
সাইফুল ইসলাম চীনের গুয়াংজু থেকে ফিরে : চীনের গুয়াংজু শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্যের বিশাল হাব ‘ক্যান্টন ফেয়ার’ ঘুরে এসে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হিসেবে বাস্তব অভিজ্ঞতা, অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা দিক নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর যে বিশালতা, বৈচিত্র্য এবং সুযোগগুলো খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। যেমন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা নিয়ে এই মেলা ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ-সব ধরনের ব্যবসায়ীরাই বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারবেন।
বাংলাদেশি অনেক ব্যবসায়ী এতদিন মধ্যস্বত্বভোগী বা তৃতীয় কোনো দেশের এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতেন। ক্যান্টন ফেয়ারে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এবং শতভাগ আসল প্রস্তুতকারকদের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ মেলে। এর ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়, যা স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ক্যান্টন ফেয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সরাসরি নির্মাতা বা সাপ্লায়ারদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ। সরাসরি কারখানা পরিদর্শন করে নিজের চাহিদামতো মালামাল ক্রয় করা যায়। এই মেলায় অংশ নিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা আমার ভবিষ্যৎ ব্যবসায়ে দারুণভাবে কাজে লাগছে।
ইতিমধ্যে আমার এই অভিজ্ঞতা শুনে অনেক নতুন ব্যবসায়ী ক্যান্টন মেলায় অংশ নিয়েছেন। বিশেষ করে নতুন পণ্যের ট্রেন্ড, বাজারের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এই মেলার জুড়ি নেই। আগে যেখানে একটি পণ্য বাংলাদেশে আনতে মাসের পর মাস সময় লাগত, এখন সরাসরি যোগাযোগের কারণে সময় অনেক কমে গেছে এবং ব্যবসার প্রসারও দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন পণ্যের সাথে চীনা পণ্য পরিচিতি :
বিশ্ববাজারে কী ধরনের নতুন ট্রেন্ড, ডিজাইন এবং প্রযুক্তি আসছে, তার একটি বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, ইলেকট্রনিক্স, লাইট মেশিনারি, কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়ালস এবং হোম ডেকর খাতের ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের মান উন্নত করার আইডিয়া পান। বাংলাদেশের অনেক উদ্যোক্তা এখন নিজেদের ব্র্যান্ডের অধীনে পণ্য বাজারে আনতে চান । ক্যান্টন ফেয়ারে এমন হাজার হাজার কারখানা রয়েছে যারা নিজস্ব ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং এবং ডিজাইনে পণ্য তৈরি করে দিতে প্রস্তুত। এটি বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলোর স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রসারের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ।
বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কিং ও এক্সপোর্ট মার্কেট সম্প্রসারণ :
এই মেলায় কেবল চীন নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের ক্রেতা ও বিক্রেতারা আসেন। ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা (যেমন তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য বা হস্তশিল্প খাতের ব্যবসায়ীরা) তাদের পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতা বা নতুন বাজারের সন্ধান পেতে পারেন।
ক্যান্টন ফেয়ার ঘুরে যেসব উপলব্ধি :
মেলাটির বিশালতা (যা কয়েকটি বিশাল প্যাভিলিয়ন বা ফেয়ার কমপ্লেক্সে বিভক্ত) প্রথমবার দেখলে যে কারও চোখ ছানাবড়া হতে পারে। এর মূল উপলব্ধি হলো চীন যেভাবে পুরো সাপ্লাই চেইনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, তা থেকে আমাদের উৎপাদনশীলতা এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর অনেক কিছু শেখার আছে।
মেলায় যাওয়ার আগে প্রস্তুতির গুরুত্ব :
ক্যান্টন ফেয়ারে হুট করে গিয়ে ভালো কিছু করা কঠিন। মেলায় যাওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট হোমওয়ার্ক, কোন কোন হল রুমে কোন ক্যাটাগরির পণ্য দেখা হবে তার তালিকা তৈরি করা এবং সম্ভাব্য সাপ্লায়ারদের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা যোগাযোগ করে যাওয়া সফলতার হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ক্যান্টন ফেয়ারে বিশাল প্ল্যাটফর্ম :
বাংলাদেশ থেকে চীন বা বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানি এবং ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ক্যান্টন ফেয়ারের মতো বিশাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও, আমাদের বেশ কিছু কাঠামোগত ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। চীনের কারখানাগুলো যে বিপুল পরিমাণে এবং অত্যন্ত কম খরচে পণ্য উৎপাদনে অভ্যস্ত, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মাঝারি বা ছোট কারখানা সেই স্কেলে উৎপাদন করতে হিমশিম খায়। চীনা ক্রেতারা বা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো যখন একসাথে বিশাল অর্ডারের কথা বলে, তখন সময়মতো তা সরবরাহ করা আমাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং লিড টাইম-চ্যালেঞ্জ :
আমাদের তৈরি পোশাক খাত বা অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতে অনেক সময় কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে প্রোডাকশন লিড টাইম (পণ্য তৈরির সময়) বেড়ে যায়। অন্যদিকে, চীনা সাপ্লায়াররা তাদের নিজস্ব শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের কারণে অত্যন্ত দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এই সময়ের ব্যবধান একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বৈচিত্র্য চ্যালেঞ্জ :
বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ি মূলত তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। পাটপণ্য, চামড়া, হস্তশিল্প এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য আনতে পারিনি। ক্যান্টন ফেয়ারের মতো মেলায় চীনা ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে হলে যে ধরনের নতুন ও উদ্ভাবনী পণ্যের প্রয়োজন, তার সরবরাহ সীমিত।
ব্র্যান্ডিং ও ভ্যালু অ্যাডিশন :
আমরা দীর্ঘদিন ধরে মূলত অন্যের ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য তৈরি করে আসছি। নিজস্ব ব্র্যান্ড বা প্রাইভেট লেবেল তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রে আমাদের মার্কেটিং বাজেট, ডিজাইন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে চীনা বাজারে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা বেশ ব্যয়বহুল ও প্রতিযোগিতামূলক।
কমপ্লায়েন্স ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণে চ্যালেঞ্জ :
আন্তর্জাতিক বাজার এবং চীনা ক্রেতাদের কঠোর কমপ্লায়েন্স (শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, নিরাপত্তা ইত্যাদি) এবং সুনির্দিষ্ট গুণগত মান বজায় রাখা সবসময় সহজ হয় না। ছোট কারখানাগুলোর পক্ষে আধুনিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্যান্টন ফেয়ার এখন শুধু ঐতিহ্যবাহী পণ্য বা হার্ডওয়্যারের মেলা নয়; সময়ের সাথে এটি উচ্চপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং আধুনিক উদ্ভাবনের একটি বিশাল বৈশ্বিক প্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছে। উদীয়মান খাত যেমন স্টার্টআপ, ফিনটেক, এগ্রিটেক, এআই এবং বায়োটেকনোলজির বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা এই মেলা বা এর পেছনের চাইনিজ ইকোসিস্টেমকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেন। এই খাতগুলোতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা ও তা ব্যবহারের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও হার্ডওয়্যার সোর্সিং সুযোগ রয়েছে। এগ্রিটেক (যেমন স্মার্ট ইরিগেশন বা কৃষি ড্রোন) কিংবা বায়োটেকনোলজি বা ফিনটেকের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত ডিভাইস বা আইওটি হার্ডওয়্যার সরাসরি প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা যায়।
চীন এই মুহূর্তে বিশ্বমানের হার্ডওয়্যার ও এআই সলিউশন উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশি টেক স্টার্টআপগুলো সফটওয়্যার সলিউশন বা লোকাল ইনোভেশন তৈরি করলেও হার্ডওয়্যারের জন্য চাইনিজ ম্যানুফ্যাকচারারদের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার বা হোয়াইট-লেবেলিং পার্টনারশিপ করতে পারে।
ক্যান্টন ফেয়ারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিভিত্তিক বিনিয়োগকারী, ইনোভেশন হাবের প্রতিনিধি এবং টেক জায়ান্টদের উপস্থিতি থাকে। উদীয়মান খাতের উদ্যোক্তারা তাদের প্রজেক্ট বা আইডিয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পার্টনার বা ক্রস-বর্ডার ইনভেস্টরদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন। এটি গ্লোবাল স্কেলে নলেজ শেয়ারিং ও মার্কেট এক্সপান্ড করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এগ্রিটেক বা ফিনটেকের সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য চাইনিজ ল্যাব বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে গবেষণা ও উন্নয়ন করার বিশাল সুযোগ রয়েছে। চীনের প্রযুক্তিকে আমাদের স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসা সম্ভব।
বিশেষ করে চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোতে বাংলাদেশের ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে অংশগ্রহণ করা আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কূটনীতি ও রপ্তানি প্রসারের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কুংমিংয়ে অনুষ্ঠিত এই মেলায় রেকর্ড সংখ্যক ১০১টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ও ১৭৫ জনের একটি বড় প্রতিনিধিদল অংশ নেয়, যা এ পর্যন্ত যেকোনো আন্তর্জাতিক মেলায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি। এই মর্যাদাপূর্ণ আসরে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতি তুলে ধরেছি।
থিম কান্ট্রি হওয়ার সুবাদে বাংলাদেশ মেলায় একটি সুদৃশ্য ও বড় জাতীয় প্যাভিলিয়ন পেয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক দর্শনার্থী, চীনা ক্রেতা এবং নীতিনির্ধারকদের সামনে দেশের ভাবমূর্তি জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক নয়, বরং চামড়াজাত পণ্য, বিশ্বমানের ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিকস, হস্তশিল্প এবং পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে একসাথে উপস্থাপন করা হয়েছে।
শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন আড়ং বা অন্যান্য স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান) সক্রিয় অংশগ্রহণ বিদেশি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সহায়তা: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে মেলা প্রাঙ্গণে ‘বাংলাদেশ ডে’ উদ্যাপন এবং বিটুবি সেশনগুলোর আয়োজন করায় উদ্যোক্তারা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকআপ পেয়েছেন। এমনকি মেলায় প্যাভিলিয়ন ডিজাইন ও ব্যবস্থাপনার জন্য বেশ কিছু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান সম্মানজনক পুরস্কারও অর্জন করেছে।
মেলায় অংশগ্রহণকারী অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তার জন্য চীনা ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। যদিও অনেকে ডিজিটাল ট্রান্সলেশন অ্যাপ ব্যবহার করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন, তবে পেশাদার দোভাষী বা আন্তর্জাতিক মানের মার্কেটিং পিচ তৈরিতে আরও কুশলতা প্রয়োজন ।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.