
মোস্তফা সালেহ লিটন : ফ্যাসিবাদী সরকারের বিদায়ের পর দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজনৈতিক সংকট, দমন, পীড়ন, অনিয়ম ও নানা অব্যবস্থাপনার পর জনগণের ভোটে একটি নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। হাজারো মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে যখন দেশে গণতন্ত্রের নতুন পথচলা শুরু হয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
মানুষ এখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি দৃশ্যমান, ইতিবাচক ও টেকসই পরিবর্তন দেখতে চায়। কিন্তু এখানেই বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামনে আসে দীর্ঘ ১৬ বছরের রেখে যাওয়া একটি বির্ধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো, নানা অনিয়মে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশকে নিয়েই কি এই কঠিন সময়ে দেশের সামগ্রিক ও দ্রুত উত্তরণ সম্ভব? প্রশ্নটি সহজ নয়। কারন, রাষ্ট্রের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো রাতারাতি পরিবর্তন করা ততটা সহজ নয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের আস্থা ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন সবকিছুই সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত কঠিন একটি প্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত প্রতিকূলতার মধ্যে দ্রুত কাংক্ষিত পরিবর্তন আনা কতটা সম্ভব? এটি নিঃসন্দেহে নির্বাচিত একটি সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা। তবে সমস্যা যত গভীরই হোক, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হবে। প্রশাসন, আইনশৃংখলা বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রেখে দক্ষতা, জবাবদিহীতা ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালনা করাটাই হচ্ছে এখন সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় । একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিচেনায় সরকারী দলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও দল একে অপরের পরিপূরক হলেও তাদের দায়িত্ব এক নয়। সরকার পরিচালিত হবে রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে। সরকার দলীয় সংগঠন যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে একাকার হয়ে যায়, তখন ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠন জনগণের পাশে থেকে তাদের কথা শুনবে, সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করবে এবং সরকারের কাছে সেগুলো তুলে ধরবে। সরকারী দলের জনপ্রতিনিধিরা এই মহান দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র এবং জনগনের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখানে দেখার বিষয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের আস্থা অর্জনে কতটা সততা, স্বচ্ছতা, দক্ষতা, মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে করছে। সরকারী প্রভাবে যেমন দল চলতে পারে না আবার দলীয় প্রভাবে ও সরকার চলতে পারে না। আবার সরকারী দলের যে কোন ভূলের খেসারত যেমন সরকারকে বহন করতে হয় ঠিক সরকারের যে কোন ভূল সিদ্ধান্তের জন্য দলকে ও জনগনের কাছে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এই উভয় দিক বিশ্লেষন করলে সরকার এবং সরকারী দল উভয়কেই শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার মধ্যে কাজ করতে হবে। এই বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিএনপির মতো একটি বিশাল রাজনৈতিক দলের জন্যও সাংগঠনিক সক্ষমতা, শৃংখলা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন শহর থেকে তৃনমূল পর্যন্ত দল ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে সক্রিয় ও কার্যকর করার পাশাপাশি নেতৃত্ব নির্বাচনে যোগ্যতা, সততা ও গ্রহণ যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে জনগনকে সাথে নিয়ে তাদের ন্যায্য দাবীদাওয়া নিয়ে সব সময় মাঠে থাকা। জনগনের আস্থা পেতে হলে দলীয় পরিচয়ে যেনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন, প্রভাব বিস্তার কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে নেতা কর্মীরা জড়িয়ে না পড়ে সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। দলের ভেতরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনগণের সঙ্গে অসদাচরনের অভিযোগ উঠলে সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহন করা। কারণ একটি দলের ভাবমূর্তি শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপর তৈরি হয় না বরং তৃণমূলের সকল পর্যায়ের নেতা কর্মীদের আচার আচরনের মাধ্যমে সততা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের কাছে দলের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কেবল একটি নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয় না। গণতন্ত্রকে কার্যকর ও টেকসই করতে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, জবাবদিহীতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা। রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবী। জনগণ যদি দেখতে পায় নতুন বাংলাদেশে ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব বড়, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক অধিকার বড় এবং ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ বড় তবেই একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সত্যিকার ভাবে অর্থবহ হয়ে উঠবে। এই কঠিন সময়ে সরকার, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রত্যেকের দায়িত্ব আলাদা হলেও লক্ষ্য হওয়া উচিত একটাই জনগণের আস্থার পুনর্গঠন এবং একটি জবাবদিহীমূলক, মানবিক ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
লেখক : মোস্তফা সালেহ লিটন, সাংবাদিক, লেখক ও সাবেক ছাত্র নেতা, কার্ডিফ।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.