বৃটিশ-ভারতের প্রথম মহিলা কবি নারী শিক্ষা ও নারী মুক্তি আনন্দোলনে অগ্রদূত জনদরদি জমিদার ফয়জুন্নেছা চেীধুরী কর্মও জীবন দর্শন একশত আটারোতম মৃত্যুবার্ষিকীর প্রস্থাবনা

September 21, 2021, এই সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

মুজিবুর রহমান মুজিব॥ ১৭১৩ খৃষ্টাব্দে দিল্লীর মুঘল সম্রাট শাহ আলম ত্রিপুরা অঞ্চলে শান্তি স্থাপন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে অভিজাত রাজ বংশীয় আগোয়ান খানকে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরন করলে তিনি তার পুত্র শাহজাদা মির্জা হুমায়ুন খানকে নিয়ে ত্রিপুরা অঞ্চলে শান্তি স্থাপন করঃ দিল্লি চলেগেলেও শাহজাদা হুমায়ুন খানকে বাংলার মাটিও মানুষের মায়ায় পেয়ে যাওয়া। তিনি ত্রিপুরায় বসতি স্থাপন করলেও জমিদারিও শাসন কার্য পরিচালনার প্রয়োজনে ত্রিপুরা-কুমিল্লার নিকট বর্ওী লাকসামের পশ্চিম গাঁয়ে বসবাসও জমিদারি কার্য পরিচালনা করতে থাকেন। এই অভিজাত জমিদার বংশের অধঃস্থন বংশধর আহমদ আলী চৌধুরীর ঔরসে ১৮৩৪ খৃষ্টাব্দে লাকসামের পশ্চিম গাঁয়ে ফয়জুন্নেছা চৌধুরীর জন্ম।
বাল্যকৈশোর কালেই বালিকা ফয়জুন জমিদারি শানশওকত বিলাস ব্যেসন-আনন্দ উল্লাসের চাইতে লেখাপড়া,জ্ঞান চর্চাও জ্ঞানঅর্জনের প্রতি অধিকতার উৎসাহী ছিলেন।
পিতা- প্রখ্যাত জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী প্রিয় কন্যা ফয়জুনের শিক্ষানুরাগের উৎসাহ দৃস্যে গৃহ শিক্ষকের ব্যবস্থা করে দেন। সেকালে-একালের মত শিক্ষা প্রতিষ্টান এবং লেখাপড়ার চর্চা ছিল না,তদুপরি মুসলিম সমাজে কুসংস্কার,কঠোর পর্দা প্রথার কারনে নারী শিক্ষার প্রচলন ছিল না। উপমহাদেশে মুসলিম নারী জাগরনের অগ্রদূত মহিয়সী রমনী বেগম রোকেয়ারতখন জন্ম হয় নি। নারী শিক্ষার সেই অন্দকার যুগেও মুক্ত মনের উদার,সহনশীল ও শিক্ষানুরাগি পিতা জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী সেসময় কার বিশিষ্ট শিক্ষক ওস্থাদ তাজ উদ্দিনকে বালিকা ফয়জুন এর গৃহ শিক্ষক নিয়োগ করে দিলে শিক্ষানুরাগি ফয়জুন্নেছা উৎসাহের সঙ্গেঁ আরবি,ফার্সি,বাংলাও উর্দু ভাষায় শিক্ষা গ্রহন করেন। মেধাবী ফয়জুন্নেছা উল্লেখিত ভাষাসমূহে বিশেষ বুৎপওি অর্জন করেন। কোন প্রাতিষ্টানিক শিক্ষা-ডিগ্রীঅর্জন না করলেও শিক্ষানুরাগি ফয়জুন্নেছা চৌধুরী পৃথিবীর পাটশালাথেকে সব বিষয়ে শিক্ষাও জ্ঞান অর্জন করেন-এ ক্ষেত্রে তার গৃহ শিক্ষক ওস্থাদ তাজ উদ্দিন মুখ্য ভুমিকা ও মানবিক দায়িত্ব পালন করেন।
দুঃখিনি জমিদার কন্যা ফয়জুন্নেছা চৌধুরী মাত্র দশ বৎসর বয়সে পিতৃ হারা হন। স্বশিক্ষিত ও শিক্ষানুরাগি ফয়জুন্নেছা চেীধুরীরইচ্ছা ছিল বাংলার নারী জাগরন, নারী মুক্তির লক্ষ্যে নারী সমাজকে শিক্ষিত করে তোলাকিন্তু আকস্মিক পিতৃবিয়োগে পিতার জ্যেষ্ট সন্তান হিসাবে বিশাল জমিদারি রক্ষাও পরিচালনার দায়িত্ব তার উপরই বর্তায়।
