
স্টাফ রিপোর্টার : কয়েকদিন থেকে মৌলভীবাজারের হাওরে পানির নিচে তলিয়ে থাকা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে হাওরে পানি। যেগুলো কেটে স্তুপ দিয়ে রেখেছিলেন সে ধানও নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষক তার পুরো বছরের খাবার সংগ্রহ করতে পানির নিচ থেকে ধান কেটে আনছেন। যারা ধান কেটে নিয়ে এসেছেন সেগুলো ভালো করে শুকাতে পারছেন না।
হাওরের পানিতে নৌকা নিয়ে বুক বা গলা সমান পানির মধ্যে ধান কেটে নিয়ে আসছেন। যাদের নৌকা নেই তারা কলাগাছের ভেলায় ধান কেটে নিয়ে আসছেন। হাওর পাড়ের একমাত্র সম্বল ক্ষেতের ধান হারিয়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তার পরও হাওর পাড়ে কৃষকরা বোরো ধান সংগ্রহে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সোমবার ৪ মে দুপুরের পর সূর্যের দেখা মিলে, তাই অনেক কৃষকরা স্তুপে রাখা ধান চেষ্টা করেছেন একটু রোদের আলো লাগাতে। আবার অনেক কৃষক পঁচে যাওয়া ধান মারাই দিচ্ছেন। তবে গেল ২৪ ঘন্টায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হওয়া কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
হাওর এলাকায় রয়েছে শ্রমিক সংকট। শ্রমিক পেলে তারা অতিরিক্ত পানিতে নেমে ধান কর্তন করতে চাননা। জমিতে পানি অতিরিক্ত থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কর্তন করা যাচ্ছেনা।
মনু প্রকল্পের ভেতর সপ্তাহের অধিক সময়ে তলিয়ে থাকা বোরো ধান পঁচে যাচ্ছে। প্রকল্পের সবকটি পাম্প সচল না রাখার প্রকল্পের ভেতর থেকে পানি কমছেনা। মৌলভীবাজারের ৫টি উপজেলা মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় হাওরের বোরে ধান সময় যতই যাচ্ছে ততই ক্ষতি বাড়ছে। বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরে।
টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আকাশের কারণে ধান শুকাতে পারছেন না হাওর পাড়ের কৃষকেরা। এতে করে বোরো ধানের দাম আরও কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, কাটা ধান ভেজা থাকায় তা থেকে অঙ্কুর গজাচ্ছে। এতে সেই ধান বাজারে বিক্রির অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই নামমাত্র মূল্যে ধান বিক্রি করছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও উঠছে না।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের শেওয়াইজুড়ী এলাকার কৃষক বাবর মিয়া জানান, ৪ হাজার টাকা প্রতি বিগা চুক্তিতে পানির নীচ থেকে ধান কর্তন করে নিয়ে আসছেন। অনেক ধান পঁচে গন্ধ ছড়াচ্ছে। গত বছর কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কর্তন করেছি, খরচ অর্ধেকও লাগেনি। প্রকল্পের ভেতর এভাবে ধান তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হওয়ার কথা নহে। সার্বক্ষনিক পাম্প চালু থাকলে এমন ক্ষতি আমাদের হতোনা।
মিরপুর এলাকার কৃষক জুনেদ মিয়া জানান, ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। এর মধ্যে ১ বিঘা জমির ধান কর্তন করতে পেরেছেন। বাকী ৯ বিঘা জমির পাকা ধানের উপর প্রায় ১ ফুট পানি রয়েছে। ১ সপ্তাহ থেকে পানির নীচে ধান। কতটুকু ভালো থাকবে বুঝে উঠতে পারছিনা।
কৃষকেরা জানান, মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধানের দাম ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা থাকলেও এখন তা কমে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে, যা উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেকের নীচে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বিরাইমাবাদ এলাকার কৃষক আব্দুল আহাদ জানান, তিনি শুরুতে প্রতি মণ ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। এখন সেই দাম কমে ৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত রোদের অভাবে ধান ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না, যার ফলে দাম আরও কমে গেছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ জালাল উদ্দিন জানান, চলতি বছরে রোরো ধানের আবাদ হাওর এবং নন-হাওর এলাকা মিলিয়ে মোট ৬২,৪০০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭,৩৫৫ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৩৫,০৪৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ২৪৪২ হেক্টর বোরো ধান। ক্ষতির পরিমান প্রায় ৫০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সারাদেশে বোরো ধান সংগ্রহ করা হলেও মৌলভীবাজারে বৈরী আবহাওয়া ও হাওর-নিম্নাঞ্চলের বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারনে ধান সংগ্রহ শুরু হয়নি। জেলায় এ বছর ৬ হাজার ৪ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ করা হবে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.