মুক্তিযুদ্ধের গবেষক-লেখক-মাহফুজুর রহমানের হঠাত চলে যাওয়াঃ স্মৃতিচারনঃ স্মরন

August 30, 2018, এই সংবাদটি ৪১৮ বার পঠিত

মুজিবুর রহমান মুজিব॥ তেইশে আগষ্ট বৃহস্পতিবার সন্ধায় হঠাৎ করেই চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের গবেষক-সুলেখক প্রিয়ভাজন মাহফুজুর রহমান। ষাটের কোঠায় এসে ডাইবেটিস ও শ^াসকষ্ট ছাড়া তার খুব একটা দূরারোগ্য ব্যাধি ছিলনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ভাষ্য মতে ব্যাধিদ্বয় ঘাতক নয়। ঐদিন রাত আটটায় তার কলিমাবাদস্থ বাসগৃহে দুই বার বমি করে অসুস্থ বোধ করেন লেখক মাহফুজুর রহমান। অজ্ঞান অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষনা করেন। মৃত্যোকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় তেষট্টি বৎসর। তিনি স্ত্রী এক পুত্র অসংখ্য আত্বীয় স্বজন ও বহু গুনগ্রাহী রেখেগেছেন।
লোক গবেষক মাহফুজুর রহমানের অকাল ও আকস্মিক মৃত্যোতে জেলা সদরস্থ রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্যাঙ্গঁনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। শোক সংবাদটি পেয়েই তার গুনগ্রাহী ও স্বজনগন তার কলিমাবাদস্থ বাসগৃহে গমন করতঃ তার মরদেহের প্রতি সম্মান এবং তার শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। চব্বিশে আগষ্ট শুক্রবার সকাল এগারো ঘটিকায় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ সংলগ্ন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গঁনে তার লাশ আনা হয়। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংঘটনের পক্ষ থেকে তার মরদেহের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়, তার কর্মময় জীবনের উপর আলোকপাত করে বক্তব্য রাখেন মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ এর চেয়ারম্যান, সাবেক সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এম.আজিজুর রহমান এবং অন্যান্য। ঐদিন বাদ জুম্মা বিকাল দুই ঘটিকায় টাউন ঈদগায় তার নামাজে জানাজা অনুষ্টিত হয়। তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন প্রিন্সিপাল মুফতি মৌলানা শামসুল ইসলাম। জানাজার পূর্বে শোক প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন সাবেক চীফ হুইপ উপাধ্যক্ষ ডক্টর আব্দুশ শহীদ, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ন সচিব সৈয়দ জগলুল পাশা, মদন মোহন কলেজ, সিলেটের অধ্যক্ষ ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, প্রবীন আইনজীবী মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান মুজিব, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মিছবাহুর রহমান, চেম্বার সভাপতি এম. কামাল হোসেন প্রমুখ।
নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ডক্টর ফজলুল আলী, সরকারি মহিলা কলেজের অবঃ অধ্যক্ষ প্রফেসর সৈয়দ ফজলুল্লাহ, অধ্যক্ষ প্রফেসর মাসুনুর রশীদ, অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ শাহজাহান, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল প্রফেসর চৌধুরী মামুন আকবর সহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষাবিদ বৃন্দ, স্বাস্থবিভাগের অবসর প্রাপ্ত পরিচালক বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. শফিক উদ্দীন সহ চিকিৎসক বৃন্দ, প্রেসক্লাব সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ছড়াকার আব্দুল হামিদ মাহবুব, প্রেসক্লাব সেক্রেটারি বিশিষ্ট সাংবাদিক সালেহ এলাহি কুটি সহ পৃন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক সংঘটক বৃন্দ। জানাজা শেষে মাহফুজুর রহমানের মরদেহ হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফার মাজারস্থ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। দাফন-কাফনের পর তার প্রথম কবর জিয়ারত শেষে বিষন্ন মনে বাসায় চলে আসি। মহান মালিক তার বেহেশত নসীব করুন। তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবার বর্গকে এই কঠিন শোক সইবার শক্তি দিন। সদ্য প্রয়াত মাহফুজুর রহমান আমাকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কথা লেখার দাবী জানিয়ে, লিখিয়ে নিয়েছেন। সে গ্রন্থ প্রকাশের পূর্বে তাকে নিয়ে স্মৃতি কথা স্মৃতি চারন করা আমার জন্য খুবই কষ্টকর। একজন অগ্রজ লেখক হিসাবে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা এবং তাঁর কর্মময় জীবনের যৎকিঞ্চিত মূল্যায়ন ও সম্মান প্রদর্শন এই সামান্য নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
কমলগঞ্জ উপজেলাধীন বাদে সোনাপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে মানব শিশু মাহফুজ এর জন্ম। ঐতিহ্যবাহী কমলগঞ্জ উপজেলা ভানুবিল, করাইয়ার হাওর-বাওর, পাহাড়-নদী-ধলাই বেষ্টিত কমলগঞ্জ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপরুপ লীলাভূমি। বালক মাহফুজ এর বাল্য-কৈশোর কেটেছে বাদে সোনাপুর গ্রামে। অপরূপ প্রাকৃতিক নিস্বর্গ, পাহাড়-হাওরের বিশালতা এবং গ্রামীন সারল্যের মাঝে বেড়ে উঠেন সহজ সরল সাদা মনের মানুষ মাহফুজুর রজমান। বাল্য কৈশোর কাল থেকে মাহফুজুর রহমান পরিবেশ-প্রকৃতি-মানবপ্রেমিক ও জনদরদি মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেন। তার এলাকা ও কাছের মানুষ ষাট-সত্তোর দশকের বিশিষ্ট বাম প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ-মেধাবী সাংবাদিক সৈয়দ মতিউর রহমান, সি.পি.বি-র সাবেক কেন্দ্রীয় সম্পাদক এবং বর্ত্তমান প্রিসিডিয়াম মেম্বার কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমদ এবং বাম প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবি-বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর সাইয়্যেদ মুজিবুর রহমান প্রমুখের অনুপ্রেরনায় মাহফুজুর রহমান বাল্য-কৈশোর কাল থেকে ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ-বাম প্রগতিশীল ভাবাদর্শের অনুসারি হয়ে উঠেন। এ ব্যাপারে গবেষক মাহফুজুর রহমান রচিত গবেষনা গ্রন্থ -হাওর করাইয়ার কৃষক আন্দোলন- এর ভূমিকায় বাংলাদেশের বিশিষ্ট মার্কসবাদি তাত্বিক ও রাজনীতিবিদহায়দর আকবর খান মাহফুজুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও ধ্যান ধারনা প্রসঙ্গেঁ বলেন -“লেখক নিজেও ছিলেন কমিউনিষ্ট রাজনৈতিক কর্মি, তখন তার বয়স খুব কম। ছাত্র। কিন্তু পরবর্ত্তীতে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন, ভাষানী ন্যাপ, কৃষক সমিতি ও কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সঙ্গেঁ জড়িত ছিলেন।
সম্ভাবনাময় তরুন ছাত্র-যুব কর্মি মাহফুজুর রহমান কমলগঞ্জ থানাধীন জন্মভূমি বাদে সোনাপুর পিছনে ফেলে মৌলভীবাজার জেলা সদরস্থ পারিবারিক বাসগৃহ কলিমাবাদে স্থায়ীভাবে বসতি শুরু করেন। বয়স হলে সু-কন্যা নুরুন্নাহার বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এক পুত্র সন্তানের পিতা হন।
