
মোস্তফা সালেহ লিটন : বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজধানী ঢাকার গুরুত্ব অপরিসীম। আর সেই ঢাকার রাজনীতিতে ইশরাক হোসেন ও মির্জা আব্বাসের মতো অভিজ্ঞ, প্রভাবশালী ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী নেতাদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাঁরা কি দলের জন্য আর প্রয়োজনীয় কেউ নন? নাকি ভিন্ন অবস্থান ও স্পষ্ট বক্তব্যের কারনেই তাঁদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে ? এসব প্রশ্নই আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে।
মাদক বিরোধী অভিযানে পিস্তল তাক করার কারনে আজ ইশরাক হোসেন মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। ভালো কথা? তবে তার মাদক বিরোধী অভিযানের প্রকৃত কারন তিনি যেভাবে ব্যাখা করেছেন তা শুনে এই পদত্যাগ করাটাকে আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি। তিনি হয়তোবা ভেবেছিলেন তার এই পরিস্থিতির কারনে তার দল কিংবা প্রধানমন্ত্রী বিব্রত বোধ করছেন তাই তিনি সেই পথেই হেঁটেছেন। কিন্তু যে দলের তিনি এম পি কিংবা মন্ত্রী সেই দলের পক্ষ থেকে কি এই ঘটনার প্রকৃত কারন জানার এবং বুঝার কোন চেষ্টা করা হয়েছে?
দলের পক্ষ থেকে তাকে এই ধরনের ঘটনার জন্য প্রথমবারের মতো একটি সুযোগ দিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক করা যেতো। যাই হোক সরকার হয়তো অনেকটা স্বচ্ছতার জন্য সেই পথে হাঁটতে চায়নি। একটি বিশেষ গোষ্ঠী তথা কথিত সুশীল গুলো এমনটাই চেয়েছিলো এবং তাতে তারা দারুন খুশীও হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে কথা, তবে এই শব্দটি শুনলে যাদের গাত্রদাহ শুরু হয় তারা কেবল ইশরাক কিংবা আব্বাসদেরকে নয় তাদের টার্গেটে রয়েছেন আরো অনেক প্রভাবশালী বি এন পি নেতা। বি এন পির শীর্ষ পর্যায়ের নীতি নির্ধারকদের এসব নিয়ে ভাবতে হবে।
ইশরাক হোসেন এমন একজন নেতা, যিনি নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে দ্বিধা করেন না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য অনেকের কাছে অস্বস্তির কারন হতে পারে, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলে স্পষ্ট কথা বলা কিংবা ভিন্নমত প্রকাশ করা কি অপরাধ?
আমাদের মনে রাখতে হবে ঢাকার রাজনীতিতে জামায়াত, এনসিপি, ইনকিলাব মঞ্চ ও শিবিরের মতো রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার নীল নকঁশায় লিপ্ত রয়েছেন। বিএনপি ও তার অংঙ্গ সংগঠন গুলোর নেতাকর্মীরা যদি নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ও অবস্থান থেকে নীরব হয়ে যান তাহলে কিন্তু এর খেসারত দলকে দিতে হবে চরম ভাবে। হ্যাঁ দলের নাম বেঁচে কেউ চাঁদাবাজী কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করুক তা আমরা কেউই চাই না। যেমনটা ইসরাকও চায়নি তাইতো সে একটি বিশেষ গোষ্টীর চক্ষুশূলে পড়ে মন্ত্রীত্ব হারাতে হয়েছে।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শক্তিশালী করতে হলে, বিএনপিকে শুধু ক্ষমতায় থাকার রাজনীতি করলেই চলবে না দলটির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বের প্রতি সম্মান এবং কর্মীদের রাজনৈতিক অংশ গ্রহনও নিশ্চিত করতে হবে। কারন, একটি দলের প্রকৃত শক্তি শুধু তার শীর্ষ নেতৃত্বে নয় বরং তৃণমূলের নেতা, কর্মী, সংগঠক ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী জনগনের সম্মিলিত সামর্থ্যের মধ্যেই নিহীত রয়েছে।
আগামীতে দলের পরীক্ষিত নেতাদের নিয়ে রাজধানীর রাজনীতিতে বিএনপির শক্তিশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। বি এন পিকে ইশরাক হোসেন ও মির্জা আব্বাসের মতো নেতাদের গুরুত্ব নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক প্রভাব এবং ঢাকায় নেতা কর্মীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে কাজে লাগানো দলের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা হতে পারে। তাঁদের ভূমিকা সংকুচিত হলে রাজনৈতিক ভাবে দলের সাংগঠনিক গতিশীলতার ওপর বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে।
মনে রাখতে হবে, একটি রাজনৈতিক দলের কাঠামো থাকলেই সেই দল শক্তিশালী হয় না। মূল শক্তিটি আসে তার সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে। সাহসী নেতাদের একের পর এক নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হলে দলীয় কার্যালয় থাকবে, কমিটি থাকবে, পদ-পদবি থাকবে, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে সেই শাহস, সেই দক্ষতা কিংবা মানুষের আস্থাভাজন কর্মী বান্ধব নেতা আর নাও থাকতে পারে। ফলে বাহির থেকে সংগঠনকে অক্ষত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তার কার্যক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
সুতরাং বিএনপির নীতি নির্ধারকদের কাছে সময়ের দাবি, ব্যক্তি কেন্দ্রিক বিরোধ নয়, সাংগঠনিক ঐক্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। নেতৃত্বকে দুর্বল নয়, শক্তিশালী করুন।
লেখক : মোস্তফা সালেহ লিটন, কার্ডিফ।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.