মহান আল্লাহর নাম নিয়ে সেই স্নেহ ময়ীজননীর অভিভাবকত্বে দশমাবর্ষী বালিকা কঠোর হস্তে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব ভার গ্রহন করেন।
সেই সামন্ত যুগে চীর স্থায়ী বন্দে বস্ত- জমিদারি প্রথায় ছোট-বড় জমিদার গন একধরনের স্বাধীন শাসকে পরিণত হন। উপমহাদেশীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রমান পাওয়া যায় সে সময় সমাজে দুই ধরণের জমিদারদের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। এক,অত্যাচারি, জুলুম নির্য্যাতন কারি দুই,জন দরদি জমিদার শ্রেণি সামন্ত যুগে রাজনৈতিকদল,সংবাদ পত্র,নির্বাচিত গনতানÍ্রীক সরকার,লিপি বদ্ধ সাংবিধানিক আইন কানুন,জন সচেতনতা ও জনঐক্য না থাকার কারনে অত্যাচারি জমিদার গন পাইকপেয়াদা লাঠিয়াল বাহিনী মারফত ইচ্ছা মত খাজনা আদায় করতেন,খাজনা প্রদানে অক্ষম দরিদ্র রায়ত প্রজার ভিটা-মাটি উচ্ছেদ বিক্রি হত,নানকার প্রথা ও চালু ছিল। জমিদার-ভূ-স্বামী ছিলেন মদ্যপ্য,চরিত্রহীন,জুয়ারি ইত্যাদি। অপর পাক্ষ্য এক শ্রেণির জমিদার ছিলেন জন দরদি। প্রজা সাধারনের কল্যানার্থে শিক্ষা,স্য¦াস্থ,যোগাযোগ ও সমাজ উন্নয়নে নিজ উদ্যোগেই দায়িত্ব পালন করতেন জন দরদি জমিদারগন। সমাজে এদের সংখাই অধিক। জমিদার ফয়জুন্নেছা চেীধুরী ছিলেন দ্বিতীয় দফায় বর্ণিত একজন প্রখ্যত জন দরদি জমিদার, শিক্ষানুরাগি,কবিও সমাজ হিতৈষী।অসম্বব^ রকমের সুন্দরী-রুপশীও গুণবতি বালিকা ফয়জুন্নেছার রুপে-গুণে উম্মাদ হয়ে তার পিতৃ- বংশীয় আত¦ীয় ডাউক সারের জমিদার মোহাম্মদ গাজি চেীধুরী বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে বালিকা
ফয়জুন্নেছা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার কারণে কন্যা পক্ষ সে প্রসÍাব না কচ করে দেন। গাজি চেীধুরীর পিতা-মাতা তাকে সংসারের প্রতি মনো নিবেশ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে বিয়ে করালেও তাঁর মন থেকে যায়,রয়ে য়ায় রুপবতী ফয়জুন্নেছার কাছে। বালিকা জমিদার ফয়জুন্নেছা মাত্র দশ বৎসর বয়সে বিশাল জমিদারির দায়িত্ব ভার নিয়ে তাঁর সকাল সন্ধ্যা-দিবারত্রি উৎসর্গ করেন প্রজা সাধারনের কল্যানে। জমিদার ফয়জুন্নেছা চেীধুরী তার বিশাল জমিদারির আয় তিনি মানব কল্যানে ব্যয় করে গেছেন। জন দরদিও শিক্ষানুরাগি জমিদার ফয়জুন্নেছা চেীধুরী শিক্ষার উপরই গুরুত্ব দিয়েছেন অত্যাধিক। বেগম রোকেয়ার জন্মের পূর্বে নারী মুক্তির অগ্রদূত ফয়জুন্নেছা চেীধুরী ১৮৭৩সালে কুমিল্লা শহরের বাদুর তলা এলাকায় ফয়জুন্নেছা ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্টা করেন-যাবর্তমানেসর-কারি গার্লস হাই স্কুল নামে পরিচিত। ধর্ম শিক্ষার উন্নয়নে ফয়জুন্নেছা চেীধুরী ১৯০১সালে লাকসামে যে মাদ্রাসা স্থাপন করে ছিলেন বর্তমানে তাহাই নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাও ধর্ম শিক্ষার প্রসারে তিনি তার জমিদারি ভূক্ত চেীদ্দটি মোজায় চেীদ্দটি মক্তব স্থাপন করে ছিলেন। তার জমিদারি এলাকা ছাড়াও তিনি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের কৃষ্ণ নগরে একটি স্কুল প্রতিষ্টা করে দিয়ে ছিলেন। ধর্ম প্রাণ বেগম ফয়জুন্নেছা চেীধুরী পবিত্র হজব্রত পালন করতে গিয়ে মক্কা শরীফের মিছফালায়-মিছফালাহ মাদ্রাসা ও মাদ্রাসাই সাও লাতিয়া প্রতিষ্টা করে ছিলেন। দানশীল মহিলা বেগম ফয়জুন্নেছা চেীধুরী মক্কা শরীফেদুটি প্রতিষ্টানের জন্য ৩৪০টাকা এবং মদিনা শরীফে একটি মাদ্রাসার জন্য নিয়মিত একশত টাকা সাহায্যের ব্যবস্থা করেন।
১৮৯৪ সালে পবিত্র মক্কা শরীফে এক বৎসর কাল অবস্থানের সময় তিনি জুবায়দা নহরের পূর্ণ খনন তে মিছফালায় মোসাফির খানা রোবাত নির্মান করেণ। শিক্ষানুরাগি ফয়জুন্নেছা চেীধুরী স্বাস্থ, যোগাযোগও জন গুরুত্ব পূর্ণ খাতে ও কৃতিত্ব পূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। প্রজা সাধারনের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনে ১৮৯১ সালে পশ্চিম গাঁও দেীলতগঞ্জ বাজারে তিনি যে দাতব্য চিকিৎসালয়টি প্রতিষ্টা করেছিলেন সেটিই বর্তমানে লাকসাম উপজেলা দাতব্য চিকিৎসালয় নামে খ্যাত। প্রজা সাধারনের সুপায়ে পানীয় জলের জন্য জনদরদি এই নারী তার চেীদ্দটি জমিদারি মোজার মধ্যেই দিঘি পুকুর,নির্মান করে দিয়েছিলেন। জন যোগাযোগের সুবিধার জন্য ফয়জুন্নেছার অবিস্মরনীয় অবদান লাকসাম সদর ও পশ্চিম গাঁও এর সংযোগ সুবিধার জন্য ডাকাতিয়া নদির উপর পুল নির্মান। এই ভাবে জনদরদি জমিদার ফয়জুন্নেছা চেীধুরী জীবনের সকল স্থরে জনগনের নিরহ প্রজা সাধারনের সুবিধার জন্য জনহিত কর কাজ করে গেছেন। যে সময় নারী শিক্ষার প্রচলন ছিল না সে সময় জমিদার ফয়জুন্নেছা চেীধুরী স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কাব্যও সাহিত্য চর্চা করে ছেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্য গ্রথ্নরুপজালাল। বাংলার প্রথম মহিলা কবি হিসাবে ১৮৭৬ সালে ঢাকা গিরিশ মুদ্র্নাযন্ত্রা থেকে তার পুস্তক প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও তার সঙ্গীত ছাড়ও সঙ্গীত লহরী নামে তার দু খানা গ্রন্ত্র রয়েছে। ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমী তার এক খানা গ্রন্ত্র পুর্নঃ প্রকাশ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে জমিদার ফয়জুন্নেছা চেীধুরী ছিলেন এক দুঃখিনি রমনী। পিতা মাতার মৃত্যুর পর শোককে শক্তিতে পরিনত করে নিজের জীবনকে জন কল্যানে উৎসর্গ করেছেন।
তার বিবাহিক পারিবারিক জীবন সুখময় ছিল না। ডাউক সারের জমিদার – আত্বীয় গাজি চেীধুরীর বিবাহের বারো বছর পর কোন সন্তানাদি জন্ম না হলে বাইশ বৎসর বয়সী অপূর্ব সুন্দরী রমনী দেশ-বিদেশ খ্যাত ফয়জুন্নেছা চেীধুরীকে পিতৃ- গৃহ ত্যাগ করে স্বামীর বাড়ি না যাওয়ার শর্তে মধ্য বয়স্ক দোজ বরের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবব্দ হতে হয়। দুই কন্যা সন্তানের জন্ম হলেও