আমার পৈত্রিক বাসগৃহ মুসলিম কোয়ার্টারস্থ রসুলপুর হাউস থেকে মাহফুজুর রহমান বাসা বাড়ি কলিমাবাদ খুব বেশি দুরে নয়। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ এবং মৌলভীবাজার জেলা বার থেকে কলিমাবাদ খুবই কাছাকাছি প্রায় প্রতিবেশিই বলা চলে। ছাত্র জীবন কাটিয়েছি এই কলেজেই। স্বাধীনতা পূর্ব কালে গ্রেজুয়েশন ডিগ্রি নিয়েছি এই কলেজ থেকেই। স্বাধীনতা উত্তরকালে জেলা বারে যোগদান করার পর ছুটি ছাড়া সকাল বিকাল আদালত আঙ্গিনা-প্রাঙ্গঁনেই বিচরন। বর্ত্তমানে জেলা জামে মসজিদ এর সম্পাদক হিসাবে সপ্তাহে সাত দিনই আছি নামাজে-কাজে-আশেপাশে। মসজিদের প্রতিবেশি কলিমাবাদ আবাসিক এলাকা। ফলতঃ এখনও মাহফুজুর রহমান ছিলেন আমার প্রতিবেশি।
কর্মি ও সংঘটক মাহফুজুর রহমান এর সঙ্গেঁ আমার কবে কোথায় কখন সাক্ষাত-সম্পর্ক সখ্যতা সে দিন তারিখ এই পরিনত বয়সে আর মনে নেই। আমার মত লম্বা ফিগার, ফর্সা চেহারা সুঠাম শরীর, গোলবাটা মুখ, বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ষ্টাইলে মাথায় একমাথা কাঁধ অব্দি ঝাকড়া বাবরি চুল। মাঝখানে সিতে কাটা। রাশিয়ান নেতা কমরেড ষ্টালিন ষ্টাইলে বিশাল আকর্ষনীয় গোঁফ, মুখে এক চিলতে মিষ্টি-মুচকি সমেত এয়তকাতি বারোমাস ঢোলা পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত সাধারন পোষাকের অসাধারন মানুষ ব্যক্তি মাহফুজুর রহমানকে প্রথম দর্শনেই যে কারো ভালোলাগার কথা। বামপন্থী লেখক মাহফুজুর রহমান বারোমাসই বা কাধে ঝুলানো থাকতো একটি রঙ্গীন কাপড়ের সাইট ব্যেগ। শীতকালে অতিরিক্ত কাঁধে একটি চাদর। পাজামা পাঞ্জাবি গলায় উত্তবীয় কিংবা চাদর ধারি হলেও মাহফুজুর রহমান চাদ্দরিনেতা ছিলেন না, তাকে কোনদিন মিছিলে উচ্চকন্ঠে শ্লোগান কিংবা জনসভায় জ¦ালাময়ী ভঅষন দিতে দেখিনি। বয়সে আমার চাইতে প্রায় একদশাধিককাল ছোট হলেও তাঁর সাথে আমার সু-সম্পর্ক ও সখ্যতার কমতি ছিলনা-যদিও আমি তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও ধ্যান ধানার অনুসারি ছিলাম না, বরং আমরা ছিলাম ভিন্নমুখী। ষাট-সত্তোর দশকে আমার কলেজ -বিশ^বিদ্যালয়ের জীবনে আমি ছিলাম ছাত্রলীগের আদর্শের অনুসারি-সংঘটক-দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ঐ দশকের শুরুতে প্রথমতঃ মৌলভীবাজার কলেজ শাখা, অতঃপর মহকুমা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। মাহফুজুর রহমান ছিলেন বাম প্রগতিশীল আদর্শের অনুসারি-ছাত্র ইউনিয়ন অতঃপর ভাষানী পন্থী বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন এর অনুসারি। ঐ দুই দশকে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন একে অপরের প্রতিদ্ধন্ধী এবং ছাত্র-জনপ্রিয় ছাত্র সংঘঠন ছিল। এসব প্রতিদ্বন্ধীতা-প্রতিযোগীতা ছিল রাজনীতির ময়দানে কলেজ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। ব্যক্তিগতভাবে দলমত বর্ন গোত্র ধর্মকর্ম নির্বিশেষে সৌহার্দ-সম্প্রিতি ছিল-সহমর্মিতা ছিল- যা এখন কমতে কমতে নাই হয়ে যাচ্ছে। মাহফুজুর রহমান আমাকে মুজিব ভাই বলে ডাকতেন। ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন। কোনদিন আমার সঙ্গেঁ হালকা রং তামাশা করেন নি। আমিও তাকে অনুজের মত ¯েœহ-মমতা করতাম। সাহেব নয় স¯েœহে নাম ধরেই ডাকতাম। তার সাংঘটনিক ক্ষমতা, গবেষনা ও গদ্য সাহিত্যে দক্ষতা ও আনুগত্য, মানবপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবোধ সৌজন্য ও বিনয়াচরন আমাকে বিমুগ্ধ করত। মাহফুজুর রহমান আমার সঙ্গেঁ কোনদিন কোন কুতর্কে নয়, তর্কেই আসেন নি তার সঙ্গেঁ আমার রাজনৈতিক মত পার্থক্য ছিল কিন্তু কোনদিন কোন মনোমালিন্য হয়নি, মনকসাকসি, হাইটোনে হট টক হয়নি, আমাদের শহরে লোকসাহিত্য, লোকশিল্প, কর্মিদের সংখ্যা একেবারেই কম। গদ্য শিল্পী মাহফুজুর রহমান এ সব ক্ষেত্রে কাজ করে স্থানীয় নয় জাতীয় পর্য্যয়েই খ্যাতি ও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কমলগঞ্জের নিভৃত পল্লী বাদে সুনাপুরে জন্মনেয়া মাফুজুর রহমান জেলা শহর কলিমাবাদ এ পারিবারিক বাসাবাড়িতে বসবাস করে কঠোর পরিশ্রম মেধা ও মননের কারনে জাতীয় প্রতিষ্টান বাংলা একাডেমীতে কাজ করেছেন, আসাদ চৌধুরী, সামশুর রহমান সাহেবদের মত জাতীয় কবি সাহিত্যকদের সঙ্গেঁ সখ্যতা গড়ে তুলেছেন তাঁদের সঙ্গেঁ কাজ করেছেন, সেমিনার সিম্পজিয়ামে সারগর্ভ আলোচনা করে বোদ্ধা-বুদ্ধিজীবী মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। গবেষক ও সংগ্রাহক মাহফুজুর রহমান বাংলা একাডেমীর নির্বাচিত সংগ্রাহক হিসাবে যৌথভাবে দুই হাজার সালে হবিগঞ্জ জেলার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও ইতিহাস রচনায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন-প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। একজন প্রতিভাবান প্রাবন্ধিক হিসাবে মাহফুজুর রহমানের দূঃখানা জীবনী গ্রন্থ বিপিন চন্দ্র পাল এবং মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন-বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। দুই হাজার দুই সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রকাশ করেছে তার জীবনী গ্রন্থ -সৈয়দ মুজতবা আলী। বাম বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ মাহফুজুর রহমানের রাজনৈতিক গবেষনা গ্রন্থ -“হাওর করাইয়ার কৃষক আন্দোলন”- একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। দুই হাজার তিন সালে মার্কসবাদী তাত্বিক কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর ভূমিকা সম্বলিত গবেষনা প্রন্থ খানি দারুন পাঠক প্রিয়তা পায়। তার অপ্রকাশিত পান্ডলিপি রয়েছে নানা প্রসঙ্গঁ, নানা ভাবনা, সাক্ষাতকার এবং সিলেট অঞ্চলের নৃতাত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্টী। তার রাজণৈতিক সহযোদ্ধা ও মিত্রগন তার অপ্রকাশিত গ্রন্থগুলি প্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারেন। একজন গবেষক লেখক-গদ্য শিল্পী হিসাবে তিনি সফল। সার্থক। প্রবন্ধ কঠিন নিরস নিস্প্রান-নিরামিশ হলেও তার গদ্য গতিশীল। ছন্দময়। প্রাঞ্জল। সুখপাঠ্য। হাওর করাইয়ার কৃষক আন্দোলন গ্রন্থখানি বেরুনোর পর নিজ নাম স্বাক্ষর করে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। করাইয়ার হাওরের উপর আমার কিছু কাজ ও লিখা ছিল। গ্রন্থখানি সযতেœ রেখেছিলাম-আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ শালায় আজ তার মৃত্যোর পর আবার কাজে লাগল।
মানুষ হিসাবে মাহফুজুর রহমান ছিলেন আমার শুভাকাংখী ও একান্ত সুহৃদ। লেখালেখি সংক্রান্ত ব্যাপারে তার মত আমি যেনো ঢাকামুখী হই বাংলা একাডেমীর সঙ্গেঁ সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করি, এই মর্মে তার যাবতীয় অনুরোধ আমি হাসি মুখে প্রত্যাখ্যান করেছি, কারন ঢাকামুখী হওয়ার সেই বেলা আমার আর নাই।
গবেষক প্রাবন্ধিক-মাহফুজুর রহমান একজন বলিষ্ট সাংস্কৃতিক সংঘটক ছিলেন। মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নির্ব্বাহী কমিটির সদস্য হিসাবে তিনি জেলার শিল্প-কলার চর্চা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আশির দশকে সামরীক স্বৈর শাসক লেঃ জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এর্শাদ সরকারামলে সামরীক স্বৈর শাসন বিরোধী ছাত্র-যুব-গন আন্দোলনকে শক্তিশালী ও বেগবান করতে সচেতন শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যাভিনেতা-নির্মাতা-সাংস্কৃতিক সংঘটকগন ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামেন। তখন আমার পূর্ন যৌবনকাল-রুগবালাইর বালাই নেই। ষাটের দশক থেকে মঞ্চাভিনয়, রচনা, নির্দেশনায় ছিলাম। গড়ে উঠে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বিভিন্ন কর্ম পেশার প্রতিনিধিদের সংস্থা সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, এর্শাদ বিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ট ভূমিকা রাখে। বন্ধুবর উপাধ্যক্ষ আব্দুশ শহীদ (পরে একাধিক মেয়াদে সাংসদ। চীফ হুইপ। বর্ত্তমানে ডক্টর এবং সরকারি ক্রয় কমিটির সভাপতি) আমি নিজে জেলা কমিটির যুগ্ন আহ্বায়ক হই। এ ব্যাপারে গনপূর্ত বিভাগের তৎকালীন এস.ডি.ই দেওয়ান মোহাম্মদ ইয়ামীন এর ভূমিকাও ছিল খুবই ইতিবাচক। আমরা কর্মজীবী-পেশাজীবী গন পথসভা, কবিতা পাঠ এবং মাঠ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড দ্বারা এর্শাদ বিরোধী আন্দোলনে গন সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে তুলি। তখন আমরা একসঙ্গেঁ এক প্লাটফর্মে কাজ করার সুযোগ পাই। এক্ষেত্রে আমাদের আরেকজন শ্রদ্ধেয় অগ্রজ বিশিষ্ট আইনজীবী কবি ও সমালোচক নজমুল হক চৌধুরীর প্রশংসনীয় ভূমিকা এবং অভিভাবকত্বের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করছি। লেখক মাহফুজুর রহমান সাংস্কৃতির সংঘটক হিসাবে সামরীক স্বৈর শাসক এর্শাদ বিরোধী আন্দোলনে আন্তরিকার সঙ্গেঁই দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক ও গবেষক মাহফুজুর রহমান আমার সাথে সু-সম্পর্কের সুবাদে মুক্তিযুদ্ধের একটি পূর্নাঙ্গঁ ইতিহাস গ্রন্থ রচনার দাবী জানালে শেষ বয়সে এই অবেলায় এই কঠিন বিষয়ে গ্রন্থ রচনায় সবিনয়ে অনীহা প্রকাশ করি। বিষয়টি খুব কঠিন, জটিল এবং স্পর্শকাতর কাজ। আমার কোন দূর্বলতা, কোন বিশেষ মহলের প্রতি ভয়ভীতি নেই। বিরাশী সালে মহকুমা শর্তবর্ষ পূর্তি স্মরনিকা, বিশাল স্মারক গ্রন্থ -শতাব্দীতে- সম্পাদনা ও উদযাপন পরিষদ- এর দাবীতে আমি মৌলভীবাজার রাজনৈতিক আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম-নিবন্ধ লিখেছিলাম। কোর্ট কাচারি ঘর সংসার-দূনিয়াদারী ছেড়ে সকল থানায় থানায় – গ্রামে গঞ্জে আমি ঘুরেছি-তথ্য সংগ্রহ করেছি। শাহজাহান হাফিজ, (দেশের বিশিষ্ট কবি। অবঃ অধ্যাপক। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু) মুজিবুর রহমান মুজিব (আমি নিজে) এবং সৈয়দ জয়নাল আবেদীন (নোটারী পাবলিক। বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ) এর সম্পাদনায় প্রকাশিত বিশাল তথ্য বহুল সংকলন-শতাব্দীতে- মুক্তিযোদ্ধা অধিনায়কদের নামের তালিকা, সংঘটকদের নাম ধাম এবং প্রথমবারের মত জেলার সকল স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, সংগঠন, রাজাকার, আল বদরদের নামের তালিকা প্রকাশ করি, রচনাটি গবেষক মাহফুজুর রহমান খুবই পসন্দ করেছিলেন, পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ শক্তির কতেক শক্তিশালী মহল আমাকে বেনামীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিলেও আমি ভীত হইনি-কোন গুরুত্ব দেইনি। লেখক মাহফুজুর রহমান এবং আমার আরো শুভাকাংখী স্বজনদের অনুরোধে মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস লেখা শুরু করে তথ্য ও আলোকচিত্র সংগ্রহ শুরু করি। চুরাশি সালের ভয়াবহ বন্যায় আমার বাসা সহ সমগ্র জেলা সদর প্লাবিত হলে আমার বই পুস্তক সংগ্রহ বিনষ্ট হয়ে যায়। পরবর্ত্তী পর্যায়ে জাতীয় ভাবে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা তৈরী চুড়ান্ত না হওয়া এবং সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স ও সরকারি সিদ্ধান্ত হীনতায় মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস লিখায়ও বিরত থাকি। শুধুমাত্র ষোল ডিসেম্বর, ছাব্বিশে মার্চ এবং বিশে ডিসেম্বর স্থানীয় শহীদ দিবস নিয়ে পাঠকদের দাবীর প্রেক্ষিতে স্মৃতিকথা লিখি। মুক্তিযুদ্ধের গবেষক মাহফুজুর রহমান আমাকে চেপে ধরলেন-বল্লেন লেখক-মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আপনিও এখন পরিনত বয়সে। আজিজ ভাই ও (এম.আজিজুর রহমান। বীর মুক্তিযোদ্ধা। চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ) অসুস্থ। তিনিত লিখক নন। লেখক হিসাবে আপনি যা দেখেছেন-শুনেছেন-তাই লিখুন। মুক্তিযুদ্ধের পূর্নাঙ্গঁ ইতিহাস-ঐতিহ্য-কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষনের লক্ষে আমার দেখা একাত্তোর: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা”- তথ্য সংগ্রহ, পুস্তক পর্য্যালোচনা, স্বজনদের মৌখিক সাক্ষাতকার নিয়ে দিবারাত্রি পরিশ্রম করতঃ পান্ডুলিপি তৈরী করি। তার জৈষ্ট ভ্রাতা মনসুর আইনজীবী সহকারি হিসাবে দেওয়ানী আদালতে কাজ করেন। আমরা এক সঙ্গেঁ জোহর-আছর এর নামাজ পড়ি। তাঁর কাছ থেকেও মাহফুজুর রহমান এর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কুশলাদি জেনে নিতাম। বাদ আছর বাসায় যাওয়ার সময় আমার প্রায়ই মাহফুজুর রহমান এর সঙ্গেঁ কোর্ট রোর্ডে দেখা হত। তিনি তার স্বাভাবিক বৈকালিক ভ্রমন, আড্ডা, আলোচনা ও আসরে ছুটছেন-পদব্রজে। এখানে-সেখানে-সকাল সন্ধ্যা-বেহুদা চায়ের দোকানে নয়-চৌমুহনা কালি বাড়ির সম্মুখস্থ রামবাবুর দোকান সহ তার কিছু পসন্দের জায়গায়। ইতিপূর্বে চৌমুহনা এলাকাধীন ঘোষপট্টিতে এডভোকেট এ.এম ইয়াহিয়া মোজাহিদ এর মালিকানাধীন বই পুস্তকের দোকান-শিকড়- এ আসর বসাতেন তিনি। আমি নিজেও সেই আসরের অস্থায়ী সদস্য ছিলাম। এখন এ.এম এহিয়া মোজাহিদও নেই শিকড়ও নেই। দেখাদেখি মুখামুখি হলে মাহফুজুর রহমান এর চীরাচরিত মিষ্টি হাসি উপহার পেতাম-আমিও দিতাম। হয়ত সেই হাসি মিষ্টি হাসি হত না। গেল সপ্তাহে সগৌরবে তাকে জানিয়েছিলাম, মাহফুজ-স্মৃতি কথা শেষ। একটা বই লিখাবার কৃতিত্ব তোমার। তোমাকে ধন্যবাদ। বিনয়ী মাহফুজুর রহমান সলাজ হাসি হাসতেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথাই হয়ত আমার জীবনের শেষ গ্রন্থ হবে। হয়ত সাড়ম্ভ প্রকাশনা উৎসব হবে। আমি প্রশংসিত হব-কিন্তু এসব কিছুই দেখে যেতে পারলেন না আমার প্রিয় লেখক-প্রিয় মানুষ-¯েœহ ভাজন মাহফুজুর রহমান- কারন তিনি দরগা মহল্লার গোরস্থানে-চীরশয়ানে। তার কবরের মাটি একদিন শুকিয়ে যাবে। গজাবে ঘাস। ফুটবে নাম না জানা ঘাসফুল। একদিন তার সম্পূর্ন কবরটিই দিক চিহ্নহীন হয়ে যাবে। হয়ত স্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাবেন কথার মানুষ কাজের মানুষ মাহফুজুর রহমান। কিন্তু তিনি তার স্বজনদের মনও মননে আমাদের হৃদয়ের মনি কোঠায় উজ্জল হয়ে থাকবেন অনেকদিন। আকস্মিকভাবে অকাল প্রয়াত মাহফুজুর রহমান ¯েœহ ভাজনেষুর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান মালিক তার বেহেশত নসীব করন। এই দোয়া।
[ষাটের দশকর সাংবাদিক। মুক্তিযোদ্ধা। সিনিয়র এডভোকেট হাইকোর্ট। সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব]

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •