পৃথিবীতে সুন্দর ও বসবাসযোগ্য সবুজ নগরায়ন গড়তে নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক হটিকালচারাল এক্সিবিউশন

July 14, 2022,

বিকুল চক্রবর্তী, নেদারল্যান্ড থেকে ফিরে॥ বিশে^র আরবান এলাকাগুলোকে সবুজায়ন করতে নেদারল্যান্ডের আলমেরিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ছয় মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক হটিকালচারাল এক্সিবিউশন। যেখানে ৬০ একর জায়গা জুড়ে অংশ নিয়েছে পৃথিবীর ৩০টিরও বেশি দেশ। এর মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে সাজানো বাংলাদেশ প্যাভেলিয়ন দৃষ্টি কারছে দর্শনার্থীদের।
ফ্লোরিয়েড আলমেরি ২০২২ বি.ভি (Floriade Almere 2022 B.V.) আন্তর্জাতিক এ উদ্যান প্রদর্শনী ফ্লোরিয়েড এক্সপো ২০২২-এর আয়োজন করে এবং যার সাথে সম্পৃক্ত আছেন নেদারল্যান্ডের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সহ-সংগঠক, অংশীদার, অংশগ্রহণকারী এবং স্টেকহোল্ডার। এ ছাড়াও এর প্রতিষ্ঠাতা অংশিদার হিসেবে আরো রয়েছে আলমেরির পৌরসভা, ফ্লেভোল্যান্ড প্রদেশ, ডাচ হর্টিকালচারাল কাউন্সিল ও নেদারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় সরকার।
আয়োজকরাদেও সাথে আলোচনা করে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হলো। বিশে^র আরবান নগর গুলোতে দ্রুতই বাড়ছে মানুষ। গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান। উঠছে একের পর এক অট্টালিকা। যেখানে আশংকাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে সবুজায়ন। এই শহর গুলোকে সবুজায়ন করার মুল প্রয়াস নিয়ে নেদারল্যান্ডের আলমেরিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফ্লোলিডা এক্সপো ২০২২।
গত ৩ ও ৪ জুন নেদারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক হটিকালচারাল এক্সিবিউশনে অবস্থিত বাংলাদেশ প্যাভেলিয়নে গেলে সেখানে দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রনালয়ের যুগ্ন সচিব মো: সাইফুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে জানান, বিশে^র বিভিন্ন দেশ সবুজায়নের উপযোগী চারা ও কৃষিজ পন্য নিয়ে শৈল্পিক সাজে সজ্জিত করেছে তাদের প্যাভেলিয়ান গুলো। যা দেখে মুগ্ধ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরা। আর বাংলাদেশ প্যাভেলিয়নে হটিকালচার চারার পাশাপাশি তারা রেখেছেন বাঁশ, বেত, কাঠ ও জুটের তৈরী সামগ্রী। যা প্রসংশা কুড়াচ্ছে বিশ^ পর্যটকদের।
নেদারল্যান্ডের ফ্লোলিডা এক্সপো ২০২২ সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, পৃথিবীর ভিন্ন দেশের ভিন্ন রকমের ছোট ছোট উদ্ভিদ জাতীয় ফুল ফলের গাছ, শাক-সবজি, দৃষ্টি নন্দন পাতা বাহার, রয়েছে চোখ ধাধানো টিউলিফ ফুল। এর ভিতরটি এতো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে যা দেখলে মনে হবে যেন আমরা সবুজ গালিছা বিছানো কোন নগরে প্রবেশ করেছি। পাশের রয়েছে বিশাল জলরাশি, সেখান থেকে শীতল বাতাস গায়ে মাখামাকি করে আর সবুজ অরণ্যে নানা জাতের রঙ্গীন ফুলগুলো চোখের দৃষ্টি স্থির করে রাখে। আর ফুলগুলোর সুগন্থ আপনাকে মোহিত এমনভাবে করবে যে সেখান থেকে আপনার আসতেই ইচ্ছে করবে না। এই নির্মল পরিবেশে এর ভিতর দিয়ে হাঁটার সময় আচমকাই আপনার মনে হবে আপনি হয়তো স্বর্গের কোন এক কাননে হাঁটছেন।
এক কথায় বলাযায়, ফ্লোরিয়েড এক্সপো বিশে^র একটি ব্যাতিক্রমী প্রদর্শনী যা একটি জীবন্ত গবেষনাগার। যেখান থেকে ঋতু পরিবর্তনের পর প্রত্যেক ঋতু অনুযায়ী উদ্যান পরিচর্যার শিক্ষা নিয়ে আরবান এলাকাগুলোকে সবুজায়ন করতে ভূমিকা রাখতে পারবেন প্রকৃতি প্রেমীরা।
এই ফ্লোরিয়েড পার্কটি একটি সবুজ সমারোহ ও টেকশই প্রযুক্তির সুতিকাগার হিসেবেও বিবেচ্য। কারন এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের প্রযুক্তি অনুযায়ী হটিকালচারাল ব্যবস্থাপনা উপস্থাপন করেছেন। যা উপভোগ করছেন এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরা।
এই জীবন্ত পরীক্ষাগারে দর্শনার্থীরা যোগপোযী ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য, মনের মতো সবুজায়নের স্বাদ ও গন্ধ সর্ম্পকে ধারণা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
আগত দর্শনার্থীরা এটিকে হটিকালচারাল জ্ঞানাগার হিসেবেও অবহিত করেছেন। কারণ এখান থেকে পৃথিবীর ব্যস্ততম শহরগুলোকে আরো সবুজ স্বাস্থ্যকর এবং আরো আকর্শনীয় করার অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
আয়োজকরা বলেন, প্রাকৃতিক ও পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রেখে এর মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)- অর্জন সম্ভব। এই এক্সপোতে আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনারে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা গুলো ভাগাভাগি করে সফলতা গুলো বিশে^ ছড়িয়ে দেয়া যায়।
এখান থেকে বিশ^মানের অভিজ্ঞতা নিয়ে হটিকালচারাল এর সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশকে কৃষিতে সমৃদ্ধ করা যায়। আর এর ফলাফল স্বরুপ এটি ওই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারকও হবে। সৃষ্ট উদ্যানের ফলজ বা ভেষজ পন্য রপ্তানী মাধ্যমে ওই দেশের জিডিপি বাড়াতেও তা সহায়তা করবে।
এছাড়াও এটি এক্সপো কর্তৃপক্ষ, সরকার, ব্যবসায়ী, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, শিক্ষক, প্রকৃতি প্রেমী, ও সাধারণ প্রদর্শকদের একত্রিত করার একটি সুযোগ করে দিয়েছে। এর বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যেমে সুফল বয়ে আনা অভিজ্ঞতাগুলো দেশে দেশে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে মানুষকে অত্যাধিক ব্যস্ততায় দিন অতিবাহিত করতে হয়। বিশেষ করে প্রত্যেক দেশের নগরে বা আরবান এলাকায় যারা বসবাস করেন তাদের চিরাচরিত অভিজ্ঞতা হলো কংক্রিট, কাঁচ, ইসপাতের তৈরী ইমারত ও পাথরের পিস ঢালাই রাস্তা। এ অবস্থায় এই আরবান এলাকায় বসবাসরত মানুষকে প্রায়শ্চই প্রকৃতি কাছে টানতে চায়। কিন্তু ব্যস্ততার কারনে সে সব জায়গায় অনেকেই যেতে পারেন না। যদি নিজের শহরে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা অফিসের পাশে একটি উদ্যান তৈরী হয় তাহলে আমাদের মননের প্রাকৃতিক চাহিদা সহজেই পূরণ হয়। আর ফ্লোরিয়েড এক্সপো শহরে সেই উদ্যান করার শিক্ষাই দিচ্ছে।
এই এক্সপোটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারন এটি বছর বছর হয়না। প্রতি ১০ বছর পর পর বিশে^র বিভিন্ন দেশকে নিয়ে এর আয়োজন হয়। এবারের আয়োজন ৭ম। যে কারনে এই প্রর্দশনীতে বরাবরই সন্নিবেশ ঘটে থাকে পৃথিবীর বড় বড় উদ্যানবিদ, প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ ও উদ্ভিদবিদদের।
এক্সপো পরিদর্শন করতে যাওয়া অন্তু দেব জানান, ইউরোপের পাশাপাশি প্রশান্ত মহা-সাগরিয় এলাকার দেশের নগরগুলোর সবুজায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয় এখানে।
তিনি জানান, সুবজ শহরে রুপান্তর থিমের উপর এই এক্সপোতে ৪০০টিরও অধিক জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক অংশগ্রহনকারী তাদের সর্বশেষ উদ্ভাবন ও এর প্রকৃয়া এখানে প্রর্দশন করেছেন। যেখানে অত্যাধুনিক সৌর ছাদের টাইলস থেকে শুরু করে নোনা মাটিতে সবুজায়নের পদ্ধতি সবই রয়েছে। রয়েছে হটিকালচারাল এর সর্বশেষ ছাঁটাই কৌশল।
সরজমিন পরিদর্শনে এর আরো একটি দিক লক্ষনীয় হয়যে, এই এক্সপো এর অভিজ্ঞতা নিয়ে আরবান এলাকার সাধারণ একজন নাগরিক নিজেকে সবুজ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে অনুপ্রাণিত করতে পারেন।
এখান থেকে পদ্ধতি জেনে তিনি তৈরী করতে পারেন নিজের ভবন বাগান, যেমন কোন জীবন্ত গাছ দিয়ে নিজের ব্যালকনি বা বসার ঘর সাজাবেন, সিঁড়ি সাজাবেন, বাহিরের দেয়াল বা ছাঁদ সাজাবেন এর পুরো অভিজ্ঞতাই এখানে আছে। আর একেক করে যদি নগরের সকল মানুষ এই অভিজ্ঞতা নেন এবং তা কাজে লাগান তাহলে সহজেই একটি জীবন্ত সবুজায়নের নগরে রুপ নিবে আপনার ইট কংক্রিটের ব্যস্ত শহর।
এটি নেদারল্যান্ডের রাজধানী আমস্টার্ডাম বিমানবন্দর থেকে ৩০ কিলোমিটার এবং শিফল বিমান বন্দর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত। আমস্টার্ডাম ও শিফল বিমান বন্দর থেকে বাসে, ট্রেনে ও টেক্সিতে সহজেই ফ্লোরিয়েডা এক্সপোতে পৌছা যায়। প্রবেশ ফ্রি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। এর ভিতরে রয়েছে বিশেষ ক্যাবল কারেরও ব্যবস্থা। আগামী ৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৭টা পর্যন্ত এই এক্সপো ঘুরে দেখা যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •