
স্টাফ রিপোর্টার : চিকিৎসক ছেলের মরদেহ জানালার গ্রিলে, ১১ দিন পর আইনজীবী বাবার মরদেহ নিজ বাসায়—দুই মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন, পরিবার কি আইনি পথে যাবে?
একমাত্র ছেলের মৃত্যুর ১১ দিন পর মারা গেলেন বাবা। একজন চিকিৎসক, অন্যজন আইনজীবী। প্রথমজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল সিলেট নগরের একটি বাসায় জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায়। দ্বিতীয়জনের মরদেহ পাওয়া গেল মৌলভীবাজার শহরের নিজ বাসায়, ভেতর থেকে বন্ধ দরজা খুলে।
দুই মৃত্যুর ব্যবধান মাত্র ১১ দিন। মৌলভীবাজারের পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী বট পরিবারের বাবা-ছেলের পরপর এই মৃত্যু ঘিরে তাই উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।
এমন কী ঘটেছিল এই পরিবারে, যার মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে চলে গেলেন একমাত্র ছেলে চিকিৎসক পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্ত এবং তাঁর বাবা আইনজীবী পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তী?
আরও বড় প্রশ্ন, দুই মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে পরিবার কি আইনি পথে এগোবে, নাকি ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই মেনে নেবে?
তবে দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিংবা পারিবারিক অশান্তিই মৃত্যুর কারণ—এমন কোনো বিষয় এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সিলেটের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ডা. পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্তের (৩১) মরদেহ। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ছিলেন। পুলিশ জানায়, তাঁকে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণা করা হলেও মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে মৌলভীবাজার শহরের এম সাইফুর রহমান সড়কের ‘ভটের ফার্মেসি’র দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মরদেহ। পেশায় আইনজীবী পূর্ণেন্দ্রের বাসার দরজা ছিল ভেতর থেকে বন্ধ। পুলিশ দরজা খুলে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট-পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, এমন কোনো তথ্য নেই।
পুলিশের ভাষ্য, ছেলের মৃত্যুর পর পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
১১ দিনের ব্যবধানই কি কেবল কাকতাল?
একটি মৃত্যুর ১১ দিনের মাথায় আরেকটি মৃত্যু। প্রথম ঘটনা সিলেটে, দ্বিতীয়টি মৌলভীবাজারে। মৃত্যুর পরিস্থিতিও এক নয়। তবু সময়ের এই অস্বাভাবিক নৈকট্য তদন্তের প্রশ্নগুলোকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
প্রান্তের মৃত্যুর আগে তাঁর গতিবিধি কী ছিল? কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল? তাঁর মোবাইল ও ডিজিটাল যোগাযোগে কী তথ্য রয়েছে? মৃত্যুর পরের ১১ দিনে পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন? তাঁর শেষ সময়ের গতিবিধি কী ছিল?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রথম মৃত্যুর তদন্তে পাওয়া কোনো তথ্য কি দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
পরিবার কী বলছে?
বট পরিবারটি মৌলভীবাজারে পরিচিত একটি পরিবার। এমন একটি পরিবারের বাবা ও একমাত্র ছেলের পরপর মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই সামাজিকভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে দুই মৃত্যুর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সন্দেহ কিংবা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
সেখানেই আরেকটি প্রশ্ন, পরিবার কি দুই মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করবে? প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেবে? নাকি ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও এখনো অজানা।
পারিবারিক অশান্তির আলোচনা-তথ্য কোথায়?
দুই মৃত্যুর পর পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কিন্তু আলোচনা, গুঞ্জন ও প্রমাণ এক নয়। কোনো পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য সমস্যা কিংবা অন্য কোনো বিষয়কে মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য ও তদন্তের প্রমাণ।
তাই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে মৃতদের সাম্প্রতিক যোগাযোগ, পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং মৃত্যুর আগে তাঁদের গতিবিধি।
গুঞ্জন নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত
ডা. প্রান্তের মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ কী এবং অ্যাডভোকেট পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণই বা কী—এই দুটি প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিজিটাল তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য—সবকিছু বিশ্লেষণ করেই সেখানে পৌঁছাতে হবে। কারণ একটি পরিবার ১১ দিনের ব্যবধানে হারিয়েছে তার একমাত্র সন্তান ও বাবাকে।
এটি নিছক দুটি মৃত্যুর পরিসংখ্যান নয়; একটি পরিবারের জন্য এটি অপূরণীয় শোক। আর সেই শোকের মধ্যেই থেকে গেছে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন।
ঐতিহ্যবাহী বট পরিবারে এমন কী ঘটেছিল? দুটি মৃত্যুর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি? ডা. প্রান্তের মৃত্যুর তদন্তে পাওয়া তথ্য কি তাঁর বাবা পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর মৃত্যুর কোনো সূত্র দিতে পারে? আর সবচেয়ে বড় কথা, দুই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পরিবার কি আইনি পথে হাঁটবে, নাকি তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষাতেই থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে তদন্তে-গুঞ্জনে নয়, প্রমাণে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.