সামাজিক নিরাপত্তা- প্রসঙ্গ: ব্যাংকার হত্যা

March 16, 2021, এই সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

ড. মোহাম্মদ আবু তাহের॥ ব্যাংকারদের সম্পর্কে একটি কৌতুক প্রায় সবারই জানা সেটি হচ্ছে একজন ব্যাংকারকে তার সন্তানরা কত বড় হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি দুই হাত পাশাপাশি ফাঁক করে বোঝাতে চেষ্টা করেন সন্তানের দৈর্ঘ্য। কেননা ছেলে কিংবা মেয়েকে তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় দেখার সুযোগ পান না। তাঁর অফিসে যাওয়ার সময় তিনি তার সন্তানকে ঘুমে রেখে যান। রাতে বাসায় ফেরার পরও সন্তানকে ঘুমন্ত অবস্থায়ই পান। বিষয়টি কৌতুকপ্রদ হলেও এর অনেক তাৎপর্য রয়েছে। ব্যাংকাররা দিনরাত পরিশ্রম করেন। ব্যাংকের উন্নয়নের জন্য এবং পেশার উৎকর্ষতার জন্য ছুটির দিনেও অনেক সময় ওয়ার্কশপ কনফারেন্স ইত্যাদিতে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। করোনাকালীন লকডাউনের সময়ও বাংলাদেশের ব্যাংকারদের সাহসী ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। জীবন বাজী রেখে ব্যাংকাররা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেক ব্যাংকাররা করোনায় সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। দেশের কোটি কোটি সাহসী মানুষের আশা ভরসার আস্থার প্রতীক হচ্ছে ব্যাংক ও ব্যাংক কর্মকর্তা কর্মচারী। ব্যাংক হলো যে কোন দেশের অর্থনীতির মূল প্রাণকেন্দ্র। বিশে^র প্রতিটি দেশেই ব্যাংককে ঘিরে আবর্তিত হয় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। ব্যাংকগুলো এখন সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। সামাজিক নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজে মুনাফার একটি অংশ ব্যয় করে ব্যাংকগুলো। একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা যেখানে এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেখানে ব্যাংক কর্মকর্তারা নিগৃহীত হবে, নির্যাতিত হবে, রাস্তায় মার খাবে, হত্যা করা হবে এটি কল্পনা করা যায়না। সাম্প্রতিক কালে সিলেট নগরের বন্দর বাজারে সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিকদের হামলায় এক ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত হওয়ায় সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি আরেকবার প্রশ্নবিদ্ধ হলো। ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২১ শনিবার রাত পৌনে আটটায় অগ্রনী ব্যাংক লিঃ হরিপুর গ্যাস ফিল্ড শাখাার কর্মকর্তা শেখ মওদুদ আহমদকে খুন করা হয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় হরিপুর থেকে একটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সায় নগরীর বন্দর বাজারে আসেন ব্যাংক কর্মকর্তা মওদুদ আহমেদ। সন্ধা সাড়ে সাতটার দিকে কালেক্টরেট জামে মসজিদের সামনে আসার পর অটোরিক্সা চালক নোমান হাছনুরের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে বাকবিতন্ডা হয় । এক পর্যায়ে নোমান সহ আরো কয়েকজন অটোরিক্সা চালক ব্যাংক কর্মকর্তা মওদুদ আহমদকে বেধরক মারধর করে। এক পর্যায়ে দুই ব্যক্তি ব্যাংক কর্মকর্তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এবং রাত ৯ টার আগেই মওদুদ আহমেদ মারা যান। এ নৃশংস ঘটনা প্রমান করে একটি চূড়ান্ত অবক্ষয়ের ভিতর দিয়ে চলছি আমরা। সামাজিক মূল্যবোধগুলো এক এক করে ক্ষয়ে যাচ্ছে। একটি মানুষকে মানুষরুপী নরপশুর দল সংঘবদ্ধভাবে আক্রমন করলো অথচ পথচারী অন্য মানুষরা অসহায় ব্যাংক কর্মকর্তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলো না। ক্ষয়িষ্ণু এই সামাজিক অবস্থা থেকে উত্তরনের পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সমাজ যেন প্রতিদিন পিছনের দিকে যাচ্ছে। স্বাধীন একটি জাতি হিসাবে যেখানে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা সেখানে যেন আমরা সামাজিক ভাবে পশ্চাৎগামী হচ্ছি। আলোর দিকে না গিয়ে সমাজ যেন অন্ধকারের দিকেই যাচ্ছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৩২ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, কেউ যদি কাউকে হত্যা করে সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করলো। আবার এমনিভাবে যদি কেউ একজনের প্রাণ রক্ষা করে তবে সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচিয়ে দিলো। নিষ্ঠুরভাবে মানুষ হত্যা চরম অনাবিকতাই শুধু নয় যেকোন হত্যাকান্ডই নিন্দনীয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম বলেছেন কিয়ামতের দিন মানুষ হত্যার বিচার করা হবে সবার আগে। তার পর অন্য অপরাধীর বিচার (বুখারি, মুসলিম)। পবিত্র ইসলাম ধর্মে প্রয়োজন ছাড়া গাছের একটি পাতা ছিড়তেও নিষেধ করা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মেও জীব হত্যা মহাপাপ। হাদিস শরীফে আছে “তোমরা কোন গর্তে প্রশ্রাব করোনা, এর দ্বারা কোনা পোকামাকড় বা পিপড়ে কষ্ট পাবে। আর এক হাদিসে আছে প্রয়োজনে কোন পোকামাকড় প্রাণী মারতে হলে কম কষ্ট দিয়ে দ্রুত মেরে ফেলতে হবে এবং অবশ্যই আগুনে পোড়ানো যাবে না। কারণ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আগুনে পোড়ানোর অধিকার আর কাউকে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রনা দেওয়া যাইবে না। কিংবা নিষ্ঠুর অমানুষিক বা লাঞ্চনাকর দন্ড দেওয়া যাইবে না। কিংবা কাহারো সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না। বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে নিষ্ঠুরতা নৃশংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেই চলছে। নিষ্ঠুরতার ভয়াবহতা সমাজকে ক্রমেই গ্রাস করছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে নিষ্ঠুরতা যেন একটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। একটা নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে আর পূর্বের আরেকটা নিষ্ঠুর ঘটনা মানুষ ভূলে যায়। মানুষের জানমালের হেফাজত, জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে। মানবতার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহন নিশ্চিত হইবে। পৃথিবীর কোন দেশই শতভাগ অপরাধ মুক্ত নয়। কিন্তু যে দেশে আইনের শাসন, সুশাসন ও মানবাধিকার যত বেশি সুরক্ষিত ততই অপরাধ প্রবনতা কম থাকে। প্রতিরোধের কার্যকরী ব্যবস্থা না থাকলে মানুষের মধ্যে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতা বৃদ্ধিই পেতে থাকবে। কিছু মানুষের মধ্যে পৈশাচিকতা ও বর্বরতা দিন দিন বেড়েই চলছে। অবলীলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে। যৌতুকের জন্য স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে। সম্পদের মালিকানা নিয়ে ভাই ভাইকে হত্যা করছে, ছেলে মা-বাবাকে খুন করছে। সমাজে যেন এক বিভৎসতার প্রতিযোগিতা চলছে। শুধু যে পেশাদার অপরাধী ও সন্ত্রাসীরা দেশে খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তা কিন্তু নয়। তুচ্ছ ঘটনা ও বাকবিন্ডতাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকার মওদুদকে অপরাধীরা যেভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্যে অমানুষিক নির্যাতন করলো, ঘটনার স্থানটি ছিল জনবহুল, পাশেই বন্দরবাজার পুলিশ ফাড়ি, জেলা পুলিশ সুপারের অফিস, জেলা প্রশাসকের অফিস সহ অন্যান্য অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সবসময় যেখানে অসংখ্য মানুষের চলাফেরা, সে জায়গায় একটি নিরীহ মানুষকে নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হলো অথচ কোন মানুষ এগিয়ে আসল না এটি ভাবতেও কষ্ট হয়। সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি না হলে, তাৎক্ষনিকভাবে অপরাধীদের গতিরোধের ব্যবস্থা না করলে নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি পাবে। হত্যা খুন রাহাজানি বন্ধ করতে হলে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার পাশাপাশি আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা না করলে সমাজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। অগ্রনী ব্যাংক লি: মৌলভীবাজার শাখার আরেক কর্মকর্তা প্রনজিৎ পালের নৃশংস হত্যকান্ডের বিচার পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন এখনও তার স্ত্রী সন্তানরা। ২০১৪ সালের ৩০ জুন রাত ৯ টায় মৌলভীবাজারস্ত শমসের নগরের রোডে পথচারী নিরপরাধ প্রণজিৎ পালকে সন্ত্রাসীরা নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ হত্যাকান্ডটি পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে বলে জানা যায়। বৃটিশ রাজনীতিবীদ উইলিয়াম গ্লেড ষ্টোন যথার্থই বলেছিলেন জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড অর্থাৎ বিচার প্রাপ্তিতে বিলম্ব বিচার না পাওয়ারই নামান্তর। আইন ও বিচার সংক্রান্ত বহুল কথিত এ প্রবাদ বাক্যটির উৎপত্তি বৃটেনে হলেও বিশে^র যেকোন দেশের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। স্বভাবতই বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। বিলম্বে বিচার পেলে বিচার প্রার্থীদের আর্থিক সামাজিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়। ব্যাংক কর্মকর্তা মওদুদ হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীতে অগ্রনী ব্যাংক সিলেটের অফিসার্স সমিতির উদ্যোগে মানববন্ধন হয়েছে। মানববন্ধনে সরকারি বেসরকারি প্রায় সকল ব্যাংকের অসংখ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহন করেছেন। দি সিলেট চেম্বারস অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সভাপতি আবু তাহের শোয়েব মানববন্ধনে অংশগ্রহন করে মওদুদ হত্যাকান্ডের ন্যায়বিচার দাবী করেছেন। ব্যাংকার শেখ মওদুদ আহমেদের ৪০ দিনের এক কন্য সন্তান রয়েছে। পিতৃহারা এই মেয়েটি পিতার স্নেহ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হলো। শেখ মওদুদ আহমদ হত্যার প্রধান আসামী সিএনজি অটোরিক্সা চালক নোমান হাছনুর আদালতে আত্মসমর্পন করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিতে চুড়ান্ত সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের আগেই এদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এত উন্নয়নের পরেও আমাদের সড়ক মহাসড়ক অনিরাপদই রয়ে গেলো। যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধই রয়ে গেলো। এখন আতংকের আরেক নাম ঢাকা সিলেট মহাসড়ক এবং দেশের অন্যান্য সড়ক মহাসড়ক। ব্যাংকার শেখ মওদুদ আহমেদের ৪০ দিন বয়সের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পিতৃহারা এই মেয়েটি আজীবন পিতৃস্নেহ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হলো। এটি আমাদের সামাজিক দায়। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মেয়েটির ভরণপোষনের দায়িত্ব নেওয়া সময়ের দাবি। পাশাপাশি ব্যাংকার শেখ মওদুদের পরিবারকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া, ন্যায় বিচার ব্যবস্থা করাও যৌক্তিক এবং মানবিক দাবী বলে মনে করি।
লেখক-
ব্যাংকার, কলামিস্ট ও গবেষক।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •