August 20, 2021, এই সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

প্রারম্ভিকা : আল্লাহর দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা, ধর্মনিষ্ঠা ,আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালন ,অসত্যের বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করাই হলো ১০ই মহররমের মৌলিক শিক্ষা।ইসলামিক পঞ্জিকা অনুযায়ী মহররম এর দশম দিনকে আশুরা বলা হয়।চার সম্মানিত মাসের প্রথম মাস মহররম, যাকে আরবের অন্ধকার যুগেও বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা হতো। আবার হিজরি সনের প্রথম মাসও মহররম। শরিয়তের দৃষ্টিতে যেমন এ মাসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণও অনেক দীর্ঘ। আমরা দেখতে পাই, ইতিহাসের এক জ্বলন্ত সাক্ষী এই মহররম মাস। ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাত হয় এ মাসে। শুধু উম্মতে মুহাম্মদীই নয়, বরং পূর্ববর্তী অনেক উম্মত ও নবীদের অবিস্মরণীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এই মাসে।

আশুরা কি এবং কেন?পবিত্র কোরআন-হাদিসের এ বিষয়ে কি বলছে? এবার জেনে নিন এ বিষয়ে

আশুরা শব্দের অর্থ : আরবি عاشوراء (আশুরা) বাংলা আশুরা,পদ: বিশেষ্য অর্থ: আরবি আশরা শব্দের অর্থ দশ। আর মাসের দশ তারিখ অর্থে আশুরা ।

আশুরারার শুরুর কথা ঃআশুরা মূলত একটি শোকাবহ দিন, কেননা এদিন রাসুলে কারীম সাঃ-এর দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলী (রা.) নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

      এই দিন আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছিলেন।

      এই দিনে আল্লাহ পৃথিবীর হযরত আদম (আ:) কে সৃষ্টি করেছিলেন।

      এই দিনে আল্লাহ বিভিন্ন নবীদেরকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন।

      এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ:)-এর শত্রু ফেরাউনের বাহিনীকে নীল নদে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। মুসা (আ.) এর উপর তাওরাত নাজিল হয়েছিল ।

      এই দিনে নূহ (আ:)-এর জাহাজ ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিলএবং তিনি জুডি পর্বতশৃঙ্গে নোঙ্গর ফেলেছিলেন।

      এই দিনে আল্লাহ দাউদ (আ:)-এর তাওবা কবুল করেছিলেন।

      এই দিনে নমরুদের অগ্নিকু- থেকে ইব্রাহীম (আ:) উদ্ধার পেয়েছিলেন।

      আল্লাহর নবী হযরত আইয়ুব আ. ১৮ বছর পর দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন।

      এই দিনে আল্লাহ ঈসা (আ:)-কে ক্রুশবিদ্ধ দশা থেকে চতুর্থ আসমানে তুলে নিয়েছিলেন।

      এই দিনে কেয়ামত সংঘটিত হবে।

      এই দিনে দশজন নবী মুক্তি লাভ করেছিলেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

      এই দিনে হযরত ইদরীস (আ.) কে আকাশে উত্থিত করেছেন ।

      এই দিনে হযরত ইউসুফ (আ.) কে ফিরিয়ে এনেছেন হযরত ইয়াকুব (আ.) এর কাছে।

      এই দিনে হযরত ইউনুস (আ.) কে মাছের পেট হতে আল্লাহ তা’লা উদ্বার করেছেন।

      এই দিনে হযরত সুলাইমান (আ.) কে আল্লাহ তা’লা সা¤্রাজ্য ফিরিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন ।

      এই দিনে হযরত জিবরাইল (আ.) কে আল্লাহ তা’লা রহমত সহ প্রেরন করেছিলেন।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিন্য়া আগমন করেন, তখন তিনি মদিনাবাসীকে এমনভাবে পেলেন যে, তারা একদিন সওম পালন করে অর্থাৎ সে দিনটি হল ‘আশুরার দিন। তারা বলল, এটি একটি মহান দিবস। এ এমন দিন যে দিনে আল্লাহ্ মূসা (আঃ)-কে নাজাত দিয়েছেন এবং ফির‘আউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর মূসা (আঃ) শুকরিয়া হিসেবে এদিন সওম পালন করেছেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের তুলনায় আমি হলাম মূসা (আঃ)-এর অধিক নিকটবর্তী। কাজেই তিনি নিজেও এদিন সওম পালন করেছেন এবং এদিন সওম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।(বুখারি-৩৩৯৭, মুসলিম-১১৩৯)

