রাজনগরে খুন! জমি নিয়ে বিরোধ সংঘর্ষ থামাতে যেয়ে প্রাণ দিলেন দুই ভাই

September 25, 2022,

ইমাদ উদ দীন॥ শোকে স্তব্দ রাজনগরের তুলাপুর গ্রাম। স্বজনদের গগণবিদারী ক্রন্দন আর আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। জমি নিয়ে প্রতিবেশী সনাতন ধর্মের দুই ব্যক্তির বয়ে চলা বিরোধ ও সংঘর্ষ থামাতে এবং অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে যেয়ে নিজেরাই প্রাণ দিলেন। ওই প্রাণঘাতি সংর্ঘষ থামল ঠিকই। কিন্তু তরতাজা আপন দুই ভাই ঘরে ফিরলেন লাশ হয়ে। চাউর হওয়া মর্মান্তিক ওই ঘটনায় পুরো জেলার মানুষই হতবাক। তাদের মৃত্যুর পর রাজনগরসহ জেলা জুড়ে আলোচনা ছিলো আপন দুই ভাইয়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে। এমন ঘটনার নজির এই অঞ্চলে খুবই কম। গ্রাম এলাকায় বিরোধপূর্ন দু’টি পক্ষের মধ্যস্থকারী শালিস বিচারককে প্রাণে মেরে ফেলা বা হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা নিকট অতীতে কখনো দেখেনি এজেলার মানুষ।
তুলাপুর গ্রামে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান ওই সংঘর্ষ ও হত্যাকান্ডের আদ্যোপ্রান্ত। জেলার রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের তুলাপুর গ্রাম। শান্তিপ্রিয় এই গ্রামটিতে কখনো এ ধরনে হানাহানির ঘটনার ঘটেনি। দুপক্ষের সালিশ বিচার করতে গিয়ে ও সংঘর্ষ থামাতে যেয়ে খুন হন তুলাপুর গ্রামের দুই যুবক যারা সম্পর্কে আপন দুই ভাই হেলাল মিয়া (৩৮) ও কাজল মিয়া (২২)। আর আহত হয়েছেন ফতেহপুর ইউনিয়নের ৩ বারের জনপ্রিয় ইউপি সদস্য লুৎফুর রহমান (৫০) সহ অন্তত ১৫ জন। এর মধ্যে গুরুতর আহত হয়ে সিলেট এমজি ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭জন।
খুনের শিকার হেলাল মিয়া ও কাজল মিয়ার বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের স্বান্তনা দিতে জড়ো হওয়া গ্রামবাসীরা জানান, শুক্রবার বিকেল আড়াইটার দিকে ঘটে পূর্বপরিকল্পিত ওই হামলার ঘটনা। তারা জানান তুলাপুর গ্রামের হোমিও ডাক্তার ধীরুদাশ প্রায় ২০ বছর আগে তুলাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব দক্ষিণ পাশে ২২ শতক শাইল শ্রেণীর জমি বিক্রি করেন পার্শ্ববর্তী বালাগঞ্জ উপজেলার শান্তি বাবুর কাছে। কিন্তু ওই ব্যক্তির কাছে বিক্রির পরও জমি দখল ছিলো ধীরুদাশের কাছে।
তিনি শর্তসাপেক্ষে (ভাগি/বর্গা হিসেবে) শান্তি বাবুর কাছে বিক্রির পরও তিনি ওই জায়গা দেখভাল ও কৃষি কাজ করতেন। ওদিকে গেল কয়েক বছর আগে ওই জায়গা শান্তি বাবু বিক্রি করেন পার্শ্ববর্তী উত্তরভাগ ইউনিয়নের সুনামপুর গ্রামের রাজু দাশের কাছে। কিন্তু রাজু দাশ ওই জায়গার দখল নিতে পারছিলেন না। ওই জায়গায় দখলে গেলে বাধা দেন ধীরু দাশ। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশ চললেও সমাধান হয়নি। শুক্রবার বাদ জুম্মা বিরোধপূর্ন ওই জায়গার পাশেই ছিলো মিমাংসার জন্য বৈঠক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান ওই দিন বিকেলে সদাপুর গ্রামের রঙ্গেশ দাশের বাড়ি থেকে খাওয়া দাওয়া শেষে রাজু দাশ ও তার ভাইয়ের নেতৃত্বে ১৫-২০ জন লোক অস্ত্রসহ গাড়ি যোগে ঘটনাস্থলে আসতে থাকে। ওই সময় রাজুর পক্ষে জায়গা বুঝিয়ে নিতে সালিশ বিচারে অংশ নিতে সাথে ছিলেন জায়গা বিক্রেতা শান্তি বাবু (শান্তি চৌধুরী), খছরু মিয়া, রঙ্গেশ দাশ ও ইসলাহ মহুরী।
এছাড়াও রাজুর পক্ষে সিলেট থেকে আসেন আরও ১২-১৫জন লোক। তারা সবাই বৈঠকের স্থানে জড়ো হয়ে বিরোধপূর্ণ ওই জায়গায় গাছ লাগাতে থাকেন। এতে ধীরু দাশের লোকজন বাধা দিয়ে গাছের চারা তুলে ফেলতে চাইলে হট্টগোলের শুরু হয়। এসময় ওই ঘটনার সালিশ বিচারক ইউপি সদস্য লুৎফুর রহমান এসে উভয়পক্ষকে নির্বিত করার চেষ্ঠা করেন। বিষয়টি বৈঠকে সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত না করে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজু দাশ ও সাথে থাকা অস্ত্রস্বস্ত্রে স্বজ্জিত রাজু দাশের ভাইসহ অন্যরা ইউপি সদস্য লুৎফুর রহমানকে বেদড়ক মারধর করতে থাকেন ও গাছের চারা লাগান। লুৎফুর রহমানকে মারধর করার হচ্ছে এমন খবর তার বাড়িতে পৌঁছালে জুম্মার নামাজ শেষ করে বাড়ি না যেয়ে নিহত দুই ভাইসহ অন্যরা ঘটনাস্থলে ছুটেন।
ঘটনাস্থলে পৌঁছার সাথে সাথে রাজু দাশ তার ভাইসহ অন্যরা চাইনিজ কুড়াল, রাম দাসহ অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপাতে থাকে। হেলাল মিয়া তার ভাই কাজল মিয়াসহ ছুটে আসা অন্যরা সংর্ঘষ থামাতে গেলে তাদেরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপানো হয়। একতরফা আক্রমণে ঘটনাস্থলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় লুৎফুর রহমানের ভাতিজা দুই ভাইয়ের। আর গুরুতর আহত হন লুৎফুর রহমান, তার ভাই সৌদি প্রবাসী পংকি মিয়া (৫৭), লুৎফুর রহমানের ছেলে জুবেল মিয়া (১৯), জুনুর মিয়া (২৩),পেমাই দাশ (৬৫), ঝলক দাশ (৩০), রাহুল দাশ (৩০)সহ অন্যরা তারা সবাই চিকিৎসাধীন। ওই সময় এলাকাবাসী ঘেরাও দিয়ে হামলাকারী ৫জনকে আটকে রেখে রাজনগর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। নিহত দুই ভাই তুলাপুর গ্রামের মৃত নুর মিয়া ও খয়রুন বিবি দম্পতির দুই ছেলে। ৪ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে হেলাল মিয়া বড় ও কাজল মিয়া সবার ছোট। হেলাল মিয়ার ছেলে হ্রদয় মিয়া ১০ম শ্রেণী ও মেয়ে সীমা বেগম ৯ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ১২-১৩ শতকের বাড়িতে বসবাস ওই শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী পরোপকারী পরিবারটি আর্থিক অনটনের মধ্যেই দিনাতিপাত। এই দুইজনের আয় রোজগার দিয়েই চলত সংসার। নিহতদের বয়োবৃদ্ধ মা খয়রুন (৬৫) বেগম বার বার মূর্চা যাচ্ছেন আর প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুই ছেলে হত্যার বিচার চাইছেন। হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি করেছেন এলাকাবাসীরা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লাশের অপেক্ষায় থাকা পরিবার ও স্বজনরা জানান লাশ বাড়িতে পৌঁছালে পারিবারিক কবরস্থানেই তাদের দাফন করা হবে। তবে পরিবারের সদস্যরা জানান এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •