
স্টাফ রিপোর্টার : প্রবীণ রাজনীতিবিদ জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আপসহীন, অকুতোভয়, দৃঢ়চেতা, সাহসী জননেতা এবং সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকার সম্পাদক ডাক্তার এম. এ. করিম-এঁর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা শাখার উদ্যোগে ৪ নভেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শহরের চৌমুহনা এলাকায় সংগঠনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা এনডিএফ’র অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ সোহেল মিয়া। জেলা এনডিএফ’র সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি নিরজ্ঞন দাশ, মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তারেশ চন্দ্র দাস, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ দুলাল মিয়া ও সহ-সভাপতি মোঃ গিয়াস মিয়া, শ্রমিকনেতা মোঃ জসিমউদ্দিন প্রমূখ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন ত্রিকালদর্শী রাজনীতিবিদ ডা. এম এ করিম এক জীবন্ত ইতিহাসের অগ্রসেনা ও ইতিহাসের কালপঞ্জী ছিলেন। প্রায় ৮ দশক জুড়ে ছিল তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সুদূর প্রসারী কর্মতৎপরতা ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি জগন্নাথ কলেজে ভিপি, পাকিস্তান রেড ক্রিসেন্টের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ’৪৬-এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, ’৫৪ নির্বাচনসহ সর্বত্রই তাঁর বিচরণ ছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন, ন্যাপ গঠন, যুবলীগ গঠন সর্বত্রই তিনি ছিলেন সরব। ১৯৬২ সালে বিনা পরোয়ানায় তাঁকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বিনা বিচারে ৫ মাস আটকে রাখা হয়। জেল জীবনের স্মৃতিকথা তিনি ‘ঢাকা সেন্ট্রাল জেল; নানান রঙের দিনগুলি’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি এদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অনেক অজানা কথা পাঠকদের সামনে নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। বিশ্বপরিসরে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট বিতর্কেও তিনি সব সময় সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষাকারী সুবিধাবাদী ক্রশ্চেভ সংশোধনবাদ, তিন বিশ্ব তত্ত্ব ও মাওসেতু চিন্তাধারাসহ সকল প্রকার সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে অনেকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হলেও আদর্শ ও রাজনৈতিক প্রশ্নে তিনি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবী বিকল্পধারা প্রতিষ্ঠায় তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। এখানেই ছিলেন ডাঃ এম এ করিম অনন্য ব্যতিক্রম। এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তিনি সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা লুটার বাজার হিসেবে দেখতেন। তাই তিনি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি হিসেবে বুঝতেন সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজি তথা সকল প্রকার শোষণ-শাসনমুক্ত স্বাস্থ্য ও সমাজ ব্যবস্থাকে। আর তাই চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি জাতীয় গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন সমগ্র পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর ও সামগ্রিক সংকট, দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ, মুদ্রাযুদ্ধ, আঞ্চলিক ও স্থানিক যুদ্ধ, প্রযুক্তি যুদ্ধ প্রক্রিয়ায় পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহারসহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বাড়ছে। পুঁজি ও শক্তি অনুপাতে বাজার পুনর্বন্টন প্রশ্নে মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ার আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভবনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাদের এই যুদ্ধ প্রস্তুতি থেকে আমাদের দেশও মুক্ত নয়। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগত সামগ্রিক গুরুত্বের প্রেক্ষিতে একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নেতৃত্বে পাশ্চাত্য এবং প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন এদেশকে স্ব স্ব পক্ষে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে চায়। এপ্রেক্ষিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়ে দালাল শেখ হাসিনার সরকারকে হটিয়ে অধিকতর বিশ্বস্ত দালাল ড. ইউনুসের অর্ন্তবর্তী সরকারকে ক্ষমতায় এনে স্বীয় পরিকল্পনা কার্যকরী করে। মার্কিনের সাথে গোপন চুক্তি এনডিএ ও এআরটি স্বাক্ষর করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন করে বিএনপি’র নেতৃত্বে জোট সরকারকে ক্ষমতায় আনে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন জোট সরকার প্রভু মার্কিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়া, মার্কিনের সাথে দাসত্বের বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন, জ্বালানি চুক্তি, দুই দফায় মার্কিন বিমান কোম্পানি বোয়িং এর ২৫টি বিমান ক্রয় চুক্তি ইত্যাদি বাস্তবায়নের পাশাপাশি ফরাসি রাষ্ট্রদূতের হুমকিতে ইউরোপী বিমান সংস্থা এয়ারবাসের ১০টি বিমান ক্রয় চুক্তি সম্পন্ন করে। একই সাথে মার্কিন প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীনে প্রথম বিদেশ সফরে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী চীনের স্বার্থে চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করে এসেছে এবং মোংলা বন্দরের দুই কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্পসারণ বিষয়ে চীনের সাথে চুক্তিসহ বিভিন্নভাবে চীনের সাথেও সম্পর্ক অগ্রসর করে চলেছে। পরস্পর বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী উভয় পক্ষের সাথে ক্ষমতাসীন সরকারের সম্পর্ক ও তৎপরতা দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দাজনিত পরিস্থিতি, যুদ্ধময় অবস্থায় সরবরাহ ব্যবস্থাতে অচলাবস্থা, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও অসম বাণিজ্যে সামগ্রিক অর্থনীতির নিম্নমুখীতায় দেশ-জাতি-জনগণ কঠিন ও ভয়াবহ ভবিষ্যতের সম্মুখীন। অথচ দেশের চরম আর্থিক সংকটের এই সময়ে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে বিভিন্ন ক্রয় চুক্তি করে দেশ ও জনগণের ঘাড়ে ঋণের বোঝা বৃদ্ধি করে চলেছে। মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ার পুঁজি ও শক্তির অনুপাতে বাজার পুনর্বন্টন নিয়ে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা প্রণালী সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরীয় দেশ বাংলাদেশকে স্ব স্ব পক্ষে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে সম্পৃক্ত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সকল দেশপ্রেমিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান। বাংলাদেশের সকল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তি, সংগঠনসহ সচেতন শান্তিকামী মানুষকে দেশের নিষ্পেষিত কোটি কোটি শ্রমিক-কৃষক-জনগণের মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হয়ে স্থায়ী শান্তির জন্য এগিয়ে আসা জরুরি কর্তব্য। সেই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের উচ্ছেদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের রাষ্ট, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। তাই জননেতা ডা. এম এ করিমের দেখিয়ে দেওয়া পথে সকল সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে জাতীয় গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে বেগবান করে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সামগ্রিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হবে।
আমৃত্যু সংগ্রামী এই জননেতা ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর ৯৮ বছর বয়সে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.