
বিকুল চক্রবর্তী॥ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল কালীঘাট চা বাগানে বৈঠক শেষে বিভিন্ন নেতাদের আপত্তির মূখে নিজে চা শ্রমিক অধিকার পরিষদের আহব্বায়ক হিসেবে ঘোষনা দেন চা শ্রমিকদের অধিকার আদায় নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া মোহন রবিদাস। এদিকে তার এ ঘোষনায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেন, চা শ্রমিকদের অধিকার আদায় নয় মোহনের উদ্দেশ্য নেতা হওয়া।
এদিকে বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের ৯২টি চাবাগান বন্ধ রেখে আন্দোলন চালিয়ে যান চা শ্রমিকরা।
বুধবার রাত ১২টার পর মোহন রবিদাস তার ফেইসবুক প্রেইজে লাইভে গিয়ে কালীঘাট চা বাগানে ২৫ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় বৈঠকে অংশনেয়ার জন্য সকল পঞ্চায়েত প্রধানদের আমন্ত্রন জানান এবং বৈঠক শেষে বিকেল ৪টায় প্রেস ব্রিফিং করার কথা বলেন। তবে এ প্রেস ব্রিফিং বা বৈঠকের কোন আমন্ত্রন মৌলভীবাজার বা শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সভাকরে শেষ করেন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মোহন রবিদাস সাথে আরো কয়েকজন চা শ্রমিককে নিয়ে প্রেস বিফ্রিংএ আসেন।
প্রেস ব্রিফিংএ মোহন রবিদাস বলেন, বন ও পরিবেশমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন শনিবারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটা সিন্ধান্ত আসবে তাই আমরা শনিবার পর্যন্ত দেখে নতুন কর্মসূচী ঘোষনা করবো। তবে আমাদের কর্মবিরতি ও আন্দোলন চলবে।
এ সময় কালিঘাট চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি অবান তাঁতী, শ্রমিক নেতা গোপাল রাজভর ও মিন্টু তাঁতী বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনার অপেক্ষায় আছি ঘোষনা পেলে কাজে যাবো মিটিংএ এই সিন্ধান্ত হয়েছে।
তাদের কমিটি গঠনের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে গোপাল রাজভর বলেন, কমিটির বিষয়ে আমরা এখণ কথা বলবো না। এ সময় মোহন রবিদাস বলেন সকল পঞ্চায়েত প্রধানদের উপস্থিতিতে আমি মোহন রবিদাশকে আহবায়ক ও অবান তাঁতীকে সদস্য সচিব করে চা শ্রমিক অধিকার পরিষদ গঠন করা হয়। মোহন রবিদাসের এ ঘোষনার সাথে সাথে তার পাশে থাকা মিন্টু তাঁতীসহ আরো দুই চা শ্রমিক বলেন, এটা সিন্ধান্ত হয়নি। কেউ রাজী হয়েছে কেউ আপত্তি জানিয়েছে। এসময় সেখানেই একটা হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা জানান, আমরা নির্বাচিত চা শ্রমিক ইউনিয়ন। চা শ্রমিকদের মজুরিবৃদ্ধিসহ ২০ দফা দাবী আদায়ে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করেছি। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু সুবিধা আদায় করেছি। মজুরি নিয়ে আমরা আন্দোলন জোরদার করেছি। মালিক পক্ষ ১২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা পর্যন্ত দিতে রাজী হয়েছে। আমরা তা মানিনি। মানসম্মত মজুরির দাবীতে এখনও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। মধ্যখান থেকে মোহন রবিদাসরা আন্দোলনের নামে নিজের গোপন স্বার্থ চরিতার্থ করছে। তিনি বলেন, মোহন রবিদাশের মুললক্ষ্য মজুরি বৃদ্ধি নয় তার চাওয়া নেতা হওয়া।
এদিকে সন্ধ্যায় মোহন রবিদাস মোঠফোনে বলেন, মিটিংএর সিন্ধ্যান্ত মোতাবেক তাকে আহবায়ক ও অবান তাঁতীকে সদস্য সচিব, সকল বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি- সম্পাদক ও সকল ছাত্র-যুবকে সদস্য করে চা শ্রমিক অধিকার পরিষদ গঠন করা হয়। এই কমিটি করার মুল উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি বলেন, চা শ্রমিক ইউনিয়নের কোন নেতা এখন মাঠে নেই। আন্দোলন করছে ছাত্র-যুবরা। এর একটি ফোরাম প্রয়োজন। তাই এটি করা হয়েছে। এ সময় চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চুক্তি তাদের সাথে করার জন্য তারা আহবান জানাবেন কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা পরের বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক হলে সেখানে চা শ্রমিক অধিকার পরিষদ থাকতে চায়।
এদিকে বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারে সবকটি বাগানেই কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করছেন চা শ্রমিকরা। অধিকার আদায়ে বিভিন্ন জায়গায় পালন করা হয় বিভিন্ন কর্মসূচী।
বৃহস্পতিবার সকালে শ্রীমঙ্গল খেজুরীছড়া চা বাগানের নাট মন্দিরের সামনে মজুরি বৃদ্ধি ও অনান্য সুযোগ সুবিধার দাবীতে মানববন্ধন করে চা বাগানের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
মানববন্ধনে শ্রীমঙ্গল রাজঘাট ইউনিয়নের রানার উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজের প্রায় সহ¯্রাধিক শিক্ষার্থীরা অংশনেয়। অংশনেয় খেজুরি ছড়া চা বাগানের প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও কিছু শিক্ষার্থী
আন্দোলনে অংশ নেয়া চা শ্রমিক সন্তান কলেজ স্টুডেন্ট সঞ্জিত তাঁতী জানান, তাদের লেখাপড়া করাতে ও অন্যবস্ত্র দিতে তাদের অভিভাবকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন । নিজে না খেয়ে অনেক সময় কাজে যান এবং তাদের খেতে দেন। তাদের চোখের সামনে তাদের মা বাবা অবর্ণনীয় কষ্ট করেন। তিনি বলেন, এর পরিবর্তন একবারতো হওয়া উচিৎ। আর কত কষ্ট করবেন আমার মা বাবারা।
আন্দোলনে অংশনেয়া অপর শিক্ষার্থী প্রীতি রানী জানান, বর্তমান দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে ১৪৫ টাকা মজুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাস্তবতা নিরিক্ষে যেন তাদের অভিভাবকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কশন করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের অনেক কিছু দিয়েছেন এ বিষয়েও যেন একটু সুদৃষ্টি দেন।
এদিকে কাজ না করায় গত বুধবার সাপ্তাহিক তলব (মজুরি) পায়নি শ্রমিকরা। এতে চরম অর্থকষ্ট রয়েছে শ্রমিকদের পরিবারে পরিবারে। শ্রমিকরা জানান, দ্রুত এর সমাধান করে অথাৎ মানসম্বত একটা মজুরি দিয়ে তাদের কাজে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়ার।
চা শ্রমিক সন্তান অজিত বুনার্জী জানান, গতকাল বুধবার বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের একদিনের বেতন ও অতিরিক্ত ৫শ টাকা করে আনার জন্য আহবান জানায়। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীরা তা গ্রহন না করতে বলায় কেউই সে টাকা নেয়নি।
এদিকে এই সাপ্তাহে মজুরি না পাওয়ায় অনেক শ্রমিকই সংসার পরিচালনা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অনেকে আক্ষেপ করে বলছেন কেউ কি নেই আমাদের বিষয়টি সমাধান করে দেয়ার।
ফুলছড়া চা বাগানের সাবিত্রী নায়েক জানান, তলব নেই (বেতন) দোকানদার বাকী দেয় না। আমরা মরে যাই। মরে যাওয়ার পরে কেউ এসে শেষ করুক।
এ বিষয়ে সন্তানদের পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া মোহন রবি দাশ আজ তার ফেইজবুক আইডি থেকে লাইভে এসে বলেন, এখন হাজরি নেই শ্রমিকদের ঘরে খাবার নেই। তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য বাগানের কিছু অবস্থাশালীদের কাছথেকে বা অন্য যে সকল জায়গা থেকে যথা সম্ভব অর্থ সংগ্রহ করে তাদের খাবার যোগান দিতে ছাত্রযুব সংসদের সদস্যদের আহবান জানান। একই তিনি বলেন, চা শ্রমিক ইউনিয়নের ফান্ডে শ্রমিকদের লক্ষ লক্ষ টাকা আছে, চা বোর্ডের ফান্ড আছে সে সকল জায়গা থেকে তা সংগ্রহ করতে হবে।
এদিকে বেলা ১২টার দিকে শ্রীমঙ্গল কালীঘাট চা বাগানে বেশ কয়েকজন পঞ্চায়েত প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করছেন চা শ্রমিকদের সন্তান ছাত্রযুবকরা। এছাড়া বিভিন্ন বাগানে পৃথক পৃথক মিছিল করেছেন শ্রমিকরা।
একই সময়ে বালিশিরা ভেলীর ২০টি চা বাগানের পঞ্চায়েত প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেন শ্রীমঙ্গলস্থ শ্রম অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাহিদুল ইসলাম। নাহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সাথে আলোচনা করে আলোচনা ঠিক থাকছেনা। এ অবস্থায় করনীয় কি। প্রতিউত্তরে পঞ্চায়েত নেতারা বলেন প্রধানমন্ত্রীর কোন ঘোষনা পেলে শ্রমিকরা বিভ্রান্ত থেকে রক্ষা পাবে এবং কাজে যোগদিবে।
অন্যদিকে বিকেল ৩টায় মৌলভীবাজার শহরের বেরিরপাড় এলাকায় বালিশিররা ভ্যালীর ৫টি চা বাগানের শ্রমিকরা প্রায় দুইঘন্টা অবস্থান কর্মসূচী পালন করেন।
এদিকে প্রতিদিনই কুঁড়ি বড় হয়ে বাড়ছে পাতার সংখ্যা। ধ্বংসের মূখে পড়েছে চা শিল্প। বাংলাদেশীয় চা সংসদের সদস্য ও ফিনলে টি কোম্পানীর সিইও তাহসিন আহমদ চৌধুরী জানান, ইতিমধ্যে শত শত কোটি টাকার চা নষ্ট হয়েগেছে। তিনি জানান, এ শিল্প অন্য শিল্পের ন্যায় নয়। এটি প্রকৃতি নির্ভর ও পছনশীল।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গলস্থ বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাহিদুল ইসলাম জানান, শ্রম দপ্তরের উদ্যোগে নতুন কোন বৈঠকের সিন্ধান্ত নেই। তিনি বলেন, আমরা বৈঠক করেছি চা শ্রমিক নেতাদের সাথে কিন্তু তারা কথা ঠিক রাখছেন। এখন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দেখা হচ্ছে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.