মহররমের ফজিলত : নামকরণ থেকেই প্রতীয়মান হয় এ মাসের ফজিলত। মহররম অর্থ মর্যাদাপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ। যেহেতু অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রহস্যময় তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এ মাসকে ঘিরে, সঙ্গে সঙ্গে এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল, এসব কারণেই এ মাসটি মর্যাদাপূর্ণ। তাই এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে মহররম বা মর্যাদাপূর্ণ মাস। মহররম সম্পর্কে (যা আশহুরে হুরুমের অন্তর্ভুক্ত তথা নিষিদ্ধ মাস) পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-

‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২। যেদিন থেকে তিনি সব আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর সম্মান বিনষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সুরা তাওবা : ৩৬) অর্থাৎ সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে আল্লাহ তায়ালা ১২টি মাস নির্ধারণ করে দেন। তন্মধ্যে চারটি মাস বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। ওই চারটি মাস কী কী? এর বিস্তারিত বর্ণনা, হাদিসে উল্লিখিত হয়েছে,

আবূ বাকর (রাঃ) কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, আল্লাহ যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেন সেদিন যেভাবে যামানা ছিল তা আজও তেমনি আছে। বারমাসে এক বছর, তার মধ্যে চার মাস পবিত্র। যার তিন মাস ধারাবাহিক যথা যিলকাদ, যিলহাজ্জ ও মুহররাম আর মুযার গোত্রের রাজব যা জামাদিউসসানী ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী।

কারবালা সংশ্লিষ্ট ইতিহাস :

কারবালার অবস্থান : কারবালা (আরবি: كربلاء‎‎; কারবালা আল-মুকাদ্দাসা বলেও উল্লেখ করা হয়) ইরাকের অন্তর্গত একটি শহর। এটি বাগদাদের ১০০ কি.মি (৬২ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। শহরটি কারবালা প্রদেশের রাজধানী।

মুসলিম উম্মাহর কাছে আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। কারবালা প্রান্তরে (৬১ হিজরির ১০ মুহাররম) মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ ‘আশুরা’কে আরো গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যম-িত করেছে। ফলে কারবালা ও কারবালা সংক্রান্ত ইতিহাস জরুরি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

হিজরী ৪০ সালের ১৭ই রমজান শুক্রবার হজরত আলী (রা:) ৬৩ বৎসর বয়সে আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম নামক আততায়ীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি ৩ পুত্র রেখে যান-ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (বিবি ফাতেমার গর্ভে) এবং মোহাম্মদ হানাফিয়া ইবনে আলী (২য় স্ত্রীর গর্ভে)।

ইমাম হাসান (রা:) কারবালার যুদ্ধের আগেই মৃত্যু মুখে পতিত হন (বিষ পানে)। মোহাম্মদ হানাফিয়া ঐ সময়ে জীবিত ছিলেন; কিন্তু ইমাম হোসাইনের সঙ্গে কারবালায় ছিলেন না। কাতিবে ওহী আমীরে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেলে ইয়াজিদ সমস্ত রাজ্যের (মদিনা, সিরিয়া, কুফা) ইত্যাদি শাসনভার গ্রহণ করে, তখন ইমাম হোসাইন মদিনায় ছিলেন।  ইয়াজিদের শাসনভার গ্রহণের বিষয়ে তৎকালীন সময়ের অধিকাংশ সাহাবা একমত ছিলেন না।  অনেকটা অস্ত্রের জোরে সে মুসলমানদের ক্ষমতা দখল করে।

ইয়াজিদ মদিনার গভর্নরের মারফত, ইমাম হোসাইন (রা:)কে এজিদের আনুগত্য স্বীকার করতে বলেন। কিন্তু হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৌহিত্র, আদরের নাতি, একজন সাচ্চা ঈমানদার হয়েএকজন ইসলাম বিরোধী, জুলুমবাজ শাসকের আনুগত্য করা কী সম্ভব ? স্বাভাবিক ভাবে তিনি আনুগত্যে রাজী হয়নি।

তখন ইয়াজিদ মদিনার গভর্নরকে নির্দেশ দেন, বাইয়াত গ্রহণ না করলে ইমাম হোসাইনকে কারাগারে নিক্ষেপ করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে। মদিনার গভর্নর তখন ভীষণ বিপদে পড়ে যান। তিনি কিভাবে প্রিয় নবীজির নাতীকে কারাগারে নিক্ষেপ করবেন? তিনি তখন হজরত ইমাম হোসাইনকে অনুরোধ করেন মদিনা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে।  ইমাম হোসাইন বাধ্য হয়ে তখন মক্কায় হিজরত করেন। এহেন অবস্থায় কুফাবাসী চিঠির পর চিঠি দিয়ে ইমাম হোসাইনকে কুফা যাওয়ার অনুরোধ জানান এবং ভরসা দেন যে, তিনি কুফা গেলেই সকলে তার বাইয়াত গ্রহণ করবেন।

এভাবে প্রায় দেড়শত চিঠি পাওয়ার পর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিজের চাচাত ভাই হজরত ইমাম মুসলিম ইবনে আকিলকে তিনি কুফায় পাঠান। কুফাবাসী তাকে পেয়ে অত্যন্ত খুশি হন এবং তার হাতে ইমাম হোসাইন (রা:) এর পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করা শুরু করেন।

মুসলিম ইবনে আকিল এতে অত্যন্ত খুশি হয়ে বাইয়াত গ্রহণের বর্ণনা দিয়ে, হজরত ইমাম হোসাইন (রা:)কে স্বপরিবারে কুফা আসার জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠান। হজরত ইমাম হোসাইন (রা:) তখন পরিবারবর্গকে নিয়ে (৭২ জন সদস্য) কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

এদিকে, ধূর্ত ইয়াজিদ কুফার গভর্নরকে পরির্তন করে সেখানে উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে নতুন গভর্ণর করেন-সে ছিল হিংস্রতা, নির্মমতার এক জ্বলন্তপ্রতীক।

ইবনে যিয়াদ কুফায় এসে হজরত মুসলিম ইবনে আকিলকে শহীদ করেন এবং ৪ হাজার দুর্দান্ত সৈন্য দ্বারা কারবালাকে ঘিরে রাখেন, যাতে করে হজরত ইমাম হোসাইন (রা:) কুফা যেতে না পারে অর্থাৎ কারবালায় তাঁবু ফেলতে বাধ্য হন। যেদিন ইমাম মুসলিম (রা.)-কে শহীদ করা হয় সেদিন ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী পুত্র, ভাই ভাজিতা এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ প্রায় ৮৩/৭৪ জনের একটি

কাফেলা নিয়ে মক্কা শরীফ থেকে কুফার দিকে রওয়ানা দিলেন।হজরত ইমাম হোসাইন (রা:) ৬০ হিজরির জিলহজ্ব মাসের শেষের দিকে রওয়ানা হয়ে, ৬১ হিজরী মুহাররম মাসের ৮ তারিখে কারবালার প্রান্তরে পৌঁছেন। পথে সংবাদ পেলেন চাচাত ভাই ইমাম মুসলিমকে

শহীদ করে দিয়েছে ইবনে যিয়াদ। ইমাম হুসাইন (রা.) পিছপা হলেন না, সম্মুখে অগ্রসর হয়ে কুফা থেকে দু-মঞ্জিল দূরে কারবালা প্রান্তরে উপনীত হলেন। এখানে পৌঁছামাত্র হুর বিন ইয়াজিদ একহাজার সৈন্য বাহিনী নিয়ে ইমামের পথরুদ্ধ

করলেন। যথারীতি সম্মানপূর্বক আবেদন জানালেন, জনাব কুফার নতুন গভর্নর ইবনে যিয়াদ আপনাকে গ্রেফতার করে তার নিকট নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে পাঠিয়েছে। ইমাম সাহেব বললেন, কেন? হুর বললেন, আপনি নাকি জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করেছেন। ইমাম হুসাইন (রা.) বললেন, কুফাবাসী আমাকে অসংখ্য চিঠি দিয়েছে এখানে আসার জন্য। আমি শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে চিন্তা করে এখানে এসেছি। কুফাবাসী যদি বেঈমানী করে তবে আমি স্বস্থানে ফিরে যেতে চাই। হুর ছিলেন ইমাম হুসাইন ও আহলে বাইতের প্রতি অনুরক্ত। সে বলল, হুজুর দিনের বেলায় আপনি আমার সাথে আলোচনা চালিয়ে যান। আর রাতের বেলায় আপনি আপনার সঙ্গীদের নিয়ে চলে যাবেন। ইবনে যিয়াদকে যা বলার আমি বলব।কথামত রাত্রি বেলায় ইমাম সাহেব কাফেলাকে রওয়ানা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সারারাত চলতে চলতে ভোর বেলায় কাফেলা স্বস্থানেই ফিরে আসলো। হুর বললেন, ব্যাপার কি? কাফেলার পক্ষ থেকে জানানো হলো আমরা বলতে পারি না কিভাবে এখানে আসলাম। হুর বললেন, ঠিক আছে আজও আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব। রাতে আপনি চলে যাবেন। কিন্তু পরবর্তী দুরাত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। তখন ইমাম হুসাইন (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন এ স্থানের নাম কি? পথিক বললেন এস্থানের নাম ‘কারবালা’। ইমাম হুসাইন (রা.) বললেন আমার নানাজান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে স্থানকেআমার শাহাদাতগাহ বলে ঘোষণা দিয়েছেন আমি কিভাবেসেখান থেকে ফিরে যাব। সঙ্গীদের তাবু

