
বশির আহমদ : পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান। এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ও সুন্দর রাখতে হলে প্রকৃতিকে রক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। অথচ আজ বিশ্বের প্রায় সব দেশই জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বায়ুদূষণ, বন উজাড়, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও বন্যার মতো নানা পরিবেশগত সমস্যার মুখোমুখি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দিন দিন গরম বাড়ছে, বিশুদ্ধ বাতাস কমে যাচ্ছে, শহর ও গ্রামে সবুজের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ শুধু একটি কর্মসূচি নয়; বরং এটি আমাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
গাছ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বন্ধু। একটি পরিণত গাছ প্রতিনিয়ত অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখে। গাছ তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে, ছায়া দেয়, মাটি ক্ষয় রোধ করে, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনে। পাখি, প্রাণী ও অসংখ্য জীবের নিরাপদ আশ্রয়ও গাছ।
বৃক্ষ শুধু পরিবেশ রক্ষাই করে না, মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলজ গাছ মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে, বনজ গাছ কাঠ ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করে, আর ঔষধি গাছ নানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। গ্রামবাংলার সৌন্দর্য, কৃষির উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গাছের অবদান অপরিসীম।
বর্তমানে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রতিনিয়ত গাছ কাটা হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় নতুন গাছ লাগানো হচ্ছে না। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তাই প্রতিটি মানুষ যদি বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগায় এবং সেই গাছের যথাযথ যত্ন নিয়ে বড় করে তোলে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের চারপাশে সবুজের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাবে।
তবে শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; গাছকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, বেড়া দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার মাধ্যমে একটি ছোট্ট চারাকে বড় বৃক্ষে পরিণত করতে হয়। একটি গাছ বড় হতে কয়েক বছর সময় লাগে, কিন্তু কেটে ফেলতে লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। তাই বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বৃক্ষ সংরক্ষণেও আমাদের সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ইসলামও বৃক্ষরোপণকে অত্যন্ত উৎসাহিত করেছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকাহ হিসেবে গণ্য হয়। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে এসেছে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও যদি কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে এবং তা রোপণ করার সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে। এই শিক্ষা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়; এটি মানবকল্যাণমূলক একটি মহৎ ইবাদতও।
সবুজ প্রকৃতি মানেই সুস্থ জীবন, নির্মল বাতাস এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ,এতিমখানায়
রাস্তার পাশে কিংবা যেখানে সুযোগ আছে সেখানে অন্তত একটি করে গাছ লাগাই এবং তার পরিচর্যার দায়িত্ব গ্রহণ করি। আজকের একটি ছোট্ট চারা আগামী দিনের বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়ে মানুষ, প্রকৃতি ও দেশকে উপহার দেবে জীবন, ছায়া ও স্বস্তি। একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়; বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার অঙ্গীকার।
লেখক: বশির আহমদ, অধ্যক্ষ, উলুয়াইল ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, মৌলভীবাজার সদর।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.