
মতিন বকশ : বাংলাদেশ আজ এক গভীর সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই, মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখলেই ভেসে আসে এক একটি নৃশংসতার খবর। কোথাও ৫ বছরের শিশু, কোথাও ৮ বছরের কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে হত্যার শিকার হচ্ছে। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি এখন একটি জাতীয় উদ্বেগ, একটি জাতীয় লজ্জা।
কেন এই ভয়াবহতা বাড়ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনটি বিষয় সামনে চলে আসে, যা আপনিও উল্লেখ করেছেন।
১. বিচারহীনতার সংস্কৃতি :
সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিচারহীনতা। একটি ধর্ষণ বা শিশু হত্যার পর মামলা হয়, কিন্তু বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। সাক্ষীকে হুমকি দেওয়া হয়, আলামত নষ্ট করা হয়, প্রভাবশালীদের চাপে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। অপরাধী যখন দেখে যে অপরাধ করে পার পাওয়া যায়, তখন তার সাহস বেড়ে যায়। আরেকজন অপরাধীও উৎসাহিত হয়। যখন বিচার দৃশ্যমান হয় না, তখন আইনের প্রতি মানুষের ভয় থাকে না।
২. নৈতিক স্খলন ও মূল্যবোধের অবক্ষয় :
আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, কিন্তু নৈতিকতায় পিছিয়েছি। পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষা উঠে যাচ্ছে। বিকৃত রুচির কন্টেন্ট, মাদকের সহজলভ্যতা, পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার এবং সামাজিক অবক্ষয় মানুষের মনুষ্যত্বকে নষ্ট করে দিচ্ছে। যে সমাজে একটি শিশুকে দেখে স্নেহ জাগার কথা, সেখানে লালসা জাগছে — এর চেয়ে বড় নৈতিক পতন আর কী হতে পারে? আমরা সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, প্রতিবেশীর কান্না আর আমাদের স্পর্শ করে না।
৩. রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতা :
প্রতিটি ঘটনার পর আমরা তীব্র নিন্দা, তদন্ত কমিটি আর আশ্বাসের বুলি শুনি। কিন্তু কয়েকদিন পর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। ভিকটিমের পরিবার একা হয়ে যায়। পুলিশের গাফিলতি, মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে টালবাহানা, এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র যখন তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক — একটি শিশুকে — নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।
আমাদের কী করা উচিত? শুধু দুঃখ প্রকাশ করে আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। এখন প্রয়োজন কঠিন এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
১. কঠিন ও দ্রুত বিচার দৃশ্যমান করতে হবে :
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলার জন্য আলাদা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ৯০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। বিচার শুধু কাগজে হলে হবে না, তা জনগণের সামনে দৃশ্যমান হতে হবে। প্রকাশ্য রায় কার্যকর এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একজন অপরাধীর শাস্তি দেখে হাজারো সম্ভাব্য অপরাধী আতঙ্কিত হয়।
২. জিরো টলারেন্স নীতি :
এই ধরনের মামলায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যেন কাজ না করে, তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যেই হোক, তার একমাত্র পরিচয় হবে সে অপরাধী।
৩. সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে :
প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, স্কুলে, মসজিদ-মন্দিরে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদেরকে গুড টাচ, ব্যাড টাচ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
একটি শিশুর চিৎকার শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়, এটি পুরো জাতির বিবেকের উপর আঘাত। আজ যদি আমরা চুপ থাকি, কাল এই আগুন আমাদের ঘরেও লাগবে। তাই বিচারহীনতার এই দেয়াল ভাঙতে হবে। নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। এবং রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, এই রাষ্ট্র দুর্বলের জন্য, শিশুদের জন্য নিরাপদ।
শিশু ধর্ষণ এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধে করণীয় বিষয়টি একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব না। এটা পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র - এই চারটি স্তরেই একসাথে কাজ করতে হয়।
পরিবার পর্যায়ে করণীয় :
সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক: ভয়ের পরিবেশ না, যেন সন্তান যেকোনো অস্বস্তিকর স্পর্শ বা আচরণ আপনাকে বলতে পারে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধী পরিচিত মানুষই হয়, তাই "অপরিচিত মানুষ থেকে সাবধান" বলার চেয়ে বেশি জরুরি "গুড টাচ - ব্যাড টাচ" শেখানো। সঠিক নামে শরীর চেনানো এবং সীমানা শেখানো: লজ্জা নয়, ৩-৪ বছর বয়স থেকেই শিশুকে বোঝান তার শরীর তার নিজের। কেউ তাকে অস্বস্তিতে ফেললে সে "না" বলতে পারবে, চিৎকার করতে পারবে এবং দ্রুত নিরাপদ কারো কাছে যেতে পারবে।
ডিজিটাল নজরদারি: শিশুর হাতে অবাধ ইন্টারনেট, পর্নোগ্রাফি, বা সোশ্যাল মিডিয়া তুলে দেবেন না। কী দেখছে, কার সাথে কথা বলছে-এটা জানা আপনার দায়িত্ব।
সামাজিক ও কমিউনিটি পর্যায়ে করণীয় :
নীরবতা ভাঙা : আমাদের সমাজে "মান-সম্মান যাবে" বলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। এই নীরবতাই অপরাধীকে আরো শক্তিশালী করে। প্রতিটি ঘটনায় কথা বলা, প্রতিবাদ করা এবং ভিকটিমকে দোষ না দিয়ে অপরাধীকে দোষী করা-এটা সামাজিক অবক্ষয় রোধের প্রথম শর্ত।
পাড়া-মহল্লায় সচেতনতা: মসজিদ, স্কুল, ক্লাবে নিয়মিত আলোচনা। শিশুরা কোথায় খেলছে, কাদের সাথে সময় কাটাচ্ছে, সন্ধ্যার পর কোথায় যাচ্ছে-সম্মিলিত নজরদারি।
অশ্লীলতা ও মাদকের সহজলভ্যতা রোধ : চায়ের দোকান, মোবাইলের দোকানে শিশুদের সামনে পর্ন দেখানো, মাদক বিক্রি-এগুলো দেখলে এড়িয়ে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করণীয় :
জীবন দক্ষতা ও যৌন শিক্ষা : লজ্জা বা ট্যাবু হিসেবে নয়, বিজ্ঞানসম্মতভাবে বয়স উপযোগী যৌন শিক্ষা ও আত্মরক্ষার শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শিশুকে শেখাতে হবে সম্মতি কী, ব্যক্তিগত সীমানা কী।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ: শিক্ষকরা যেন শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন-চুপচাপ হয়ে যাওয়া, স্কুলে আসতে না চাওয়া, ভয় পাওয়া-এই লক্ষণগুলো বুঝতে পারেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেন।
৪. আইনি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করণীয় :
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর অধীনে হয়।
যা আপনাকে করতেই হবে : ঘটনা ঘটলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় জিডি/মামলা করুন, মেডিকেল পরীক্ষা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করান। প্রমাণ নষ্ট করবেন না। শিশুর জামা-কাপড় ধুয়ে ফেলবেন না। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং শিশু সহায়তায় ১০৯৮ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ১০৯ নম্বরে কল করতে পারেন।
বিচারের দীর্ঘসূত্রতা রোধে সামাজিক চাপ : দ্রুত বিচার, বিচারে স্বচ্ছতা এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধ বাড়ে। এজন্য মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের সোচ্চার থাকা প্রয়োজন।
সামাজিক অবক্ষয় রোধের মূল জায়গা
অবক্ষয় হঠাৎ হয় না। যখন আমরা-ন্যায়কে অন্যায়, অন্যায়কে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করি, টাকা, ক্ষমতা দিয়ে অপরাধ ঢাকতে চাই, শিশুদের সামনে পারিবারিক সহিংসতা, গালাগালি, অসম্মানজনক আচরণ করি, ধর্মকে শুধু আচারে সীমাবদ্ধ রাখি, মূল্যবোধ-সততা, সহমর্মিতা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা-এগুলো চর্চা করি না। তখনই সমাজ ভাঙে।
তাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হলো-আপনার ঘর থেকেই একটি নিরাপদ, সম্মানজনক, কথা বলা যায় এমন পরিবেশ তৈরি করা। একটি শিশু যদি জানে যে তার কথা বিশ্বাস করা হবে, তাকে দোষ দেওয়া হবে না, তাহলেই সে প্রথমবারেই মুখ খুলবে, আর অপরাধ দ্বিতীয়বার ঘটার সুযোগ পাবে না।
আপনি কি আপনার এলাকা-স্কুল, মাদ্রাসা বা মহল্লার জন্য একটি সচেতনতামূলক লিফলেট বা পোস্টার বানাতে চান? আমি আপনাকে সেটা বাংলায় তৈরি করে দিতে পারি। আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ চাই।
লেখক : মতিন বকশ, সমাজকর্মী।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.