খাটানোর নির্দেশ দিলেন। এদিকে ইবনে যিয়াদ এক দলের পর অন্যদল সৈন্য পাঠাতে লাগলো। সবাই এসে ইয়াজিদের বশ্যতা স্বীকার করার ঘোষণা দিল। ইমাম হুসাইন (রা.) তা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করলেন। অন্য কোনো উপায়ান্তর না দেখে ইমাম হুসাইন (রা.) ইয়াজিদ

বাহিনীর কাছে তিনটি প্রস্তাব দিলেন।

১. আমি মদীনা থেকে এসেছি, আমাকে মদীনায় ফিরে যেতে দেওয়া হোক।

২. অথবা কোনো গভর্নর নয়, স্বয়ং ইয়াজিদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হোক।

৩. অথবা, কোনো সীমান্তের দিকে আমাকে যেতে দেওয়া হোক।

সেনাপতি আমর ইবনে সাদ প্রস্তাবগুলো ইবনে যিয়াদের কাছে পাঠিয়ে দিল। ইবনে যিয়াদ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং কঠোর ভাষায় বলে দিল, আমি তোমাকে ইমাম হুসাইনের সাথে সন্ধিস্থাপনের জন্য পাঠাইনি। সোজা কথা ইমাম হুসাইন ইয়াজিদের বশ্যতা স্বীকার করলে সম্মানের সহিত তাঁকে আমার কাছে নিয়ে আস। নতুবা মাথা কেটে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।

তারপর শুরু হল অবরোধ। আহলে বায়াতের জন্য ফোরাত নদীরপানি বন্ধ করে দিল ইয়াজিদ বাহিনী। ৮০-৮২জন নিরস্ত্র ঈমানদার নবী বংশের পুত-পবিত্র ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ২০-২২ হাজার সশস্ত্র বাহিনী রণসাজে সজ্জিত হয়ে যুদ্ধের আহ্বান করলো। কারবালার ময়দানে প্রিয় নবীজির পবিত্র বংশধর ও তাঁদের সঙ্গীদের জন্য ফোরাত নদীর পানি পানে নিষেধাজ্ঞা ছিল জুলুমের উপর জুলুম। পানির অভাবে তাঁবুর ভেতর শিশুরা কি যে আর্তনাদ করেছিল আমাদের

জাতীয় কবির ভাষায় তা ফুটে উঠেছে এভাবে-

গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা

আম্মা গো, পানি দাও, ফেটে গেল ছাতি, মা

শেষপর্যন্ত নিষ্পাপ শিশুদেরকে মার স্তনে দুধ না থাকায় জিহবা চুষতে দেওয়া হয়। কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই লিখেছেন-

মার স্তনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়পায়,

জিভ চুষে কচি জান থাকে কিরে ধড়টায়?

তারপর ইমাম হুসাইন (রা.) ইয়াজিদ বাহিনীর সামনে এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দিলেন, কিন্তু এতেও তারা শান্ত হল না।

তারা যুদ্ধের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। ১০ মহররম ইমাম হুসাইন (রা.) সঙ্গীগণকে বললেন, বিরোধীরা শুধু আমাকে চায়। আমি তোমাদের উপর সন্তুষ্ট আছি। তোমরা চলে যাও নিরাপদ আশ্রয়ে। জবাবে তারা বললেন আমরা কখনও আপনাকে এ মহামসিবতে রেখে ছেড়ে যাব না। আমাদের প্রাণ গেলেও আমরা আপনার সঙ্গ ছাড়বো না। এবার ইমাম হুসাইন (রা.) বললেন, তাহলে আমার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর। তোমাদেরকে আরও অধিক ধৈর্য ধারণ করতে হবে। বাতিলের বিরুদ্ধে শিশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত ভিত্তির উপর দাড়িয়ে শত জুলুম অত্যাচার সহ্য করার মত মন-মানসিকতা তৈরি করতে হবে। জেনে রাখ, বাতিলের মোকাবিলা করা আমাদের জন্য বিরাট একটি পরীক্ষা। এ অগ্নি পরীক্ষায় নবী পরিবারও নবীপ্রেমিকরা উত্তীর্ণ হতে হবে। আল্লাহ-রাসুল ও সত্যের পথে থাকতে হবে অটল অবিচল।

প্রিয়  সাথীরা, তোমরা এখন বিশ্রাম নাও। সকাল বেলা আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হবে। সবাই বিশ্রামে যাওয়ার পর ইমাম হুসাইন (রা.)ও কুরআন তিলাওয়াত করতে ঘুমিয়ে গেলেন। স্বপ্নে দেখলেন তাঁর নানাজান রাহমাতুল্লিল আলামিন তাশরীফ এনেছেন এবং তাঁকে কোলে নিয়ে বুকে হাত

মোবারক রেখে এরশাদ করলেন-

আল্লাহুম্মা আতিনা হুসাইনা ছাবরাও ওয়া আজরা। অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমার হুসাইনকে ধৈর্য ও পূন্য দান কর।’

বাদ ফজর এ স্বপ্নের কথা তিনি সঙ্গীদের বললেন এবং কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। ভোর হতে না হতেই ইয়াজিদ বাহিনীর লাফালাফি শুরু হয়েগেল। তারা ইমাম হুসাইন (রা.)-র তাঁবুর নিকটে এসে তীরনিক্ষেপ করতে লাগলো। ইমাম হুসাইন (রা.) জিহাদেরপ্রস্তুতি নিলেন। শুরু হল পৃথিবীর একমাত্র অসম যুদ্ধ। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গীসাথী একে একে ৫০ জন ঈমানদার ব্যক্তিগণ বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে ইয়াজিদ বাহিনীর অনেককেজাহান্নামে পাঠিয়ে তারাও শাহাদাতের সুধা পান করলেন।

তারপর নবী বংশের পুত পবিত্র ব্যক্তিদের যুদ্ধের ময়দানেযাওয়ার পালা। এমন সময় হঠাৎ ইমাম হুসাইন (রা.) ইয়াজিদবাহিনীর সামনে গিয়ে এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দিলেন। এতে হুরবিন ইয়াজিদের মনে আহলে বায়াতের মহব্বত উথলে উঠলো।তিনি ইয়াজিদ বাহিনী ত্যাগ করে আহলে বায়াতের পক্ষেচলে আসলেন। ইমাম সাহেবের অনুমতি নিয়ে যুদ্ধের ময়দানেগিয়ে শহীদ হলেন। হুরের শহীদ হওয়ার পর চাচাত ভাই

আব্দুল্লাহ বিন আকিল (রা.), তারপর আপন ভাতিজা আব্দুল্লাহবিন হাসান (রা.) যুদ্ধের ময়দানে বীর বেশে যুদ্ধ করতে করতে

শহীদ হলেন।তারপর ইমাম হুসাইন (রা.)-র খেদমতে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতিনেওয়ার জন্য আসলেন হযরত কাসিম (রা.)। যাঁর সাথে ইমাম

হুসাইন (রা.)-র মেয়ে সখিনাকে নিকাহ দেওয়ার আগাম ওয়াদাছিল। কাসেমকে বললেন, দেখো বাবা, আমার ভাই হযরত

হাসান (রা.)-র আশা ছিল সখিনাকে তোমার সাথে বিবা দেওয়ার। আমি তোমাকে কিভাবে যুদ্ধের ময়দানে পাঠাই।হযরত কাসিম বললেন, চাচাজান, আমার আব্বা আমাকে ওসীয়তকরেছেন যে, যদি আপনি কোনো দিন কোনো মসিবতে পড়েনতাহলে আমার প্রাণ দিয়ে হলেও আপনাকে সাহায্য করতাম।চাচা আমি এ দুনিয়ার মায়া চাই না। আমাকে দোয়া দিয়েবিদায় দেন। আমি জান্নাতে গিয়ে আমার আব্বাকে বলব,আব্বা আমি আপনার ওসীয়ত পুরণ করেছি। হযরত কাসিম ইয়াজিদবাহিনীর জাদরেল অনেক যোদ্ধাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে

দিয়ে শাহাদাতের অমীয় সুরা পান করলেন।চার ভাতিজার পর আপন বোন সৈয়দা জয়নব (রাদ্বি.)-র দু-ছেলে মুহাম্মদ ও আউনকে বোনের পীড়াপীড়িতে যুদ্ধেপাঠালেন। তারাও অনেকক্ষণ লড়াই করে শহিদি দরজা লাভকরলেন। তারপর ছয় মাসের দুগ্ধশিশু আলী আছগরের জন্য পানিআনতে গিয়ে হযরত আব্বাস (রা.) শহিদ হলেন। এবার ইমামহুসাইন (রা.)-র ছেলে হযরত আলী আকবর (রা.) যুদ্ধের অনুমতি

প্রার্থনা করলেন। যিনি ছিলেন আপাদমস্তক রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নমুনা। আব্বার কাছথেকে যুদ্ধের অনুমতি নিয়ে ময়দানে গিয়ে একটি শের পাঠকরলেন-

আনা আলী ইবনুল হুসাইন ইবনু আলী

নাহনু আহলিল বাইতে আউলা বিন্নবী।

অর্থাৎ আমি আলী আকবর, হুসাইনের ছেলে যে হুসাইন আলীমুরতাদ্বার বংশধর। আমরাই হলাম আহলে বায়াত, রাসুলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় বংশধর।

কোনো কোনো ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায়, হযরত আলী আকবর(রা.) প্রায় ৮০জন ইয়াজিদ বাহিনীর সৈন্যকে চিরজাহান্নামে নিক্ষেপ করে নিজে শহীদ হয়ে গেলেন।এবার আসলো ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পালা। ইমাম হুসাইন(রা.) তাঁবুতে গিয়ে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। বোনজয়নবকে ও অসুস্থ ছেলে ইমাম জয়নুল আবেদীন (রা.)-কে কিছুউপদেশ দিয়ে রাসুলে পাকের দেওয়া পাগড়ী মোবারক শিরে বাঁধলেন।হযরত হামযা (রাদ্বি.)-র ঢাল পিঠ মোবারকে রাখলেন, বড় ভাই ইমাম হাসান (রা.)-র কোমর বন্ধ নিজ কোমরে বাঁধলেন এবং

স্বীয় আব্বাজান শেরে খোদা হযরত আলী-র দেওয়া তলোয়ার ‘জুলফিকার’ হাতে নিলেন। আহলে বায়াতের নারী ও শিশুদেরকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হলেন। যুদ্ধ শুরু হল। শেরে খোদা হযরত আলীর (রা.) জুলফিকারের আঘাতে ইয়াজিদ বাহিনী মেষের পালের মত পালাতে লাগলো। যে জুলফিকার সম্পর্কে বদরের যুদ্ধের দিন গাইবী নেদা এসেছিল

লা-ফাতা ইল্লা আলীয়ুলা-সাইফা ইল্লা জুলফিকারু।

অর্থাৎ আলীর মত যেমন কোন যুবক নেই, তেমনি জুলফিকারের মত কোনো তলোয়ার নেই।’

ইমাম হুসাইন (রা.) ইয়াজিদ বাহিনীর মাথা কেটে কেটে লাশের স্তুপ বানিয়ে দিলেন। অপর দিকে শত্রুরা তাঁর পবিত্র বদনে বৃষ্টির মত তীর বর্শা

নিক্ষেপ করতে করতে তাঁকে রক্তে রঞ্জিত করে দিল। আঘাতের পর আঘাত সহ্য করতে না পেরে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) ঘোড়া

থেকে জমিনে পড়ে গেলেন। সীমারের নির্দেশে জাহান্নামী সেনান ইবনে আনাস নখয়ী হযরত ইমাম হুসাইন (রাদ্বি.)-এর

মাথা মোবারক কেটে শরীর মোবারক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। জাতীয় কবি নজরুলের একটি উক্তি, বেটাদের লোহু-রাঙা পিরহান হাতে, আহ্-আরশের পায় ধরে কাঁদে মাতা ফাতেমা।

আহ কি করুণ অবস্থা। প্রত্যক্ষদর্শিদের বর্ণনা মতে, ইমাম হুসাইন (রা.)-র শরীর মোবারকে ৩৪টি বর্শার ছিদ্র, ৪০টি তলোয়ারের আঘাত এবং ১২১টি তীরের জখম ছিল। তবে ইতিহাসে এ সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। কারবালার রক্তাক্ত ইতিহাস থেকে আমরা সত্যমিথ্যার

মানদ- সংগ্রহ করতে পারি। হকের পক্ষে বাতিলের বিপক্ষেঅবস্থান নেওয়ার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে জাগরুক থাকবে কারবালা ময়দান।

কত মোহররম এলো, গেল চলে বহুকাল

ভুলি নি গো আজো সেই শহীদের লোহ্ লাল।

এদিকে ইয়াজিদের সৈন্য দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেখানে তাঁবু ফেলতে বাধ্য হন তিনি।  ইয়াজিদের সৈন্য বাহিনী ঘোষণা করে আনুগত্য স্বীকার করুন, নতুবা যুদ্ধ করুন। হজরত ইমাম হোসাইন (রা:)তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করাই শ্রেয় মনে করলেন।

আশুরার দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একে একে ৭১ জন শহীদের লাশ ইমাম হোসাইন (রা.) কাঁধে বয়ে তাঁবুতে নিয়ে এলেন। এরপর নিজে লুটিয়ে পড়লেন যুদ্ধ করতে করতে।শত্রু রা হজরত জয়নাবসহ রুগ্ন শিশু, পুত্রহীনা ও বিধবা সর্বমোট ১২ জনকে এক শেকলে বেঁধে শেকলের এক মাথা হজরত জয়নুল আবেদিনের বাহুতে বেঁধে এবং অন্য মাথা হজরত জয়নাবের বাহুতে বেঁধে দেয়।ইয়াজিদ তাদের তপ্ত মরুতে এখানে-সেখানে, হাটে-বাজারে ঘুরিয়েছে, যাতে দুনিয়াবাসী জানতে পারে ইয়াজিদ বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ যদি ইমাম হোসাইনের পরিবারকে বন্দি না করত, তাদের নিয়ে বিজয় মিছিল না করত, তাহলে হয়তো ইমাম হোসাইনের শাহাদতের বিজয় কারবালার উত্তপ্ত ধুধু ধূলিকণার সঙ্গে উড়ে বেড়াত।

নবী পরিবারকে বন্দি অবস্থায় কুফা থেকে শত শত মাইল দূরে সিরিয়ায় মুয়াবিয়ার সবুজ রাজপ্রাসাদে আনা হল। কিন্তু হজরত জয়নাব এত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার পরও ইয়াজিদের দরবারে এমন সাহসী ভূমিকা রাখলেন যে, পুরো দরবার কেঁপে উঠল।

তার ভাষণ শুনে উপস্থিত সবাই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। ইয়াজিদও নিশ্চুপ হয়ে গেল। হজরত জয়নাবের তেজস্বী বক্তব্যে সিরিয়ায় বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখে চতুর ইয়াজিদ তার কৌশল বদলাতে বাধ্য হল। বন্দিদের সসম্মানে মদিনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করল।

ইয়াজিদ তার প্রতিনিধি ইবনে জিয়াদকে কী নির্দেশ দিয়েছিল তা অপ্রকাশিত। কিন্তু ইবনে জিয়াদ যে ঘৃণ্য-জঘন্য কাজ করেছিল তাতে ইয়াজিদের পূর্ণ সমর্থন ছিল, তা তার পরবর্তী কার্যক্রমে প্রকাশ পেয়েছিল। কারবালার ঘটনা শুনে ইয়াজিদ অনুতপ্ত মনে দুঃখ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেসবই ছিল ভণিতাপূর্ণ। মুখে একরকম বললেও কাজ করেছিল বিপরীত।

সে শহীদগণের মস্তক মোবারকগুলোকে রাতে রাষ্ট্রীয় ভবনের শাহি দরজায় টাঙ্গানোর জন্য এবং দিনে দামেস্কের অলি-গলিতে ঘুরানোর নির্দেশ দিয়েছিল। তার নির্দেশ মতো মস্তক মোবারক দামেস্কের অলি-গলিতে ঘুরানো হয়েছিল।

এতে প্রমাণিত হয়েছে, ইয়াজিদ ভণিতাপূর্ণ দরদমাখা কথাবার্তা বলেছিল, যাতে লোকজন তার বিরুদ্ধে চলে না যায় এবং লোকেরা যেন মনে করে, সে এ ধরনের আচরণ করার পক্ষপাতি ছিল না।

কিন্তু ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে এটি পরিষ্কার হয়ে যায়, হজরত আলী (রা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত ইমাম হাসান (রা.) কে বিষপানে শহীদ করা, কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও রাসূল (সা.)-এর পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে নিঃসংকোচে হত্যা করা সবই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিল।

আশুরার রোজা :মহররম মাসে রোজা রাখা সম্পর্কে অনেক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন ওপরে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বিশেষভাবে আশুরা, অর্থাৎ মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। একটি হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর ফরজ ছিল। পরবর্তী সময়ে অবশ্যই ওই বিধান রহিত হয়ে যায় এবং তা নফলে পরিণত হয়।

হাদিস শরিফে হজরত জাবের (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে- ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। এ বিষয়ে নিয়মিত তিনি আমাদের খবরাখবর নিতেন। যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন আশুরার রোজার ব্যাপারে তিনি আমাদের নির্দেশও দিতেন না এবং নিষেধও করতেন না। আর এ বিষয়ে তিনি আমাদের খবরাখবরও নিতেন না।

(মুসলিম শরিফ-১১২৮)

ওই হাদিসের আলোকে আশুরার রোজার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতীয়মান হয়। এমনকি ওই সময়ে তা ফরজ ছিল। বর্তমানে এই রোজা যদিও নফল, কিন্তু অন্যান্য নফল রোজার তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুল (সা.) আশুরা ও রমজানের রোজা সম্পর্কে যেরূপ গুরুত্ব প্রদান করতেন, অন্য কোনো রোজা সম্পর্কে সেরূপ গুরুত্বারোপ করতেন না। (বুখারি ও মুসলিম)

হজরত হাফসা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) চারটি কাজ কখনো ছেড়ে দিতেন না। তার মধ্যে একটি আশুরার রোজা। (নাসায়ি শরিফ)

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বর্ণনা করেন, আশুরার দিন ইহুদিরা ঈদ পালন করত। রাসুল (সা.) সাহাবিদের সেদিন রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন। (বুখারি-২০০৫, মুসলিম-১১৩১)

হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে একটি হাদিস বর্ণিত আছে, জাহিলিয়াতের যুগে কাফেররা আশুরার দিন রোজা রাখত। তাই রাসুল (সা.) ও সাহাবায়েকেরামও সেদিন রোজা রাখতেন; কিন্তু যখন রমজানের রোজা ফরজ হয়, তখন তাঁদের রোজা রাখা না রাখার ব্যাপারে স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। (মুসলিম-১১৩৬) এখানে একটি প্রশ্ন জাগে, কাফেররা অন্ধকার যুগে আশুরার দিন রোজা রাখত কেন? এর উত্তর এটা হতে পারে যে তারা প্রতিবছর মহররমের ১০ তারিখে কাবা শরিফকে গেলাফ পরিধান করাত। যেমনটি বুখারি শরিফে রয়েছে (হাদিস নম্বর : ১৫৮২)

হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে, কিন্তু এর পরও প্রশ্ন রয়ে যায়, তারা গেলাপ পরিধান করানোর জন্য ওই দিনকে কেন নির্দিষ্ট করেছিল? এ প্রশ্নের উত্তর (এবং প্রথম প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তর) দিতে গিয়ে বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত ইকরামা (রা.) বলেন- অন্ধকার যুগে কাফেররা একটি অনেক বড় অপরাধ (তাদের দৃষ্টিতে) করে বসে। তাদের বলা হলো, তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো, তাহলে তোমাদের গুনাহ মাফ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন থেকে কোরাইশ বংশের লোকেরা সেদিন রোজা রাখতে শুরু করে। (ফতহুল বারি খ.-৪ পৃ.-৭৭৩)

আশুরার রোজার ফজিলত : রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রোজা নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতকে রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাই এর পূর্ণ অনুসরণ ও আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে উম্মতের কল্যাণ। এ ছাড়া অসংখ্য হাদিসে আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকটি হাদিস শুনি- ‘হজরত আবু কাতাদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.)-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়। (মুসলিম-১১৬২)।

‘রাসুল (সা.) বলেন- ‘রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা আল্লাহর মাস মহররমের আশুরার রোজা।’ (সুনানে কুবরা-৪২১০)

আশুরার রোজা ও ইহুদি সম্প্রদায় : মুসলিম শরিফে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত- ‘মহানবী (সা.) যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি-নাসারারা তো এই দিনটিকে বড়দিন মনে করে। (আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি, তাহলে তো তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে। তাদের প্রশ্নের উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, ‘তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে) আগামী বছর ইনশাআল্লাহ আমরা এই ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করব। (মুসলিম-১১৩৪)

আশুরার দিনে অন্য একটি আমল : ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে আপন পরিবার-পরিজনের মধ্যে পর্যাপ্ত খানাপিনার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহপাক পুরো বছর তার রিজিকে বরকত দান করবেন। (তাবরানি : ৯৩০৩)

উল্লিখিত হাদিস সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল জাওযিসহ অনেক মুহাদ্দিস আপত্তিজনক মন্তব্য করলেও বিভিন্ন সাহাবি থেকে ওই হাদিসটি বর্ণিত হওয়ায় আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতিসহ অনেক মুহাক্কিক আলেম হাদিসটিকে গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। (জামিউস সগির-১০১৯)

অতএব যদি কেউ উপরোক্ত হাদিসের ওপর আমল করার উদ্দেশ্যে ওই দিন উন্নত খানাপিনার ব্যবস্থা করে, তাহলে শরিয়তে নিষেধ নেই। তবে স্মরণ রাখতে হবে, কোনোক্রমেই যেন তা বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনের স্তরে না পৌঁছে।

যবনিকা : হজরত ইমাম হোসাইন (রা:) অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তগ্রহন করেন এবং যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনা সত্য-সুন্দর প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী চেতনাকে সমুজ্জ্বল করে রেখেছে, কারবালার শহীদানের স্মৃতি যুগ যুগ ধরে মানব জাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চিরদিন প্রেরণা জুগিয়ে আসবে।

লেখক : মাওলানা মো: আব্দুল মোক্তাদির হোসাইন সিদ্দিকী, প্রভাষক (ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি) জগৎসী জি.কে.এম.সাইফুর রহমান কলেজ , মৌলভীবাজার

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •