
বিশেষ প্রতিনিধি॥ সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর ও দাফনের পরও কুলাউড়ার মানুষ বিশ^াস করতে পারছে না জেএমবি সদস্য দেলোয়ার হোসেন রিপন একজন জঙ্গি। সাধারণ মানুষের বক্তব্য যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে তার ফাঁসিতে কোন আক্ষেপ নেই। বরং এলাকাবাসী কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।
কে এই দেলোয়ার হোসেন রিপন? কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের কোনাগাঁও গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক আবু ইউসুফ ও আজিজুন নেছা দম্পতির ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে রিপন সবার বড়। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত। রিপনের ভাই সামছুল হোসেন সিপন জানান, ১৯৯৭ সালে স্থানীয় জালালাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করার পর সিলেট মদনমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেখানে এইচএসসি পাশ করে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরেন। বাড়িতে থাকাকালীন অবস্থায় কুলাউড়া শহরে ‘এক্স লোলডার’ নামে একটি জিম সেন্টার খুলেন।
যেভাবে জঙ্গিও সাথে সম্পৃক্ততা : জঙ্গি রিপন ছিলো একজন মেধাবী ছাত্র। সিলেট মদনমোহন বিশ^বিদ্যালয় কলেজে পড়ার সময় শায়খ আব্দুর রহমান ওরফে বাংলা ভাই ও মুফতী হান্নানের সম্পৃক্ততা ও সান্নিধ্যে রিপন জঙ্গি কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এলাকায় লোকমূখে একটি কথা প্রচলিত আছে জেএমবি শীর্ষ নেতা বাংলাভাই বিশেষ আমন্ত্রণে রিপনের বাড়িতে এসেছিলেন। আর জিম সেন্টারের নামে চালাতো প্রশিক্ষণ। ২০০৬ সালে রিপনের এই জিম সেন্টার ছাড়া কারও কোন জিম সেন্টারই ছিলো না কুলাউড়ায়।
জঙ্গি হওয়া নিয়ে পরিবারের বক্তব্য : সরেজমিন ১৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে জঙ্গি রিপনের বাড়িতে গেলে তার ভাই সামছুল হোসেন সিপন জানান, তার ভাইকে কখনও তিনি জঙ্গি কার্যক্রম সম্পৃক্ত থাকতে শুনেননি। ২০০৬ সালে ৪ সেপ্টেম্বর তার জিম সেন্টারে পুলিশ হানা দেয়। খবর পেয়ে সকালে বাড়ি থেকে রিপন জিম সেন্টারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলে ব্রাহ্মণবাজার এলাকা থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। পরদিন তারা জানতে পারেন ব্রিটিশ হাইকমিশনারের উপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মৃত্যুদন্ডের পর তার ভাইয়ের দাবি-তারা ন্যায় বিচার পাননি। এমনকি তারা কোন আইনজীবিও নিয়োগ করতে পারেননি।
দীর্ঘ কারাবাসের পর শেষ হলো রিপন অধ্যায় : ২০০৬ সালে ৪ সেপ্টেম্বর গ্রেফতারের পর থেকে ২০১৭ সালে ১২ এপ্রিল অর্থাৎ ১০ বছর ৫ মাস ৮দিন হাজত বাসের পর ফাঁসির মাধ্যমে শেষ হয় জঙ্গি রিপন অধ্যায়। নিজ গ্রামের কোনাগাঁও জামে মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
রিপনের অন্তিম ইচ্ছা ও খাবার : জঙ্গি রিপনের ভাই সামছুল হোসেন সিপন জানান, ফাঁসির খবর শুনানোর পর থেকেই রিপন প্রতিদিন রোযা রাখতেন। শেষ ইচ্ছা ছিলো পরিবারের লোকজনের তৈরি ইফতারীতে রোযা শেষ করার। সেই ইচ্ছামত জেল সুপারের নির্দেশে পরিবারের লোকজন ১২ এপ্রিল বুধবার সন্ধ্যায় ইফতারীসহ শেষ দেখা করতে যান কারাগারে। রিপনের মা বাবা ভাই বোন আত্মীয়-স্বজনসহ ৩০ জনের একটি বিশাল বহর জেলগেটে দেখা করতে যান। পারিবারিক ইফতারী কিছুটা গ্রহণ করে বাকিটা তার কাছেই রেখে দেন রিপন।
এলাকাবাসীর বক্তব্য: তরুণ ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও ক্রীড়া সংগঠক মিনহাজ উদ্দিন (কমরু) বলেন জঙ্গিদের কাজ হল মেধাবী শিক্ষার্থী ও তরুণদের টার্গেট করে কাউন্সিলিং করে আস্তে আস্তে বিপথগামী করে। এর প্রমাণ দেলোয়ার হোসেন রিপন। আমাদের এলাকায় যাতে এসকল উগ্র শীর্ষ জঙ্গিদের আনাগোনা ও প্রভাব বিস্তার না বাড়ে সে জন্য আমরা প্রথম থেকেই সোচ্চার। আমাদের এলাকার সর্বশ্রেণি ও পেশার মানুষ জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদী সবসময়। আমাদের এলাকায় কাউকে এরকম আর জঙ্গিবাদীতে যোগ দিয়ে বিপথগামী হতে দেবনা। আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের আব্দুল মোস্তাকিম ও জাহাঙ্গির আলম কনা জানান, এই পরিকারের লোকজনের সাথে এলাকার মানুষের যোগাযোগ খুব একটা নেই। রিপন অপরাধি হওয়ায় তার শাস্তি হয়েছে। আমরা মনে করি এ শাস্তির মাধ্যমে পুরো এলাকাবাসী কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। তবে কোনাগাঁও গ্রামের মানুষ রিপন যে একজন জঙ্গি এবং জঙ্গি কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে তা বিশ্বাস করতে পারছেন না।
উল্লেখ্য, সিলেটে শাহজালাল (রহঃ) এর মাজারের প্রধান ফটকে ২০০৪ সালের ২১ মে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা হয়। হামলায় তিন জন নিহত ও আহত হন ৭০ জন। এ ঘটনার মামলায় ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর মুফতি হান্নান, শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুল, দেলওয়ার ওরফে রিপনকে মৃত্যুদন্ড এবং মহিবুল্যাহ ওরফে মফিজুর রহমান ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন দন্ড দেন সিলেট দ্রুত বিচার আদালত। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে সেই সাজা বহাল থাকে।
সৈয়দা রাবেয়া ম্যানশন, সিলেট সড়ক, মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত। ইমেইল : umedntv@gmail.com
Copyright © 2026 পাতাকুঁডির দেশ. All rights reserved.