
শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি : শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে একজনও নারী শিক্ষক নেই। প্রায় ৬০০ ছাত্রীর এই বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষক সংকট চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত ও মানসিক নানা সমস্যা নিয়ে ছাত্রীদের চরম সংকোচ ও দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছেন বিদ্যালয়ের আয়া এবং উচ্চ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী।
১৯৩০ সালে শ্রীমঙ্গলের বনেদি পরিবার রাধানাথ দেব চৌধুরী তাঁর মায়ের নামে ‘দয়াময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৯৮৫ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হলে এর নামকরণ হয় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘ ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৯৮ শতাংশ সাফল্য অর্জন করলেও শিক্ষক সংকটের কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক পদের সংখ্যা ১৯ হলেও বর্তমানে ৬টি পদ শূন্য রয়েছে। নেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষকও। সম্প্রতি একজন ধর্ম শিক্ষককে ডেপুটেশনে অন্য বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। সর্বশেষ কর্মরত একমাত্র নারী শিক্ষক তিন বছর আগে মারা যাওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ে আর কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন হয়নি।
ছাত্রীরা জানায়, বয়ঃসন্ধিকালে নানা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের বিষয়ে তারা পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে না। অনেক সময় স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা মাসিকসংক্রান্ত জটিলতা নিয়েও কাউকে কিছু বলতে পারে না। লজ্জা ও সংকোচে বিষয়গুলো গোপন রেখে কষ্ট সহ্য করতে হয়। ফলে পাঠদানেও বিঘ্ন ঘটে এবং অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারে না।
অভিভাবকদের অভিযোগ, একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিভাবক দিলিপ কৈরী জানান, মেয়েদের নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়গুলো বিবেচনায় অন্তত কয়েকজন নারী শিক্ষক জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
নারী শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের গার্লস গাইড কার্যক্রমও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শারদীয়া মল্লিক বলেন, আমি এই বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেনীর শিক্ষার্থী। গত ৪ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে আছি। এই পর্যন্ত আমি এখানে একজন নারী শিক্ষকই দেখেছিলাম। তিন বছর আগে উনি প্রয়াত হয়েছেন। এরপর থেকে আমাদের বিদ্যালয়্ব কোন নারী শিক্ষক নেই। এর কারনে আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মেয়েদের নানান ধরনের শারীরিক সমস্যা আছে। বিশেষ করে পিরিয়ডের সমস্যে উচু ক্লাশের মেয়েরা যেভাবে বিষয়টা সমাধান করতে পারেন, ক্লাশ ৬ বা সেভেন এর শিক্ষার্থীরা সেটা পারে না। তাদের জখন হঠাত করে সেই সমস্যা হয় তারা দিশেহারা হয়ে যায় তারা কি করবে। সেই সময়ে তাদের প্রয়োজনীয় উপকরন সেনেটারী ন্যাপকিন সহ কিছুই থাকে না। তারা লজ্জায় পুরুষ শিক্ষকদের কিছু বলতে পারে না। এসময় একজন নারী শিক্ষক এর খুব প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষকরা আসলে বুঝতে পারেন না যে আমাদের কি কি প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী বৈশাখী পাল বলেন, আমাদের স্যাররা আমাদের যথেষ্ট পাঠদান দিচ্ছেন। সহযোগিতা করছেন। সেখানে আমাদের কোন কমপ্লেইন নেই। কিন্তু আমাদের মেয়েদের জন্য কয়েকজন নারী শিক্ষক প্রয়োজন। আমাদের অনেক কথা থাকে যা পুরুষ শিক্ষককে আমরা সরাসরি বলতে পারি না। আমাদের বিদ্যালয়ে গার্লস গাইড এর দল আছে। কিন্তু নারী শিক্ষক না থাকায় গার্লস গাইডের প্রশিক্ষক (কমিশনার) না থাকায়, আমাদের কোন কার্যক্রম নেই৷ প্যাক্টিস নেই।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পিতা (অভিভাবক) আব্দুর রহিম বলেন, যেখানে পুরো স্কুলের শিক্ষার্থী মেয়ে সেখানে একজনও নারী শিক্ষক নেই। আমার মেয়ে এই স্কুলে পড়ে। তার কোন শারীরিক সমস্যা হলে বাসায় গিয়ে তার মায়ের সাথে শেয়ার করে। কিন্তু এখানে যদি নারী শিক্ষক থাকতো তাহলে আমার মেয়েসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের সব কিছু নারী শিক্ষদেএ সাথে শেয়ার কররে পারতো।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.