পড়তে পারে এমন আতঙ্কে রয়েছেন ওইসব পরিবারের লোকজন।

সরেজমিনে আরো দেখা যায়, ভাটেরা ইউনিয়নের স্টেশন বাজার (মাইজগাঁও) এলাকায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী কামাল ইবনে শহীদ চৌধুরী বিভিন্ন টিলা থেকে মাটি এনে তাঁর আলিশান বাড়ির উত্তরপার্শ্বে একটি মার্কেটের ভিটে ভরাট করছেন। যেখানে ছিল তাঁর দাদী সোনাবান বিবি চৌধুরী ও চাচা ছনই সরদারের কবরস্থান। প্রায় ২৫ বছরপূর্বে তারা মারা যান বলে জানা গেছে। কবরস্থান ভরাট করে মার্কেট নির্মাণ করায় স্থানীয় মানুষের মাঝে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। এছাড়া কামাল চৌধুরীর চাচাতো ভাই হোসেন চৌধুরীর বসত বাড়ির সম্মুখের উঠোনে টিলা মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। প্রবাসী কামাল ইবনে শহীদ চৌধুরী কবরস্থান ভরাট করার বিষয়টি স্বীকার করে ভভবলেন, যেখানে কবরস্থান ছিল সেটির পাশে স্থানীয় লোকজন প্রস্রাব ও মলমূত্র ত্যাগ করতো। জায়গাটিতে জমির মাটি সহ কয়েকগাড়ি টিলা মাটি এনে ভরাট করে আমি দোকান মার্কেট করছি। ৬-৭ জন ব্যক্তি আমার মার্কেটে বিভিন্ন জায়গা থেকে মাটি এনে দিচ্ছেন। কবরস্থান ভরাটের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় দুইজন ইমামসহ জামায়াত করেন মাওলানা হিফজুর রহমানের মতামত নিয়ে আমার চাচা ও দাদীর কবর দুটি অন্য জায়গায় স্থানান্তর করেছি। তাছাড়া ইসলামে নিয়ম রয়েছে ১২ বছর হলে কবরস্থান অন্যত্র স্থানান্তর করা যায়।

টিলার পাদদেশে থাকা বসতবাাড়ির মালিক মামুন মিয়া বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মাটি বোঝাই করে টিলা থেকে একটি পিকআপভ্যান নামার সময় আমার ভিটার পাশে থাকা গাছের ওপড় আছড়ে পড়ে। গাছ থাকায় আমার ঘর রক্ষা পায়। নয়তো ঘর ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটতো। ভয়ে আছি কখন জানি টিলা ধসে আমার ঘরে আছড়ে পড়ে।

টিলার পাদদেশে থাকা আরেকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক মাস ধরে আজির উদ্দিন, রহিম উদ্দিন, নূর উদ্দিন, বাবলু মিয়া ও আজাদুর রহমানরা ইদনের টিলা দখল করে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা সাধারণ মানুষ টিলা কাটায় পাহাড় ধ্বসের আতঙ্কে আছি।

গাড়ির মালিক রহিম উদ্দিন বলেন, কামাল চৌধুরীর বাড়িতে আমি জমির মাটি কেটে পরিবহন করে দিচ্ছি, টিলার কোন মাটি কাটিনি বা পরিবহন করিনি।

গাড়ির মালিক বাবলু মিয়া টিলা কাটার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ইসলামনগরে চেয়ারম্যানের টিলা থেকে মাটি কাটিনি, তবে ইদন মিয়ার টিলা থেকে মাটি কেটে আমরা কামাল চৌধুরীর বাড়িতে দিয়েছি। মাটি পরিবহন করলে আমরা ৩০০-৪০০ টাকা ভাড়া পাই।

গাড়ি চালক নূর উদ্দিন টিলার মাটি কাটার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি টিলার মাটি কারো বাড়িতে দেইনি।

টিলার মালিক কৃষ্ণপুরের বাসিন্দা ইদন মিয়া বলেন, ইসলামনগরে অবস্থিত ৬ একরের টিলাটি আমাদের ৪ ভাইয়ের। টিলায় আমরা বিভিন্ন গাছ লাগিয়ে বাগান করেছি। টিলাটি নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী আজির উদ্দিনের সাথে মামলা রয়েছে। টিলার মাটি আজির উদ্দিনসহ একটি চক্র বিক্রি করছেন। আমি প্রতিবাদ করেও কোন সূরাহা পাচ্ছিনা। আমি কখনো টিলার মাটি কারো কাছে বিক্রি করিনি।

ইসলামনগরের বাসিন্দা আজির উদ্দিন বলেন, টিলার মাটি কাটার সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। কে বা কাহারা টিলা কাটছে সেটা আমি জানিনা। আর টিলা নিয়ে ইদন মিয়া যে মামলার অভিযোগ করছেন সেটি ১৫ বছর পূর্বে সমাধান হয়ে গেছে। ওই টিলার পাশের টিলাটি আমার ছিল সেটিও আমি ৫ বছর আগে বিক্রি করে দিয়েছি। তাছাড়া আমি ১০দিন থেকে বিয়ানীবাজারে আছি। যারা মাটি কাটার সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

ভাটেরা ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলাম বলেন, আমার টিলাটির সম্মুখ অংশ বাঁশের বেড়া দিয়ে রেখেছিলাম, কিন্তু একটি চক্র রাতের আধারে সেটি ভেঙ্গে টিলা থেকে কিছু মাটি নিয়েছে। বিষয়টি আমি প্রশাসনকে জানিয়েছি। তাছাড়া ভবিষ্যতে যাতে আর কোন টিলা কাটা না হয় সেজন্য আমাদের নজরদারি থাকবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা গণমাধ্যমকে জানান, টিলা কাটার বিষয়টি জেনেছি। সরেজমিন ওই এলাকায় পরিদর্শনে যাবো। অবাধে টিলা কাটার বিষয়ে আপনাদের কোন নজরদারি আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা খবর পাইলে আমরা যাই, খবর না পাইলে যাইমু কেমনে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, টিলা কাটায় ধারাবাহিকভাবে অভিযান অব্যাহত আছে। ইসলামনগরে টিলা কাটার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান বলেন, বিষয়টি নিয়ে জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন। তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com