
স্টাফ রিপোর্টার॥ পাহাড়-টিলার মাটি কেটে বড়লেখায় অবাধে চলছে বিক্রি। পাশাপাশি ইজারাবিহীন বিভিন্ন ছড়া থেকেও অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন হচ্ছে। এসব টিলার মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনের নেপথ্যে রয়েছেন প্রভাবশালীরা। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ‘টিলা ও বালুখেকোরা’ প্রকৃতি ও পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকান্ড চালাচ্ছেন।
জানা গেছে, উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর, দক্ষিণ শাহবাজপুর, বড়লেখা সদর, দক্ষিণভাগ উত্তর ও দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে টিলা কাটা হচ্ছে। টিলা কাটা বন্ধে প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করে। তবে অভিযানের খবর পেলে কয়েকদিন টিলা কাটা বন্ধ থাকে। এরপর অভিযান না হওয়ার সবুজ সংকেত পেলে ফের শুরু হয় টিলা কাটা। এছাড়া উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর, উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকার ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব বালু মহাল থেকে স্থানীয় প্রভাবশালীরা দিনমজুর দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে। চক্রটি ছড়ার পাড়ে বালু স্তুপ করে রেখে চড়া দামে বিক্রি করছে।
গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে দুই ব্যক্তিকে টিলা কাটায় দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এরপরও বন্ধ হয়নি টিলা কাটা। স্থানীয়দের মতে, নামকাওয়াস্তে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে টিলা কাটা বন্ধ করা যাবে না। এসব বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।
২৩ অক্টোবর রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সোয়ারারতল গ্রামে ফয়জুর রহমান ফয়জুলের টিলা কেটে ট্রাক্টর দিয়ে অন্যত্র মাটি নেওয়া হচ্ছে। একই গ্রামের ছফর উদ্দিন সবুর ওরফে হাজীর ট্রাক্টর এসব মাটি বহন করছিল। মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত কয়েকজন শ্রমিক জানান, মাটি কাটা নিষেধ জানি। আমরা দিনমজুর মানুষ। পেটের দায়ে এসেছি। মালিক বলেছেন ফাঁড়ির পুলিশ ম্যানেজ আছে। কোনো সমস্যা হবে না।
সোয়ারারতল গ্রামের অদূরের দেওছড়া ও কলিরঘাট নামক এলাকায় ১৫-২০টি বালু উত্তোলনের স্পট দেখা গেছে। কিছু দুর পরপর বালু স্তুপ করে রাখা রয়েছে। কলিরঘাট এলাকার ছড়ায় কয়েকজন শ্রমিক অবৈধভাবে বালু তুলছিলেন। অপরিচত মানুষের উপস্থিতি বুঝতে পেরে তারা জাল দিয়ে মাছ ধরা শুরু করেন। কেউ কেউ পালিয়ে যান। কার কথায় বালু তোলা হচ্ছে, জানতে চাইলে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, সোয়ারারতল গ্রামের সবুর হাজী তাদের কাজে লাগিয়েছেন। মুলত প্রভাবশালীরা দিনমজুর দিয়ে বালু উত্তোলন করে তা পাচার করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক জানান, এখানকার ট্রাক্টর মালিক সবুর হাজী, আনিসুর রহমান, জামাল মিয়া, আব্দুল খালিক, দিনার প্রমুখ অবৈধ বালু উত্তোলনে বিনিয়োগ করেন। সমস্ত দিন দৈনিক মজুরী ভিত্তিতে তারা শ্রমিক দিয়ে বালু উত্তোলন করান। তবে বেশিরভাগ সময় ভোরের দিকে বালু তোলা হয়। উত্তোলন করা অবৈধ বালু ছড়ার পাড়ে স্তুপ করে রাখেন শ্রমিকরা। সন্ধ্যার পর থেকে ট্রাক্টরযোগে বিভিন্ন স্থানে এসব বালু পাচার করা হয়। এরা প্রতি ট্রাক বালু ৪ হাজার এবং প্রতি ট্রাক্টর বালু আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করেন। প্রশাসন বাধা দেয় কি-না জানতে চাইলে তারা বলেন, মাঝে মাঝে পুলিশ ও ভূমি অফিসের লোক আসে। গাড়ি আটকায়। টাকা দিলে ছেড়ে চলে যায়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘এগুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মকর্তার কারণে। উত্তর শাহবাজপুর ও দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের কয়েকটি ছড়া থেকে ভূমি ও পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসাধুরা বিক্রি করছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। কারণ অবৈধ বালু উত্তোলনস্থল ও পাচারকালে শাহবাজপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই মাসুক আহমদ বালুভর্তি ট্রাক আটক করেন। পরে অদৃশ্য কারণে তিনি আইনগত ব্যবস্থা না নিয়েই ছেড়ে দেন। এতে বালুখেকোরা অনেকটা বেপরোয়া। অবৈধ মাটি ও বালুবাহী যানবাহন চলাচলে অফিস বাজার-সোয়ারারতল ইটসলিং ও কাচা গ্রামীণ রাস্তার বেহাল হয়ে পড়েছে। ৪-৫ গ্রামের মানুষ এ রাস্তায় চলাচল করতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
ওই এলাকায় পাওয়া গেলে টিলা কাটা-বালু তোলার বিষয়ে অভিযুক্ত ট্রাক্টর মালিক ছফর উদ্দিন সবুরকে। তিনি বলেন, ‘বালু তোলার সাথে আমি জড়িত নই। আর ফয়জুর রহমান তার টিলা কেটে বাড়ির উঠান ভরাট করছেন। তাই গাড়ি দিয়েছি।’
টিলা ও বালু উত্তোলকারীদের থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগটি অস্বীকার করে শাহবাজপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই মাসুক আহমদ বলেন,‘কেউ যদি আমি টাকা নিয়েছি বলে তারতো মুখে ধরতে পারবো না। আর দিনের বেলা টিলা কাটা কিংবা ট্রাক্টরযোগে মাটি পাচারের কোন দৃশ্য চোখে পড়েনি। পড়লে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুনজিত কুমার চন্দ জানান, সম্প্রতি টিলা কাটার দায়ে দুই ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয়েছে। টিলা কাটার ও সরকারী বালু মহাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কোন তথ্য তার জানা নেই। সঠিক তথ্য পেলে টিলা কর্তনকারী ও বালুখেকোদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.