
কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সততা, প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও আদর্শিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল নাম অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মো: কোরেশ খান। একজন সফল শিক্ষক, দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসক, সমাজসংস্কারক ও মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি আজীবন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দীঘলবাক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত খান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মো: জলকদর খান এবং মাতা মোছাঃ তাহমিনা খানের বড় সন্তান ছিলেন কোরেশ খান। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তিনি দীঘলবাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে আউশকান্দি হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৬৯ সালে এমসি কলেজ, সিলেট থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে বিএ (অনার্স) ও ১৯৭৪ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করতে তিনি ১৯৮৮ সালে সিলেট আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রিও লাভ করেন।
অধ্যক্ষ কোরেশ খানের শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় ১৯৭৬ সালে ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে। দীর্ঘদিন কমলগঞ্জ সরকারি গণমহাবিদ্যালয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৩ সালে তিনি রাজনগর ডিগ্রি কলেজে যোগদান করেন। ১৯৯৫ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১০ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সুনাম, দক্ষতা ও সততার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে কলেজটি শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
শুধু শিক্ষকতাই নয়, তিনি ছিলেন জ্ঞানচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। কিছু সময়ের জন্য লন্ডনে অবস্থান করে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন, যা তাঁর চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করে। ইংরেজি সাহিত্য ছাড়াও কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক এবং প্রধান পরীক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও প্রজ্ঞা শিক্ষাঙ্গনে তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
অধ্যক্ষ কোরেশ খান ছিলেন একজন গুণী প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তাঁর সাহিত্যকর্ম দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে তিনি ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ সম্মাননায় ভূষিত হন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। ১৯৭৯ সালের ১৫ জুন তিনি মিসেস রেজিয়া চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের পরিবারে রয়েছে দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান। পরিবারে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল, দায়িত্ববান ও আদর্শ অভিভাবক।
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি আম্বিয়া কে.জি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন আজীবন। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর নেশার মতো। গ্রামের উন্নয়ন, মসজিদ-মাদরাসা, কবরস্থান ও সামাজিক অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে তিনি সরাসরি ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর সরলতা, বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক আচরণ তাঁকে সমাজে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ যত বড়ই হোক, অহংকারের কোনো স্থান নেই।
২০২৪ সালের ১৫ মে তিনি মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিক্ষাঙ্গন, সমাজ ও অসংখ্য শুভাকাক্ষী এক বিরলপ্রজ শিক্ষাবিদ ও মানবিক মানুষকে হারায়। তবে তাঁর কর্ম, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ যুগ যুগ ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। মহান আল্লাহ অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মো: কোরেশ খানকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.