
স্টাফ রিপোর্টার : হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে চা-শ্রমিকদের পূর্ণ উৎসব প্রদান হয়নি বলে অভিযোগ জানিয়েছে চা-শ্রমিক সংঘের নেতারা।
১২ অক্টোবর গণমাধ্যমে প্রেরিত চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত-সভাপতি শ্যামল অলমিক ও সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ন হাজরা এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন আগামী ১৬ অক্টোম্বর শারদীয় দুর্গা পূজা শুরু হবে কিন্তু এবছর এখনো অনেক বাগানের চা-শ্রমিকরা উৎসব বোনাস পাননি। আবার যেসব বাগানে উৎসব বোনাস প্রদান করা হয়েছে সেসকল বাগানেও পূর্ণ উৎসব বোনাস প্রদান করা হয়নি। কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর, দেওছড়া, ডবলছড়া, চাতলাপুর, তিলকপুরসহ বিভিন্ন বাগানে উৎসব বোনাসের পরিবর্তে কর্মে উপস্থিতির উপর হাজিরা/উৎসাহ বোনাস প্রদান করে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ শ্রমআইন-২০০৬ (২০২৬ সালে সংশোধিত) এর ২ (২ক) ধারা এবং বাংলাদেশ শ্রমবিধিমালা-২০১৫ এর ১১১(৫) বিধি অনুযায়ী যে কোন শিল্পে কর্মরত সকল শ্রমিককের জন্য উৎসব বোনাস প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেখানে কাজে উপস্থিতির কোন শর্ত নেই। এমন কি ২০২৩ সালের ১০ আগষ্ট চা-শিল্প সেক্টরে নিম্নতম মজুরির গেজেটে (এসআরও নং ২৪৬-আইন/২০২৩) অনুযায়ী উৎসব বোনাস প্রদান করার আইন আছে, সেখানে কাজে উপস্থিতির উপর বোনাস প্রদানের কোন শর্ত নেই। দুর্গা পূজায় ৫৫ দিনের মজুরির অর্থাৎ (১৯৬.৮০ টাকা ঢ ৫৫ দিন) ১০,৮২৪ টাকার ৬০ শতাংশ হিসেবে ৬৪৯৪.৪০ টাকা উৎসব বোনাস পাওয়ার কথা থাকলে শমসেরনগর চা-বাগানের শেফালী রেলীকে ৪,৮৭০ টাকা, চাতলাপুর চা-বাগানের সাবিত্রি নাউড়কে মাত্র ১,৩০০ টাকা, দেওছড়া চা-বাগানের রামনারায়ন গৌড়কে ৩,২৪৭ টাকাসহ অনেক শ্রমিককে ন্যায্য উৎসব বোনাস প্রদান করা হয়নি। রামনারায়ন গৌড়সহ অনেকেই জানিয়েছেন তারা সারা বছর কাজ করেও কম বোনাস পেয়েছেন। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ শ্রমআইন ও শ্রমবিধি এবং সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরির গেজেট লঙ্ঘন করে শ্রমিকদের বঞ্চিত করছেন। তাছাড়া আইন ও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের সমান মজুরি প্রদান করার বিষয় থাকলেও অধিকাংশ বাগানে ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের কম মজুরি প্রদান করা হয়। দুর্গা পূজার আর মাত্র ৪ দিন বাকি অথচ মালনীছড়া ও রাজনগর চা-বাগানসহ অনেক বাগানে এখনো বোনাস প্রদান করা হয়নি, এমন কি অনেক বাগানে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরিও পরিশোধ করা হয়নি।
চা-শ্রমিক সংঘের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতির এই সময়ে চা-শ্রমিকদের বাচাঁর মত মজুরি নির্ধারণ জরুরী হলেও গত ৭ আগষ্ট’২৫ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বাংলাদেশীয় চা-সংসদের সাথে মজুরি বৃদ্ধি ছাড়াই ২০২৩-২০২৪ মেয়াদের মজুরি চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা চা-শিল্পের ইতিহাসে নজিরবিহীন। শ্রমিক স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এখন নেতারা ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচন নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছেন। চা-শ্রমিকরা বংশ পরস্পরায় প্রায় ২০০ বছর যাবত চা-বাগানে বসবাস করে বনের বাঘ-ভাল্লুক, সাপ-জোঁকসহ হিংস্র জীবজন্তুকে মোকাবেলা করে অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে চা-শিল্পকে আজকের এই অবস্থানে (চা-উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯ম) নিয়ে এসেছেন। অথচ ২০০ বছর পরও চা-শ্রমিকদের মজুরি ২০০ টাকা হয়নি। বর্তমান অগ্নিমূল্যের বাজারে চা-শ্রমিকদের মজুরি (সম্প্রতি ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট প্রদানের পর) সর্বোচ্চ ‘এ’ ক্লাস বাগানে দৈনিক ১৯৬.৮০ টাকা এবং ‘বি’ ও ‘সি’ ক্লাস যথাক্রমে ১৯৫.৬৩ টাকা এবং ১৯৪.৪৮ টাকা। বাংলাদেশে শিল্প সেক্টরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পেয়ে থাকেন চা-শ্রমিকরা। সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত ৪৩ টি সেক্টরে এবং মজুরি কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প সেক্টরের মজুরির সাথে তুলনা করলে চা-শ্রমিকদের মজুরি কম। প্রতিবেশি চা উৎপাদনকারী দেশসমূহের শ্রমিকদের মজুরির সাথে তুলনা করলেও আমাদের দেশের চা-শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত কম। প্রতিবেশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চা-শ্রমিকরা ২৫০ রুপি (৩৫০ টাকা), সিকিম রাজ্যে ৫০০ রুপি (৭০০ টাকা), শ্রীলঙ্কায় চা-শ্রমিকরা দৈনিক ১৭০০ রুপি (৬৮০ টাকা), নেপালে চা-শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১৫০০০ রুপি (১৩,০৫০ টাকা) পায়। এই সকল দেশেও চা-শ্রমিকরা মজুরিসহ সুযোগ-সুবিধাদি বৃদ্ধির দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে আসছে।
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন শ্রমিকের দৈনিক পরিশ্রমের পর পরবর্তী দিন কাজে যোগদানের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজনে দৈনিক তিন বেলা সাধারণভাবে আহারের জন্য ২৫০/- (৫০+১০০+১০০) টাকা দিলেও পেট ভরে না। তাই বর্তমান বাজারদরে স্ত্রী পুত্র কন্যাসহ মা-বাবাকে নিয়ে ৬ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য দৈনিক ন্যূনতম ১,০০০/- টাকা দরকার। বাংলাদেশে ক্রিয়াশীয় জাতীয় শ্রমিক সংগঠনসমূহ জাতীয় ন্যূনতম মূল মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। তাই সামাগ্রিক বিচারে বর্তমান বাজারদর, মূল্যস্ফীতি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, মজুরি কমিশন ঘোষিত মজুরি, দেশের অপরাপর সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি এবং প্রতিবেশী নয়াঔপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ চা উৎপাদনকারী দেশের শ্রমিকদের প্রাপ্ত মজুরি পর্যালোচনা করে ৬ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের খরচ হিসাব করে বাঁচার মত মজুরি ও বার্ষিক ১৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট প্রদান করাসহ চা-শ্রমিক সংঘের ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য দাবি জানান হয়।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.