তাদের দামপত্য জীবন সুখময় ছিল না। জনদরদি ফয়জুন্নেছা নিজের সুখ শান্তির চাইতে প্রজা সাধারনের সুখ শান্তিকেই অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রজা সাধারণ ছিলেন তার সন্তানের মত তার সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার সাথী। ইংলেন্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া পল্লী বাংলার এক সাধারন নারীর অসাধারন গুণাবলির সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে তাকে বেগম উপাধিতে ভূষিত করলে-স্ত্রীলিঙ্গে মহিলা বিবেচনায় তিনি তা স্ব-সম্মানে প্রত্যাখ্যান করেন। মহা রানী ভিক্টোরিয়া প্রতিনিধি দলপাঠিয়ে সে সব জেনে বুঝে সন্তুষ্ট হয়ে স্ব-সম্মানে ফয়জুন্নেছা চেীধুরীকে নবাব উপাধিতে ভূষিত করেন।
তিনি উমহাদেশের এক মাত্র মহিলা নবাব। ১৮৮৯ সালে এই খেতাব প্রদানে এক অনুষ্টান কুমিল্লারমাঠে অনুষ্টিত হয়। ধর্ম প্রাণ নবাব ফয়জুন্নেছা চেীধুরী মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আল্লাহর বান্দা জন কল্যানে তার সকল সম্পত্তি ১৮৯১ সালে ১৮ই জুন ওয়াকফ করে দেন। ত্যাগের এমন ইতিহাস বাংলা-ভারতের ইতিহাসে বিরল। শিক্ষা,দীক্ষা,সভ্যতাও সংস্কৃতিতে অনগ্রসর একটি সমাজে পল্লী বালা ত্যাগও জন সেবার যে উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা এখনও সমুজ্জল অত্যাধুনিক শিক্ষাও খাই খাই সমাজে লোভী হেলেনা-পাপিয়া দের লজ্জা পাওয়া উচিত শিক্ষা
নেওয়া উচিত। নবাব ফয়জুন্নেছা চেীধুরী ঢাকা-কোলকাতার বাসিন্দা না হওয়ার কারনে মানব প্রেমও মানব কল্যানে যে ঐতিহাসিক অবদান রেখে গেছেন তা সাধারন্যে অনালোচিত তিনি এখন একটি অনালোচিত নাম মাত্র। ১৯০৩ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বর এই মহিয়সী রমনী মহান মৃত্যকে আলঙ্গিন করে তার ও আমাদের আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেন। তার এই মৃত্যো বার্ষিকীতে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান মালিক তার বেহেশত নসীব করুন এই মোনাজাত করছি। দেশের প্রবিন শিক্ষাবিদ বহু গ্রন্ত্র প্রনেতা শ্রদ্বেয়া বেগম মায়াওয়াহেদ তার জীবনজয়ী চেীদ্দ নারী গ্রন্ত্রে বেগম ফয়জুন্নেছা চেীধুরীর জীবনী স্থান দিয়েছেন।উপসংহারে গ্রন্ত্রকার যথাযথ দাবি জানিয়ে ছেন তার জন্মও মৃত্যবার্ষিকীতে বিভিন্ন সংবাদ পত্র টেলিভিশনে বিশেষ প্রচারও স্কুল-কলেজের পাঠ্য পুস্তুকে তার কাজ কর্মের মূল্যায়ন সহ তার জীবনী সংযোজিত হলে আগামী প্রজন্ম পূর্ব-সুরীদের কাজের মূল্যায়ন করে জানতেও বুঝতে শিখবে যে,জীবনটা শুধু ভোগ বিলাশ নয় পরহিত ব্রতেও উৎসর্গ করা যায়। কবির ভাষায়-
“পরের কারনে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
[ষাটের দশকের সাংবাদিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার জেলাবার ও জেলা প্রেসক্লাব মুক্তিযোদ্ধা।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •