মৌলভীবাজারে নদী ভাঙ্গন: মনু ও ধলাইনদীতে ৪৮টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তীরবর্তী জনপদ

May 4, 2017,

ওমর ফারুক নাঈম॥ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা ধলাই নদী এবং সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া মনুনদীর তীরবর্তী ৪৮ টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে ধারণক্ষমতা না থাকায় নদী দু’টির পাড় ভেঙে পানি হানা দেয় তীরবর্তী গ্রামগুলোতে। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় নদী তীরবর্তী এলাকার রবিশষ্য ও বোরো ফসল।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর তীরবর্তী মুন্সীবাজার ইউনিয়নের বাদে করিমপুর, করিমপুর, জালালপুর, বাসুদেবপুর সুরানন্দপুর, মইর আইলপুর, রুপেসপুর, রামকৃষ্ণপুর, রামচন্দ্রপুর ও উবাহাটা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সবজি ও বোরো চাষিরা এখন দুশ্চিন্তায়। একই উপজেলার পতনঊষার ইউনিয়নের ১০-১৫টি গ্রাম ও কমলগঞ্জ পৌরসভা এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। ধলাইনদীতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে ১২ টি। প্রত্যেক বারওই এই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানিতে সবজি ও বোরো ফসল সহ সব ভাসিয়ে নিয়েছে।
একই অবস্থা মৌলভীবাজার, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া মনু নদীরও। তিন উপজেলার কয়েকটি স্থানে ভাঙন ও ছোট-বড় প্রায় ৩৬টি স্থানে ভাঙনের ঝুঁকির কারণে ক্ষতিগ্রস্থ ও হুমকির মুখে পড়েছেন নদীতীরের কয়েক হাজার স্থানীয় লোকজন। মনু নদীর ডান তীরে ১৭টি ও বাম তীরে ১৯টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে ধারণক্ষমতা না থাকায় নদী দু’টির পাড় ভেঙে পানি হানা দেয় তীরবর্তী গ্রামগুলোতে। আর এ পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায় নদী তীরবর্তী মানুষের আয়ের একমাত্র সম্বল সবজি ও বোরো ফসল।
নদী তীরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থরা জানান, জোয়ার-ভাটার মতো বেশিদিন ওই পানি আটকে থাকে না । ১-২ দিনের মধ্যেই নেমে যায় নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠা পানি। নদী দু’টির দু’কূলের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে গ্রামের পর গ্রাম, বাড়ি-ঘর আর ক্ষেত খামার ডুবিয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষতিগ্রস্থ করলেও রহস্যজনক কারণে ওই ভাঙ্গা বাঁধের মেরামত হয় না । বছরের পর বছর বাঁধগুলো থাকে একই। শুধু বর্ষা মৌসুম এলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হলে শুরু হয় হৈ চৈ। এমন অভিযোগ স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থদের।
তারা জানালেন পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকারী কর্মকর্তা আর জনপ্রতিনিধিরা শুধু ফুলঝুরির আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। এক সময় মনু আর ধলাই নদী ছিল জেলার খর¯্রােতা নদী। ওই নদী দু’টিরই উৎপত্তিস্থল ভারত। দু’পাশে ছোট বড় অসংখ্য পাহাড়ী টিলায় বেষ্টিত নদী দু’টি বয়ে গেছে জেলার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও মৌলভীবাজার উপজেলার উপর দিয়ে। নানা কারণসহ এখন নাব্যতা হ্রাসে নদী দু’টির ঐতিহ্য নেই বললেই চলে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে হাঁটু পানি, কোমর পানি আর শুকনো মৌসুমে নদী জুড়ে ধূধূ বালুচর।
নদীভাঙনের ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় গেলে বাদে করিমপুর গ্রামের নানু মিয়া, মিজান উদ্দিন, ইমান উল্লাহ, সুরান্দ গ্রামের আবদুল কাদির, কোনাগাঁও গ্রামের আরজদ মিয়া, চাম্পা বেগম, কদরুন নেছা সহ সবজিচাষিরা জানান, আমাদের এলাকা শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন রবিশস্য চাষের জন্য বিখ্যাত। জেলার মধ্যে রবিশস্যের ভান্ডার হিসেবে খ্যাত কুলাউড়া অঞ্চল কমলগঞ্জ । কিন্তু আমাদের এই ঐতিহ্য আর ধরে রাখতে পারছি না এই দুই নদীর কারণে। সংশ্লিষ্টরা নদী শাসনের উদ্যোগী না হওয়ায় প্রতিবছর কয়েকবার নদীর দু’কূলের বাঁধ ভেঙে তীরবর্তী গ্রামগুলোর সবই কেড়ে নেয়। এ বছরও সংসারের লোকজন নিয়ে খেয়ে-দেয়ে বাঁচার মতো কোনো সবজি কিংবা বোরো ধান অবশিষ্ট রাখেনি বাঁধভাঙা ওই দু’নদীর পানি।


বাদেকরিমপুর গ্রামের চাষি হারুন মিয়া ও তার স্ত্রী ছালেখা বেগম জানান একটি এনজিও সংস্থা থেকে থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তারা ৩ বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ করেছিলেন। কিন্তু এ পর্যন্ত পাঁচবারই তাদের ক্ষেত নষ্ট করে বাঁধ ভাঙা নদীর পানি। এখন ১০ জনের সংসার চলবে কিভাবে আর সপ্তাহে ৬৫০ টাকা হারে ঋণের কিস্তি দেবো কি দিয়ে।
বাসুদেবপুরের সবজিচাষি বাবুল চন্দ, প্রণয় চন্দ ও সুরানন্দ পুরের সুনু মিয়া বলেন আমার ৩ বিঘা জমি গ্রাস করেছে ধলার নদীর বাঁধভাঙা পানি। মাত্র দু’দিন থেকে ওই পানি চলে গেছে। কিন্তু পলি মাটি দিয়ে সব সবজি আর ধান কবর দিয়ে গেছে। এখন সবজি গাছগুলোরও চিহ্নি দেখা যায় না। ১৫-২০ হাজার টাকা ঋণ ধার করে ওই সবজি চাষ করেছিলাম এখন আমার সব শেষ। এখন ঋণ দেবো কি করে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায় এবছর পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় জেলায় আংশিক ও সম্পূর্ণ মিলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় ১৭ হাজার ৪শ ৩২ হেক্টর বোরো ধানের জমি। আর সবজি ৮০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে কমলগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্থ হয় ৪শ’ হেক্টর বোরো আর সবজি ৫০ হেক্টর। আর কুলাউড়ায় ৪ হাজার ৫শ’ হেক্টর বোরো আর সবজি ৩০ হেক্টর। তবে এই ক্ষয়ক্ষতি প্রতিদিনই হালনাগাদ করা হচ্ছে।
মুন্সীবাজার ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো: নওরুজ বলেন, বার বার নদীর বাঁধভাঙা স্থান দিয়ে গ্রামগুলোতে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও এখন মেরামত করা হয়নি। ওই স্থানগুলো মেরামত না করায় নতুন করে এর আশপাশ এলাকায়ও ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্থরা সরকারি তরফে প্রাপ্ত ত্রাণ সহযোগিতা পর্যাপ্ত নয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখনই ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো মেরামতের প্রয়োজন। তবে আশা করছি পানি কমতে শুরু করলে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন জেলার সবক’টি নদীর তীরবর্তী মানুষের ক্ষতি এড়াতে আর নদী বাঁচাতে ড্রেজিং আর দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ নির্মাণেরও প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com